
বিশ্ব এখন ট্রাম্পের যুদ্ধের ভুক্তভোগী
নেসরিন মালিক [প্রকাশ : কালবেলা, ২৯ জুলাই ২০২৬]
গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যেভাবে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে, তা দেখে যে কারও মনে হতে পারে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি বুঝি অনেক আগের ঘটনা। অথচ সেটি সই হয়েছে মাত্র গত মাসে। ওই সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। একই সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই এত হুমকি, এত বড় বড় কথা, এত হামলা এবং এত পিছু হটার ঘটনা ঘটেছে যে, মনে হয় এই যুদ্ধ যেন কয়েক দফা শুরু হয়েছে, আবার কয়েক দফা শেষও হয়েছে। পুরো যুদ্ধের বয়স এখনো মাত্র পাঁচ মাস। তবু এটি এমন এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এখন সবকিছু যেন একই নাটকের পুনরাবৃত্তি। এক দৃশ্যের সঙ্গে আরেক দৃশ্যের তেমন পার্থক্য নেই। খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে এই পরিবর্তন ধরা পড়ে না।
একবার বলা হয়, যুদ্ধ শেষ। পরক্ষণেই বলা হয়, যুদ্ধ সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একবার বলা হয়, ইরানিরা সাহসী জাতি। আবার বলা হয়, তারা নিকৃষ্ট, বিশেষ করে তাদের নেতারা। কখনো শোনা যায়, ইরান যুদ্ধবিরতি চায় না। আবার কিছুক্ষণ পর বলা হয়, তারাই নাকি যুদ্ধবিরতির জন্য আকুল হয়ে আছে। কখনো বলা হয়, হরমুজ প্রণালি খোলা আছে। আবার বলা হয়, সেটি বন্ধ। তারপর বলা হয়, আংশিকভাবে খোলা।
এখন পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটি সংক্ষেপে বলা যাক। যে যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন ষষ্ঠ মাসে প্রবেশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বিমান হামলা আরও বাড়িয়েছে। তারা একে বলছে বড় ধরনের সামরিক শাস্তি। জবাবে ইরান আবারও এই অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। হুতিরাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অবরোধের দাবি করেছে। ফলে যুদ্ধ এখন শুধু উপসাগরে সীমাবদ্ধ নেই। এটি লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন আর সহজে এই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারছেন না। ইরান বুঝে গেছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ও সামরিক হাতিয়ার। এই সুবিধা ইরানের হাতে থাকা অবস্থায় ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন না। আবার এই সুবিধা ছাড়া ইরানও যুদ্ধ শেষ করতে রাজি হবে না।
যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে গিয়ে ট্রাম্প সেনা প্রত্যাহার করতে পারবেন না। তাতে তার জন্য কোনো রাজনৈতিক সাফল্য থাকবে না। আবার তিনি পুরো শক্তি নিয়েও যুদ্ধে নামতে পারবেন না। স্থলবাহিনী পাঠানোর মানে হলো দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী অভিযান। এতে বহু মানুষের প্রাণ যাবে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা কম দেখানোর চেষ্টা করছে পেন্টাগন। এতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এরপর কী হবে? এখন সামনে আছে ডুবে যাওয়া বিনিয়োগের সেই পুরোনো যুক্তি। আরও অর্থ ঢালা হবে। এই যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হবে আরও মানুষকে। যুদ্ধটি এখন এক গভীর কাদায় পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। পেন্টাগন আরও ৬৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে। নতুন অর্থবছরের জন্য হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেট চেয়েছে। এই বিপুল ব্যয়ের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই পড়বে। দেশের সামাজিক খাতে ব্যয় কমে যাবে। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধ করছি। তাই শিশুদের ডে কেয়ার, মেডিকেইড বা মেডিকেয়ারের মতো খাতে খরচ করা সম্ভব নয়। আমাদের একটি বিষয়েই মনোযোগ দিতে হবে। সেটি হলো সামরিক নিরাপত্তা।’
কিন্তু কীসের জন্য এই সামরিক নিরাপত্তা? এই যুদ্ধ তো যুক্তরাষ্ট্র নিজেই শুরু করেছে। কেউ তাদের এমন যুদ্ধ করতে বলেনি। এটি আত্মরক্ষার যুদ্ধও নয়। এটি পরিচালনা করছে এমন একটি গোষ্ঠী, যারা দাদাগিরি আর তোষামোদেই বেশি অভ্যস্ত। ট্রাম্পের এই যুদ্ধের জন্য সবকিছু যেন আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ইরানের শিশু, সাধারণ মানুষ এবং অবকাঠামো তার শিকার হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি তাদের পানীয় জলের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারণ ইরান এমন সব লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছে, যেগুলোর ওপর এসব দেশের জীবন অনেকটাই নির্ভরশীল।
এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের প্রায় প্রতিটি পরিবারের ওপরও পড়ছে। গত সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানির দাম সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ব্রেন্ট তেলের দাম এখন প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রোলের দাম এখন আগের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ। যুক্তরাজ্যেও গ্যাসের দাম আবার বেড়েছে। শুধু এই মাসেই তা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তেলের দাম বাড়ার যে প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তারা পাম্পে গিয়ে অনুভব করবেন, তা আরও দুই সপ্তাহের মধ্যে স্পষ্ট হবে। একই চিত্র বিশ্বের নানা দেশে দেখা যাচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যবহার কমছে। সরকারের বাজেটের ওপর চাপ বাড়ছে। এগুলো শুধু কিছু পরিসংখ্যান নয়। সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ব এখন এক নতুন জ্বালানি বাস্তবতার মুখোমুখি। ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বাস্তবতা আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এর চাপ বিশ্বের প্রায় সব অর্থনীতির ওপর পড়ছে। ধনী পুঁজিবাদী দেশগুলো বেসরকারীকরণ, অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং মুনাফালোভের চাপে আগে থেকেই দুর্বল। দরিদ্র দেশগুলোর সরকারও আর সাধারণ মানুষের ওপর নতুন বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থায় নেই। কারণ মানুষের সহ্য করার সীমা অনেকটাই শেষ হয়ে এসেছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড থেকে কেনিয়া পর্যন্ত বহু দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। অনেক জায়গায় পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এমন অস্থির সময়ে অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো কিছু স্থিতিশীল পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের বিশ্বাসও বাড়ানো দরকার ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে যা দেখা গেল, তা হলো ট্রাম্পের শুল্কনীতি শেষ হওয়ার পর নতুন একটি শুল্কব্যবস্থা চালু করা। গত সপ্তাহেই আগের শুল্কব্যবস্থার মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন ব্যবস্থার যুক্তি হলো, বিভিন্ন দেশ নাকি ‘জোরপূর্বক শ্রম’ মোকাবিলায় যথেষ্ট কাজ করছে না। আপনার যদি মনে হয়, এটি একটি হাস্যকর অজুহাত, কিংবা ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে সত্যিই গভীরভাবে উদ্বিগ্ন নয়, তাহলে আপনাকে বলা হবে আপনি নাকি ‘ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট সিনড্রোমে’ আক্রান্ত। তাদের মতে, আপনার চিকিৎসার প্রয়োজন। এই ধ্বংসাত্মক নীতির জমে থাকা ক্ষতি কমানোর কোনো সহজ উপায় নেই। এমন কোনো ভর্তুকি কিংবা এমন কোনো মূল্যসীমাও নেই, যা বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ও তেল উৎপাদনের কেন্দ্রে আঘাত হানা এত বড় ধাক্কা সামাল দিতে পারে।
আমরা সবাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের এমন এক শাসনের কাছে জিম্মি, সেই শাসন নিজের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করছে অহংকার ও অজ্ঞতার সেবায়। আমরা এমন একটি প্রশাসনের সঙ্গে বাঁধা পড়ে আছি, যারা দেশ পরিচালনা করে ঠিক সেইভাবে, যেভাবে তারা পৃথিবীর অন্য অংশে আচরণ করে। তাদের লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক পয়েন্ট অর্জন। এই খেলায় তাদের কাছে কোনো পদক্ষেপই খুব ছোট নয়। আবার কোনো পদক্ষেপই খুব বড় নয়।
স্মিথসোনিয়ানের প্রদর্শনীর বাইরে সতর্কবার্তা ঝুলিয়ে দেওয়া, যাতে বলা হয় প্রদর্শিত তথ্য ‘ভুল’ হতে পারে। হঠাৎ করে অপরিণামদর্শী শুল্কনীতি চালু করা, অথবা যুদ্ধ সহজ হবে এবং দেখতে দারুণ লাগবে—এই ধারণা থেকে পুরো একটি অঞ্চলকে যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া। সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের আচরণ একই রকম। তিনি কখনো অত্যন্ত হালকা মনোভাব দেখান। কখনো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এক মুহূর্তে তাকে উদাসীন মনে হয়, পরের মুহূর্তেই তাকে ক্ষুব্ধ দেখা যায়। মনে হয় পুরো পৃথিবী যেন তার খেলনা। ইচ্ছা হলে তিনি পৃথিবী নিয়ে খেলেন, তারপর ফেলে দেন, আবার তুলে নেন, নাড়াচাড়া করেন, খোঁচান। আর এসব থামার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের সঙ্গে বাঁধা পড়ে আমরা সবাই এখন হিসাব কষছি। আর্থিক ক্ষতি কত হলো। কত মানুষ মারা গেল। একজন মানুষের নির্বাচিত হওয়ার মূল্য কত দূর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাল। আর সেই মূল্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এমন সব পেশাজীবী, রাজনীতিক ও ভীরু মানুষ, যারা তাকে সমর্থন করছে এবং ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখছে। এই পরিস্থিতি যত দীর্ঘ হবে, ততই এই ক্ষয়ক্ষতি আমাদের জীবনে এক ধরনের স্থায়ী শব্দে পরিণত হবে। একসময় যা কল্পনাতীত ছিল, সেটিই নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠবে। বারবার তাই ঘটবে।
ইরানের যুদ্ধ এই বাস্তবতার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রকাশ। কাল্পনিক সাফল্যের গল্প শোনা গেছে। শেষ ও চূড়ান্ত সামরিক আঘাতের হুমকিও এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসবের জায়গায় এসেছে এক শীতল বাস্তবতা। একটি ভয়াবহ ব্যয়বহুল যুদ্ধ প্রতিদিন বিশ্বের ভূরাজনীতি বদলে দিচ্ছে। বদলে দিচ্ছে রাষ্ট্রের বাজেট। বদলে দিচ্ছে সাধারণ পরিবারের হিসাবও। আর সেটিই আবার নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠছে। ট্রাম্প এখন এক অচল অবস্থায় আটকে গেছেন। শান্তির যে মূল্য দিতে হবে, তা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু সেই মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে পৃথিবীর অন্য সবাইকে।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করছেন তহমিনা মিলি



