
বিদেশে কর্মী প্রেরণে নতুন বাজার খুঁজতে হবে
এ কে এম আতিকুর রহমান [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ৩০ জুলাই ২০২৬]
বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মীদের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী যাওয়ার হার বেশ কিছুটা কমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশে কর্মী প্রেরণের স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন নতুন গন্তব্য অন্বেষণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী এ বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত যাওয়া চার লাখ ৯ হাজার ৬২৪ জন কর্মীর মধ্যে দুই লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৩ জন গেছেন সৌদি আরবে (৫৭.২২ শতাংশ), ৪১ হাজার ৬২৫ জন গেছেন সিঙ্গাপুরে (১০.১৬ শতাংশ), কাতারে গেছেন ৩৪ হাজার ৫৯৮ জন, মালদ্বীপে গেছেন ১৬ হাজার ৮০ জন, কুয়েতে গেছেন ১২ হাজার ৯৫৬ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ১১ হাজার ৫৪১ জন এবং জর্দানে গেছেন ৯ হাজার ৯৫৮ জন। এ ছাড়া অন্যান্য দেশে গেছেন মাত্র ১০ শতাংশের মতো কর্মী।
বিদেশে কর্মী প্রেরণে নতুন বাজার খুঁজতে হবেএ বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত যাওয়া কর্মীদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশেই গেছে ৭১.৬৫ শতাংশ। অন্যান্য আরব দেশে আমাদের কর্মী যাওয়ার হার গত বছরের মতো থাকলেও সৌদি আরবে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। যেমন—২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে সময়কালে সৌদি আরবে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা তিন লাখ হলেও ২০২৬ সালের একই সময়কালে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৩। সৌদি আরবে কর্মী প্রেরণের হার কমে যাওয়ার পেছনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
ওই সব দেশে দিন দিন কর্মক্ষেত্রে যেমন ঝুঁকি বেড়েই চলছে, তেমনি নিয়োগকারীদেরও বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। যেখানে অনিরাপদ কর্মক্ষেত্র থেকে কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে হচ্ছে, সেখানে নতুন কর্মী নিয়োগের ব্যাপারটি অনিশ্চয়তার মধ্যেই পড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কবে নাগাদ স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে, তা-ও অনিশ্চিত। তাই আমাদের কর্মী প্রেরণের ধারাবাহিকতা চলমান রাখতে হলে বিভিন্ন বিকল্প গন্তব্য খুঁজে বের করা ছাড়া উপায় নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের সৌদিতে ২০২৫ সালের চেয়ে ২০২৬ সালে কর্মী প্রেরণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও কাতার বা কুয়েতে ততটা কমেনি।তবে বাহরাইন আর ওমানে কর্মী যাওয়া বলতে গেলে বন্ধই রয়েছে। এদিকে ব্রুনেই শ্রমবাজারে আমাদের কর্মী যান না বললেই চলে। তবে সিঙ্গাপুর, ইতালি ও মালদ্বীপে ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে কর্মী যাওয়ার হার কিছুটা বেড়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে বিদেশে কর্মী প্রেরণের এই নিম্নগতি অব্যাহত থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি হবে।
দেড় শতাধিক দেশে আমাদের কর্মী গিয়ে থাকেন। এমনও কিছু দেশ আছে, যেখানে বাংলাদেশ থেকে বছরে ১০ জনের বেশি কর্মী যান না। কিছু দেশে বছরে সর্বোচ্চ এক হাজার এবং কিছু দেশে ১০ হাজার কর্মী যান। ওই সব দেশে অধিকসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণের সুযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। সেখানে যদি অন্যান্য দেশের কর্মী যান, তাহলে আমাদের কর্মী যেতে পারছেন না কেন, তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। আমাদের কর্মী অধিক হারে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে কী ধরনের এবং কী পরিমাণ কর্মীর চাহিদা রয়েছে, আর্থিকসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কেমন ইত্যাদি জেনে আমাদের কর্মীদের প্রস্তুত করে সেসব গন্তব্যে প্রেরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যেসব শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ বা সংকুচিত হয়েছে বা হতে যাচ্ছে, সেসব দেশের সঙ্গে কূটনীতিক মাধ্যমের পাশাপাশি উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের যোগাযোগ শক্তিশালী করাসহ সেগুলো খোলার বা সম্প্রসারিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
