
চাপের মুখে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি
আবু আলী [সূত্র : আমাদের সময়, ২৭ জুলাই ২০২৬]
জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কারণে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সাময়িক চ্যালেঞ্জ ও ক্রেতাদের পক্ষ থেকে মূল্য সমন্বয়ের বাড়তি চাপের মুখে পড়তে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বর্তমান পরিস্থিতিকে আইনি কাঠামোর বদল এবং শুল্কের হারে নতুন করে বাস্তবিক কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি করলেও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন সাময়িক শুল্কটি এখন স্থায়ী রূপ পাওয়ায় এটিকে চ্যালেঞ্জ করা আরও কঠিন হবে।
তবে এই কাঠামোয় প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভিয়েতনামের শুল্কহার বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ করায় বাংলাদেশ এক ধরনের আপেক্ষিক সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে মার্কিন তুলা আমদানি করার শর্তে ৩ বছর মেয়াদি শুল্কমুক্ত টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানির কোটা পাওয়ার যে অনন্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা ভারত কিংবা ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের নেই। তবে বাংলাদেশের জন্য এই ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) সুবিধা এখনও পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় দেশের শ্রম কমপ্লায়েন্স জোরদার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের পণ্যের ১০ থেকে ১২ দশমকি ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের (ইউএসটিআর) সেকশন ৩০১-এর আওতায় নেওয়া এই নতুন আইনি কাঠামোর ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের মোট গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫ শতাংশে দাঁড়াবে।
আইনি পরিবর্তন ও নতুন শুল্কের সমীকরণ : যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে একাধিক রপ্তানিকারক বলেছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন আদালতে পাল্টা শুল্ক স্থগিত হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। সেটি মেয়াদ শেষ হতেই সমপরিমাণ নতুন শুল্ক বসছে। ফলে শুল্কহারে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে নতুন দুশ্চিন্তা হচ্ছে, উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন বিষয়ে আরেকটি তদন্ত করছে দেশটি। তাতে আবার শুল্ক আরোপ হলে নতুন সংকটের কারণ হতে পারে।
জানা গেছে, ইউএসটিআরের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৭টি দেশের পণ্য আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে মোট শুল্ক ১০ অথবা ১২.৫ শতাংশ হবে। তার বাইরে ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, চীন, মিসরসহ ৩৮টি দেশের পণ্যে ১২.৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নতুন করে শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বাড়লে চাহিদা সংকোচন হবে। এটির অভিঘাত সব দেশের ওপরই পড়বে। নতুন শুল্ক আরোপের পর রপ্তানিকারকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তিটি কতটা যৌক্তিক ছিল। কারণ ৫৭ দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করলেও মাত্র ৯টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছিল, যার মধ্যে মালয়েশিয়া চুক্তি করার পর তা পরবর্তীতে বাতিল করে দেয়। বাংলাদেশের চুক্তিটি এখনও জাতীয় সংসদে অনুসমর্থন না হলেও চুক্তির কিছু বিষয় মানা শুরু হয়েছে, যা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক (রেসিপ্রোকাল) শুল্ক ঘোষণা করেছিল। পরে তা ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু মার্কিন উচ্চ আদালতের এক রায়ের পর সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যালেন্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পান, যা সর্বোচ্চ পাঁচ মাস কার্যকর থাকতে পারে। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বাস্তবে শুল্কের হারে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ককাঠামোতে অবশ্য মার্কিন তুলায় উৎপাদিত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একটি অংশ বাড়তি শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে তুলা আমদানির প্রবণতার ওপর। গত বৃহস্পতিবার জারি করা মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্মারকে বলা হয়, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) চালু করবেন। এর উদ্দেশ্য হবে দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বেশি আমদানি করতে উৎসাহিত করা; যাতে তারা এমন অন্যান্য উৎসের তুলার ওপর কম নির্ভরশীল হয়, যেগুলোতে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের ঝুঁকি বেশি।
এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে তৈরি পোশাক খাতে সাময়িক চ্যালেঞ্জ তৈরি হলেও, প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও একই নীতি কার্যকর হওয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব। তবে ক্রেতাদের চাপ সামলাতে আমাদের দ্রুত পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ করতে হবে এবং শ্রম কমপ্লায়েন্স জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংলাপ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাজার খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, নতুন ঘোষণায় বাংলাদেশের শুল্ক হার ১০ শতাংশ হলেও প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভিয়েতনামের পণ্যে শুল্কহার বাড়িয়ে ১২.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় ভালো থাকব। তবে সামগ্রিকভাবে শুল্ক বাড়লে বিক্রি কমবে, যার কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব রপ্তানির ওপর পড়বে।
বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘নতুন শুল্ক কাঠামোটি আকস্মিক কোনো বিষয় নয়; বরং এটি মার্কিন বাণিজ্যিক কৌশলেরই অংশ। সাময়িক শুল্কগুলো স্থায়ী আইনি রূপ পাওয়ায় একে চ্যালেঞ্জ করা এখন আরও কঠিন হবে। তবে চীন ও ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশ কম শুল্কের স্তরে থাকায় একধরনের কৌশলগত সুবিধা পাবে। বিশেষ করে মার্কিন তুলা ব্যবহারের শর্তে শুল্কমুক্ত কোটা পাওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা ভারত বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের নেই। তবে মনে রাখতে হবে, টিআরকিউ সুবিধাটি এখনও কার্যকর হয়নি। তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সফল হতে হলে কেবল ২.৫ শতাংশ শুল্ক ব্যবধানের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং মূল্য সংযোজন বাড়ানোর দিকেই সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।’



