নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলল ইরান

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলল ইরান
সংবাদআন্তর্জাতিক

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলল ইরান

২১ আগস্ট, ২০২৬

[সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন; ২১ আগস্ট, ২০২৬]

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কড়া নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। এসব পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের বৈরী নীতি এখনও ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে ইরান।

সংবাদমাধ্যম এএনআই তাদের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

 

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, নতুন নিষেধাজ্ঞা ইরানি জনগণের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতার আরেকটি উদাহরণ। মন্ত্রণালয়ের দাবি, ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরানে সংঘটিত অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর সময় নতুন এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়েছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালের ওই ঘটনার পর থেকে দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী নীতি বিভিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ‘আইনবহির্ভূত ও আধিপত্যবাদী’ নীতির বিষয়টিও আরো স্পষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারেও প্রভাব ফেলছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের ওপর আরোপ করা এসব নিষেধাজ্ঞা সরাসরি ইরানি নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করছে। এ কারণে এগুলোকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করে তেহরান।

 

 

মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, নিষেধাজ্ঞা আরোপের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। তেহরানের দাবি, গত দেড় বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের পরও ইরান তাদের দাবি মেনে নেয়নি। সেই ব্যর্থতার পরই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নতুন নিষেধাজ্ঞা দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আগের পদক্ষেপের তালিকায় আরও একটি অধ্যায় যোগ করবে। তবে এতে ইরানের স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবস্থান বদলাবে না।

 

 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক আগ্রাসন আলাদা কিছু নয়। তাদের ভাষায়, দুটি একই নীতির ভিন্ন রূপ। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক শক্তি ব্যবহার করছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশগুলোকে নিজেদের নীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের নীতি বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলেও দাবি করেছে ইরান। মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, জাতিসংঘ সনদে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের যে নীতি রয়েছে, তা মেনে চলা দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের এমন কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করা উচিত নয়। তেহরানের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞা এমন একটি নীতিরই ধারাবাহিকতা, যা অতীতেও ব্যর্থ হয়েছে। একই ধরনের পদক্ষেপ বারবার নেওয়া হলে তা আগের ব্যর্থতারই পুনরাবৃত্তি হবে বলে সতর্ক করেছে ইরান। মন্ত্রণালয় বলেছে, এই নীতির পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের শেষ পর্যন্ত তাদের সিদ্ধান্তের পরিণতির জন্য দায়ী থাকতে হবে।

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য চাপ মোকাবিলা করে জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় ইরান দৃঢ় থাকবে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।  তেহরানের দাবি, ইরান গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, সামরিক হামলা ও বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৈরী কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় নিজেদের সব ধরনের সক্ষমতা ব্যবহার করবে ইরান। মন্ত্রণালয় বলেছে, নিজেদের জাতীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই ইরান তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে।

 

 

ইরানের এই প্রতিক্রিয়া এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন ও কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করার পর। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করা হচ্ছে। তিনি আরো সতর্ক করেছেন, কোনো দেশ যদি ইরানকে আর্থিক, ব্যবসায়িক বা সরকারি সহায়তা দেয়, তাহলে সেই দেশকেও ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানকে একটি চুক্তিতে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তেহরান সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তার দাবি। এর পরই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ শুরুর ঘোষণা দেন।

 

 

ট্রাম্প জানিয়েছেন, নতুন মার্কিন পদক্ষেপে ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতকে লক্ষ্য করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে তেল পাচারের নেটওয়ার্ক, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র, জাহাজ নিবন্ধন এবং বিভিন্ন আড়াল করা কোম্পানি। ট্রাম্প এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরো সতর্ক করে বলেছেন, কোনো দেশ যদি তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা করে, তাহলে ওই দেশকেও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।

 

 

ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময়ই হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উত্তেজনা বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি এখনো খোলা রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক নৌযান এখনো প্রণালিটি ব্যবহার করছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ‘১০০ শতাংশ সফল’ হয়েছে। ট্রাম্প একই সঙ্গে আবারও বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’

 

 

ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে উল্লেখ করে এর সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বড় ধরনের ঋণ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা সুদের ব্যয়ের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিক থেকে নজর সরানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। আরাগচি আরো বলেন, ব্যর্থ নীতিতে আরো জোর দিলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো খারাপ হবে এবং ইরানিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব বাড়বে। 

 

 

তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শুধু ইরান নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকি তৈরি করছে। এর আগে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে না তেহরান। ইরানের দাবি, ওই প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং দেশটির তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। 

 

 

ট্যাগ:BCSসংবাদআন্তর্জাতিক