এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য আরসিইপিতে যোগদান একটি কৌশলগত আবশ্যকতা

এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য আরসিইপিতে যোগদান একটি কৌশলগত আবশ্যকতা
কলামআন্তর্জাতিক

এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য আরসিইপিতে যোগদান একটি কৌশলগত আবশ্যকতা

২২ জুলাই, ২০২৬

ড. সাজ্জাদ এম জসীমউদ্দীন [সূত্র : জাতীয় অর্থনীতি, 21 July 2026]

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশ প্রধান অর্থনীতিগুলোর বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা হারাবে, যার ফলে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। বাংলাদেশ ২০২৯ সালের মধ্যে এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) যোগদান একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। 

 

 

২০২২ সালে কার্যকর হওয়ার পর থেকে আরসিইপি বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করছে, যা এটিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী অর্থনৈতিক জোটে পরিণত করেছে। আরসিইপি হলো বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, যেখানে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি দেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি আসিয়ান দেশ, পাশাপাশি চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা হ্রাস, বিনিয়োগ উদারীকরণ ও উন্নত অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক একীকরণকে উৎসাহিত করা।

 

 

এলডিসি-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রপ্তানি বৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আরসিইপি-তে যোগদান একটি অত্যন্ত যৌক্তিক কৌশলগত পদক্ষেপ। উল্লেখ্য, আরসিইপি তার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের প্রায় ৯০ শতাংশই পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করার বিধান রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে আরসিইপির সক্রিয় সদস্য। যদি বাংলাদেশ এই জোটের বাইরে থাকে, তবে পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ান বাজারে বাংলাদেশের পোশাকপণ্য ভিয়েতনামের তুলনায় বেশি শুল্ক ও কঠোর বাণিজ্য বাধার সম্মুখীন হবে। 

 

 

এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার প্রবেশাধিকার কমে যাওয়ার মুখোমুখি হবে। আরসিইপি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি স্থিতিশীল ও নিয়মভিত্তিক কাঠামো প্রদান করে এই সুবিধা হ্রাসের ক্ষতি আংশিকভাবে পুষিয়ে নিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে।

 

 

উন্নত বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি- আরসিইপি-এ যোগদানের অন্যতম জোরালো যুক্তি হলো বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজারগুলোয় প্রবেশাধিকার লাভ। বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল; এই জোটের সদস্যপদ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোয় অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করবে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে প্রাপ্ত বিশেষ বাণিজ্য সুবিধাগুলো হারানোর পর, আরসিইপির সদস্যপদ রপ্তানি সক্ষমতা বজায় রাখতে এবং বাজারের অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। 

 

 

বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি আরসিইপি-এর সদস্যপদ বাংলাদেশকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করতে পারে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো সাধারণত এমন সব দেশে বিনিয়োগ করতে পছন্দ করে যেগুলো বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তির অন্তর্ভুক্ত, কারণ বিশাল শ্রমশক্তি, কৌশলগত অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খাতের সুবাদে বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকস, বস্ত্র, ওষুধ এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে।

 

 

আঞ্চলিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে একীভূতকরণ- আধুনিক বাণিজ্য ক্রমে আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ একাধিক দেশজুড়ে সম্পন্ন হয়। আরসিইপি এই ধরনের একীভূতকরণকে সহায়তা করে। বাংলাদেশ এতে অংশগ্রহণ করলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দক্ষতার সঙ্গে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবে এবং চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতৃত্বাধীন পূর্ব এশীয় উৎপাদন নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারবে। 

 

 

রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ- বাংলাদেশের রপ্তানি খাত মূলত সীমিত সংখ্যক বাজারের ওপর, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। আরসিই’র সদস্যপদ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতির দিকে বাজার সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্যকরণকে উৎসাহিত করবে, যা প্রথাগত বাজারগুলোর অর্থনৈতিক মন্দা বা নীতি পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি কমিয়ে আনবে।

 

 

