
ধৈর্যহীন ট্রাম্পের থুসিডাইডিস ফাঁদে পা
ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৮ মে ২০২৬]
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর বাইরেও বেশ কিছু দেশের কাছে পরমাণু অস্ত্র রয়েছে এবং এটি এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বিষয় হচ্ছে, ইরানের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকা না থাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যতটা মাথা ব্যথা, আর কোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়নি কখনো।
অতীতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাঁদের যেকোনো আন্তর্জাতিক অভিযানের ক্ষেত্রে মিত্রদের সহায়তা পেয়ে আসছিলেন। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের অনুমোদন না থাকলেও এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্যদের তার পাশে পেয়েছিল। এবারই এর ব্যতিক্রম হয়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ট্রাম্পের শুল্কনীতি, যা তিনি তাঁর তথাকথিত ‘আমেরিকাকে মহান’ করার নীতিতে বন্ধু-শত্রু সবার ওপর চাপিয়েছেন। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনকে বৈধতাদান এবং ইরানে অভিযান শুরু—এই সবকিছুতে তাঁর ‘কাউকে প্রয়োজন নেই’ জাতীয় দাম্ভিকতা আজ যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের সমতুল্য একটি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে!
চীন সফরে যাওয়ার আগেও তিনি একই ধরনের দাম্ভিকতার প্রকাশ করেছেন। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে তাঁর চীনের সহায়তার কোনো প্রয়োজন নেই। অথচ তাঁর এই সফরের অন্যতম আলোচ্য বিষয়ই ছিল ইরান যুদ্ধ নিয়ে চুক্তি করতে চীনের সহায়তা প্রার্থনার বিষয়টি। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধ বন্ধ চুক্তি করতে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতারা ইসলামাবাদে সমবেত হয়েছিলেন, ট্রাম্পের ধারণা ছিল ইরান ভয় পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া শর্ত মেনে নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করবে। দিন যত যাচ্ছে, ইরানের অনমনীয় অবস্থান ট্রাম্পকে অনেক বেশি চিন্তিত করে তুলছে। বিশেষ করে সামনের নভেম্বরে দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধের প্রভাব যে বেশ ভালোভাবেই পড়বে, সেটি নিয়ে সন্দেহ নেই। ঘটনাক্রমে যদি সিনেট ও কংগ্রেস—এই উভয় কক্ষেই তিনি নিয়ন্ত্রণ হারান, তবে তাঁর অভিশংসন একটি সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে মাত্র।
এমন অবস্থায় ট্রাম্পের বেইজিং গমন, প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার আকুতি—এই সবকিছু চীনকে বেশ ভালো একটি দর-কষাকষির জায়গায় রেখেছে। প্রেসিডেন্ট শি সাম্প্রতিক সময়ে ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ বিষয়টিকে প্রায়ই উল্লেখ করে থাকেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বাস্তববাদী তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা এবং প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেশিয়ান ওয়ার’-এ লিখেছিলেন, ‘যখন কোনো উদীয়মান শক্তি কোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে হটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।’ ৪৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্সের উত্থান এবং স্পার্টার মনে জেঁকে বসা ভয় থেকে চলা কয়েক দশকের যুদ্ধের আলোকে তিনি এই বিষয়টির অবতারণা করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট শি এর মাধ্যমে মূলত চীনকে ঠেকাতে তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও কার্যত সাম্প্রতিক ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের এবারের বেইজিং সফরেও প্রেসিডেন্ট শি মার্জিতভাবে এটি পুনরুল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নিয়ে চীনের সহায়তা কামনার জবাবে চীনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কোন্নয়নের পথে তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রধান বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবর ‘এক চীন নীতি’কে সমর্থন করলেও গোপনে তাইওয়ানকে সামরিক সমর্থন দিয়ে আসছে এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগরে বিভিন্ন সময়ে চীনের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। গত বছর ডিসেম্বর মাসে তাইওয়ানের সঙ্গে ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি মূলত চীনের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে, যা তাইওয়ান নিয়ে চীনের ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার শামিল। চীনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তাই দেওয়া হয়েছে এবং এটিও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে এ ধরনের অবস্থা চলমান থাকলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে উভয় পক্ষই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও—এটি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এই যুদ্ধের পক্ষে শুধু ইসরায়েল ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র অপর কোনো রাষ্ট্রের কাছ থেকে এর বৈধতা আদায় করতে পারেনি। ধারণা করা হয়েছিল যে ইরানের তেলের ৮০ শতাংশের বেশি ক্রেতা চীন উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বাস্তবে সেটি ঘটেনি, বরং পর্যাপ্ত তেলের মজুদ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, সেই সঙ্গে রাশিয়া থেকে নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ চীনের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। এমন অবস্থায় এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির জায়গায় চীন নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে রয়েছে, যা চীনের ওপর ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে পুনর্বিবেচনা করতেও চাপ সৃষ্টি করেছে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ইরান নিয়ে তিনি চীনের কাছ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পারেননি, যা তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন। এখন দেখার অপেক্ষা তাঁর এই ধৈর্যচ্যুতি এবং শির ভাষায় থুসিডাইডিসীয় ফাঁদের সমন্বয়ে যে বিপদের মধ্যে তিনি রয়েছেন, এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে তিনি কী করতে পারেন।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



