ইরান যুদ্ধে জ্বালানি খাতে বিপর্যয়, লাভবান চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার

ইরান যুদ্ধে জ্বালানি খাতে বিপর্যয়, লাভবান চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার
সংবাদআন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধে জ্বালানি খাতে বিপর্যয়, লাভবান চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার

১২ জুলাই, ২০২৬

[প্রকাশ : আমার দেশ, ০২ জুলাই ২০২৬]

গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে এক বিশাল বিপর্যয় ঘটে গেছে। এই চার মাসেরও বেশি সময়ে তেলের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা দেখা গেছে। তেলের দাম কখনো ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর সময়ের রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে, আবার কখনো যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে নেমে এসেছে।

 

 

 

শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে জ্বালানি সরবরাহকারীরা বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

 

অন্যদিকে টোকিও, নয়াদিল্লি থেকে শুরু করে লন্ডন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের সরকার বর্ধিত জ্বালানি খরচের হাত থেকে সাধারণ নাগরিকদের বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

 

 

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান আলোচনা বাজার স্থিতিশীল হওয়ার আশা জাগালেও, এই যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

 

 

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও অভিজ্ঞ তেল ব্যবসায়ী আদি ইমসিরোভিচ আল জাজিরাকে বলেন, ‘এই সংঘাতের পর তেলের বাজার আর কখনোই আগের মতো থাকবে না। এখন জরুরি ভিত্তিতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে এবং এই অঞ্চলের তেলের ক্রেতারা বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে।’

 

 

হরমুজ প্রণালি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা

 

 

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তেহরান বারবার এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার দাবি করে আসছে। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এই নৌপথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভীতিকর প্রভাব থেকে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

 

গত ২৪ জুন এই প্রণালি দিয়ে সর্বোচ্চ ৭০টিরও বেশি জাহাজ পারাপার হয়েছিল। কিন্তু এর পরপরই সপ্তাহের শেষ দিকে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এর জন্য ব্যাপকভাবে ইরানকে দায়ী করা হয়। এই হামলার পর নাবিকদের নিরাপত্তা শঙ্কা আবার নতুন করে দেখা দেওয়ায় জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।

 

 

এই সমুদ্রপথে ক্রমাগত হুমকির মুখে জ্বালানি সরবরাহকারীরা স্থলপথে সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন’ এবং ‘ইরাক-তুরস্ক ক্রুড অয়েল পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এই পাইপলাইনগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো।

 

 

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্বালানি নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক ড্যান মার্কস আল জাজিরাকে বলেন, ‘বর্তমান ইরানি প্রশাসন যতদিন ক্ষমতায় থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের বিরোধ বজায় থাকবে, ততদিনই সেখানে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং প্রণালিটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। এটি এই অঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ এবং পর্যটন খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

 

 

কমোডিটি ডাটা ফার্ম স্পার্টা-এর সিঙ্গাপুরভিত্তিক জ্যেষ্ঠ তেল বাজার বিশ্লেষক জুন গোহ-এর মতে, এখন উৎপাদক ও ভোক্তা উভয় পক্ষই এই প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা জোরদার করবে। উৎপাদকরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরো বেশি পাইপলাইন রুট তৈরির চেষ্টা করবে এবং ক্রেতারা তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা জরুরি জ্বালানি মজুত বাড়াবে।

 

 

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা

 

 

এই যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব হলো, দেশগুলো এখন জীবাশ্ম জ্বালানি (তেল-গ্যাস) বাদ দিয়ে দ্রুত বায়ু, সৌর ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। গত এপ্রিলে জাতিসংঘের শীর্ষ জলবায়ু কর্মকর্তা সাইমন স্টিয়েল আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার এক বৈঠকে বলেছিলেন, এই সংঘাত ‘বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির উত্থানকে আরো গতিশীল’ করছে।

 

 

২০১৫ সালে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যেখানে নতুন যুক্ত হওয়া বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ৮৬ শতাংশই ছিল অ-জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প।

 

 

বিশেষজ্ঞ আদি ইমসিরোভিচ মনে করেন, এই যুদ্ধের পর নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে মানুষ আর সহজে ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন বা তেলচালিত গাড়ি বেছে নেবে না, বরং বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) দিকে ঝুঁকবে। এর ফলে সড়ক পরিবহনে তেলের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটবে। কেবল বিমান পরিবহন ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে তেলের একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে, যা মোট চাহিদার তুলনায় বেশ কম।

 

 

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের অর্থনীতির সহযোগী শিক্ষক মোহাম্মদ এলহেদদাদ বলেন, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রকৃত খরচ বেড়ে যাওয়ায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরো জোরালো হবে।

 

 

লাভবান হবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র  কাতার

 

জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে এই দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে চীন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতিটি বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশ রপ্তানিতে সবার শীর্ষে রয়েছে।

 

 

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি উইন্ড টারবাইন, সোলার প্যানেল এবং এনার্জি স্টোরেজ ব্যাটারি চীন উৎপাদন করে।

 

 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মরিস অবস্টফেল্ড বলেন, ‘জ্বালানি বহুমুখীকরণের গুরুত্বের ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ একটি বড় বাস্তব শিক্ষা। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামোগত পণ্যের বাজারে আধিপত্য থাকার কারণে চীন এতে বড় সুবিধা পাবে।’

 

 

অর্থনীতিবিদ এলহেদদাদ আরো জানান, এই পরিস্থিতিতে নিশ্চিত সরবরাহ এবং উদ্বৃত্ত রপ্তানি সক্ষমতা থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারও তাদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র এলএনজি সরবরাহকারী হিসেবে এবং কাতার একটি নির্ভরযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবে।

সূত্র: আল-জাজিরা

ট্যাগ:BCSসংবাদআন্তর্জাতিক