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার- বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ক্রমে এশিয়ার দিকে সরে আসছে। আরসিইপি-এ যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারবে। এই সম্পৃক্ততা বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের মতো বৃহত্তর জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।

 

 

প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর- বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রায়শই প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা এবং উদ্ভাবন হস্তান্তরের পথ সুগম করে। আরসিইপি-এর সদস্যপদ বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং উন্নত উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ করে দিতে পারে।

 

 

 

কর্মসংস্থান সৃষ্টি- বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি দারিদ্র্যবিমোচনে অবদান রাখবে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে।

 

 

অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি- অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক বাজারে অংশগ্রহণ দেশীয় শিল্পগুলোকে তাদের দক্ষতা, গুণগত মান এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে উৎসাহিত করবে। যদিও এটি কিছু খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী করবে। 

 

 

 

যদিও আরসিইপি বর্তমানে এর বিদ্যমান সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তবে এতে এমন কিছু বিধান রয়েছে যা বিদ্যমান সদস্যদের অনুমোদনের সাপেক্ষে ভবিষ্যতে নতুন দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তির (অ্যাক্সেসশন) সুযোগ দেয়। বাংলাদেশের জন্য আরসিইপি-তে যোগ দিতে হলে মুক্ত বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণের নীতিগুলোর প্রতি তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শনের পাশাপাশি পদ্ধতিগত ও অর্থনৈতিক- উভয় ধরনের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে হবে।

 

 

বাংলাদেশ এই বাণিজ্য ব্লকে তার প্রবেশকে ত্বরান্বিত করতে সক্রিয়ভাবে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। আরসিইপি সচিবালয় বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ নীতি, শাসন ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্নাবলি জারি করেছে, যেখানে জাতীয় নীতিগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।

 

 

এক্ষেত্রে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এবং চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় অর্থনীতিগুলোর সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে দ্বিপাক্ষিক সমর্থন নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে, মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার আরসিইপি-তে অন্তর্ভুক্তির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের কৌশলগত ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে। যেহেতু যোগদানের জন্য সর্বসম্মত অনুমোদনের প্রয়োজন, তাই বাংলাদেশকে অবশ্যই সব আরসিইপি দেশের সঙ্গে কূটনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকতে হবে। এই দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ বাংলাদেশের সদস্যপদ আবেদনের সমর্থন বাড়াতে পারে।  

 

 

আরসিইপিতে যোগদানের ফলে যেমন অনেক সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি এতে বেশ কিছু ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জও রয়েছে যা বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

 

 

দেশীয় শিল্পের জন্য বর্ধিত প্রতিযোগিতা-আরসিইপিতে যোগ দিলে দেশীয় শিল্পগুলো চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আরও উন্নত অর্থনীতির তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে। দেশীয় শিল্প, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো, উচ্চ শিল্পোন্নত অর্থনীতি থেকে আসা আমদানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খেতে পারে। ফলে ব্যবসা বন্ধ হওয়া, শিল্প প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোতে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হারানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

 

 

বাণিজ্য ভারসাম্যের ঝুঁকি- বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি আরসিইপি সদস্য দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য আমদানি করে। যদি রপ্তানি আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি না পেয়ে আমদানি বৃদ্ধি পায়, তবে তা লেনদেনের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস) ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই ভারসাম্যহীনতা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে।

 

 

শুল্ক রাজস্ব হ্রাস- অন্যতম প্রধান একটি ঝুঁকি হলো আমদানি শুল্ক থেকে প্রাপ্ত সরকারি রাজস্ব কমে যাওয়া। সরকার আমদানি শুল্ক থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় করে থাকে। আরসিইপি-এর সদস্যপদ গ্রহণের ফলে অনেক পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে হবে, যা স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদে সরকারি রাজস্ব কমিয়ে দিতে পারে এবং আর্থিক বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।

 

 