রেমিট্যান্স প্রবাহের গতির সঙ্গে কর্মী প্রেরণের গতির তুলনা করলে আমরা কিন্তু ভিন্ন চিত্র পাই। অর্থাৎ কর্মী প্রেরণের হার নিম্নগামী হলেও তা প্রবাস আয় প্রবাহ বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব এখনো ফেলেনি। ২০২৩ সালের চেয়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রায় তিন ও দুই লাখ কর্মী কম গেলেও ওই দুই বছর রেমিট্যান্স এসেছিল যথাক্রমে পাঁচ ও ১১ বিলিয়ন ডলার বেশি। এমনকি করোনা মহামারির সময় অর্থাৎ ২০২০ সালে দুই লাখ ১৭ হাজার ৬৬৯ জন এবং ২০২১ সালে ছয় লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন কর্মী বিদেশে গেলেও ওই দুই বছর রেমিট্যান্স এসেছিল যথাক্রমে ২১.৭৫ বিলিয়ন এবং ২২.০৭ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ২০২৩ সালে ১৩ লাখ পাঁচ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী বিদেশে গেলেও সে বছর রেমিট্যান্স এসেছিল ২১.৯৪ বিলিয়ন ডলার। আবার অনেক দেশে কর্মী প্রেরণ বন্ধ থাকা (যেমন মালয়েশিয়া) সত্ত্বেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েই চলছে। আসলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করে; যেমন—বিদেশে এরই মধ্যে কর্মরত বাংলাদেশির সংখ্যা এবং তাঁদের দক্ষতা বাড়ায় আয় বৃদ্ধি, সরকারি মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ বৃদ্ধি (সরকারি প্রণোদনার ইতিবাচক প্রভাব), অবৈধ পথে অর্থ প্রেরণ হ্রাস ইত্যাদি। এখানে বলা আবশ্যক যে অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই রেমিট্যান্স বাড়ে না, রেমিট্যান্স আসে প্রবাসে স্থায়ীভাবে বসবাসরত ও অস্থায়ীভাবে কর্মরত সব বাংলাদেশির থেকেই।
যদি বিদেশে কর্মী পাঠানোর গতিকে ঊর্ধ্বগামী করা সম্ভব না হয় এবং সেই ধারা নিম্নগামী হতে থাকে, তবে আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে তা রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বগতিকে থামিয়ে দিতে পারে। তখন শুধু অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে না, দেশের অর্থনীতিতেও ধস নামার আশঙ্কা থাকবে।
এদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করার আগেই তা বন্ধ না হলে এই যুদ্ধের রেশ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে যে তছনছ করে দেবে না, সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তেমনটি হলে আমাদের ওপরও সেই আঁচ এসে লাগবে। তাই সময় থাকতেই মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার নতুন গন্তব্যে আমাদের দক্ষ জনশক্তি প্রেরণ করার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় এনে আমাদের কর্মী প্রেরণের গতিকে ইতিবাচক অবস্থানে রাখতে হলে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২০২৬ সালের মধ্যেই আমাদের বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খোলাসহ সম্ভাব্য নতুন-পুরনো গন্তব্যে অধিক হারে কর্মী প্রেরণের সুবিধা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে হবে।
সব শেষে বলতে হয়, কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মী প্রেরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষ কর্মীর সংখ্যা যত বেশি হবে, রেমিট্যান্স তত বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ২২ থেকে ২৫ শতাংশ মাত্র দক্ষ। যদি দক্ষ কর্মীর সংখ্যা ৭০ শতাংশের কাছাকাছিও নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশের বার্ষিক রেমিট্যান্স বর্তমানের চেয়ে তিন-চার গুণ বৃদ্ধি পাবে। জানি, দেশের বিদ্যমান অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক নিয়ম-নীতি বিবেচনায় এই কাজটি রাতারাতি করা সম্ভব নয়। এ জন্য একটি পাঁচ থেকে ১০ বছর মেয়াদি দক্ষ কর্মী তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মী প্রেরণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
বিশ্ব শ্রমবাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং পরিবর্তনশীল। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই নেতিবাচক জন্মহার পরিলক্ষিত হচ্ছে, যুবক শ্রেণির লোকসংখ্যা আনুপাতিক হারে কমে যাচ্ছে। অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশেই কৃষি, নির্মাণ, পরিচ্ছন্ন ইত্যাদি ক্ষেত্রের কাজগুলো করার জন্য স্থানীয় লোকবলের অভাব দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। আবার অনেক দেশে বিভিন্ন ধরনের কারিগরিসংশ্লিষ্ট কাজের লোকজনের প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা কি সেসব তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের কর্মীদের বিশ্ব শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি? আমরা কি ওই সব দেশে আমাদের প্রশিক্ষিত কর্মীদের প্রেরণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছি? একদিকে আমাদের যেমন দক্ষ কর্মীবাহিনী প্রস্তুত করে রাখতে হবে, অন্যদিকে আমাদের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টার যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সেসব বাজার ধরতে হবে এবং একটি কর্মীবান্ধব প্রক্রিয়া অনুসরণে তাদের পাঠাতে হবে। সেটি করতে সক্ষম হলে কর্মী প্রেরণের গতি যেমন ইতিবাচক অবস্থানে থাকবে, তেমনি প্রবাস আয়ে আসবে আশাতীত ফল।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