উদীয়মান শিল্পের জন্য হুমকি- বাংলাদেশের কিছু উদীয়মান শিল্প হয়তো এখনও বিদেশি প্রতিযোগিতার মোকাবিলা করার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করেনি। পর্যাপ্ত সুরক্ষা বা মানিয়ে নেওয়ার সময়সীমা ছাড়া এসব খাতে উৎপাদন হ্রাস, কর্মসংস্থান হারানো কিংবা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

 

কৃষি খাতের ওপর চাপ- বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনকারীরা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশের অধিক দক্ষ উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। আধুনিকায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা না দেওয়া হলে কৃষকরা মূল্য এবং উৎপাদনশীলতার দিক থেকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সমস্যায় পড়তে পারেন।

 

 

 

কর্মসংস্থানে ব্যাঘাত- বর্ধিত রপ্তানি এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে কিছু খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেলেও, তীব্র আমদানি প্রতিযোগিতার কারণে অন্যান্য খাতে কর্মসংস্থান হারাতে পারে। কম প্রতিযোগিতামূলক শিল্পের কর্মীদের এই পরিবর্তনকালীন পুনরায় প্রশিক্ষণ ও সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

 

 

ভারত কেন আরসিইপিতে যোগ দেয়নি? ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৯ সালের নভেম্বরে আরসিইপি যোগদান আলোচনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। সাত বছরের আলোচনা চলাকালীন ভারত নির্দিষ্ট কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার জন্য জোর দাবি জানিয়েছিল। অবশেষে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের কারণে ভারত আরসিইপি-তে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই চুক্তিটি ভারতের বিশাল কৃষি ও দুগ্ধ শিল্পের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের কর্মসংস্থান জোগায়। দুগ্ধ খামারিরা এই চুক্তির তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।

 

 

তাদের আশঙ্কা ছিল যে, আমদানি শুল্ক তুলে নেওয়া হলে নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, বৃহৎ আকারের দুগ্ধ খামারিদের কাছে তারা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ভারত সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে, পূর্ববর্তী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো (এফটিএ) ভারতের রপ্তানি বাড়ানোর চেয়ে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে এই ধরনের একটি মেগা-আঞ্চলিক চুক্তি দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ভারতের এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সস্তা চীনা পণ্যে বাজার ছেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, যা স্থানীয় শিল্পগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করত। চূড়ান্তভাবে, ভারত একটি ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ (ভারত প্রথম) নীতি বেছে নেয়। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, অসম বৈদেশিক প্রতিযোগিতা থেকে অভ্যন্তরীণ শিল্প, কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে রক্ষা করা আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্লকে যোগদানের সুবিধার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) পরবর্তী যুগে রপ্তানি সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এর সদস্যপদ লাভ কেবল একটি ঐচ্ছিক নীতি পছন্দ নয়; এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচিত। আরসিইপি-তে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, শিল্পোন্নত মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথে নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করতে পারে। 

 

 

 

এতে বেশ কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকিও রয়েছে। এই ঝুঁকিগুলো মূলত অর্থনৈতিক সামঞ্জস্য, রাজস্ব প্রভাব এবং দেশীয় প্রতিযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আরসিইপি-তে যোগ দিতে হলে বাংলাদেশকে ‘ডব্লিউটিও-প্লাস’ প্রতিশ্রুতিগুলো গ্রহণ করতে হবে, যা সদস্যদের তাদের অভ্যন্তরীণ সেবা খাতকে বিদেশি প্রতিযোগিতার জন্য ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করার তাগিদ দেয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধারণা থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশ সরকারকে মূল্যায়ন করতে হবে যে সুবিধাগুলো আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্লকে (রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ) যোগদানের সম্ভাব্য ঝুঁকির চেয়ে বেশি।

 

 


সিনিয়র প্রফেসর, কেজ বিজনেস স্কুল ও প্রধান, জিওপলিটিক্স স্ট্র্যাটেজি ল্যাব (ফ্রান্স); এর আগে তিনি অধ্যাপনা করেছেন বাংলাদেশ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক