আমেরিকা ফার্স্ট নীতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক

আমেরিকা ফার্স্ট নীতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক
কলামআন্তর্জাতিক

আমেরিকা ফার্স্ট নীতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক

২ আগস্ট, ২০২৬

সানজিদা বারী [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ২ আগস্ট ২০২৬]

অতীত থেকে বর্তমান, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক স্বার্থ, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর।যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ বড় কোনো বাণিজ্যিক অংশীদার না হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার।

 


তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে পরিবর্তন এসেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং পুরো বিশ্বের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পরিবর্তন এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর, আমেরিকা ফার্স্ট নীতি প্রচলন করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক পুনর্বিন্যাস ও টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসির কারণে। এ নীতিতে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য ব্যবস্থা, সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদারদের অর্থনৈতিক নীতিকে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে নিজের স্বার্থ প্রাধান্য দেবে সব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে।

 

 


ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর বাণিজ্য করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এর আগে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পণ্য অনেক সময় বিনা শুল্কে বা স্বল্প শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করত এবং এর ফলে পাল্টাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও উপকৃত হয়েছে। অধিক উৎপাদন ব্যয়ের কারণে যে পণ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন হতো না, সেগুলো আমেরিকার বাইরে উৎপাদন হতো এবং কম খরচে আমেরিকায় আমদানি করা হতো। বর্তমানে এ বাণিজ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে।

 

 

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে শুল্ক। পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক দ্রব্য, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য, দুগ্ধপণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, বাদাম, ফলমূল ইত্যাদি। এ বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

 

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ধারা ৩০১-এর আওতায় ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এর ফলে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের চালানে কার্যকর মোট শুল্কের হার দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৬২ শতাংশ, যার মধ্যে বিদ্যমান ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন বা সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশভিত্তিক শুল্ক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তুলনামূলকভাবে নিম্নস্তরের এ ১০ শতাংশ শুল্কহার বাংলাদেশকে তার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে, যাদের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

 

 

এছাড়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, আমেরিকা ফার্স্ট নীতির পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান শুল্ক চুক্তিতে আরো কয়েকটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। মেধাস্বত্বের সুরক্ষা জোরদার এবং মেধাস্বত্ব চুরির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশ এবং মার্কিন উদ্ভাবক ও সৃজনশীল পেশাজীবীরা উপকৃত হবেন। এছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ। এর আওতায় তৃতীয় দেশের নিয়মবহির্ভূত বাণিজ্যনীতি মোকাবেলায় পরিপূরক পদক্ষেপ নেয়া, রফতানি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা, শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধ এবং উভয় দেশে বিদেশী বিনিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করা হবে।

 

 

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের উচিত একটি দ্বিমুখী অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে সমতা আনার জন্য বাংলাদেশকে আরো বেশি রফতানিযোগ্য পণ্য তৈরি করতে হবে। দুই দেশের মধ্যে রফতানি বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি।

 

 

বাংলাদেশে উৎপাদন কার্যক্রম স্থাপনে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করতে হলে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। যেমন স্থিতিশীল কর ও শুল্কনীতি, দ্রুত ব্যবসা নিবন্ধন এবং লাইসেন্স প্রদান, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বন্দরসেবা, শক্তিশালী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, স্বচ্ছ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, সহজে মুনাফা বিদেশে পাঠানোর সুযোগ এবং বাণিজ্যিক বিরোধের দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তি ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব সংস্কার করা গেলে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উৎপাদন ও বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এছাড়া ধীরগতির শুল্ক ছাড়পত্র, অতিরিক্ত কাগজপত্র এবং পরিবহন বিলম্বের কারণে বাংলাদেশী পণ্যের খরচ বেড়ে যায়।

 

 দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে কাগজবিহীন ব্যবস্থা, পণ্য পৌঁছার আগেই শুল্ক প্রক্রিয়া শুরু করা এবং সীমান্ত বাণিজ্যের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরো গ্রহণযোগ্য হবে। এদিকে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় অধিকাংশ বাংলাদেশী পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক বজায় রাখলেও নির্দিষ্ট কিছু পণ্য শূন্য শতাংশ শুল্ক সুবিধা পেতে পারে। কোন পণ্যগুলো এ সুবিধা পাবে, বাংলাদেশকে দ্রুত তা শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে রফতানিকারকদের এ বিষয়ে অবহিত করা এবং পণ্যের উৎপত্তি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র-সংক্রান্ত শর্ত পূরণে সহায়তা করা জরুরি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার রক্ষা ও শ্রম আইনের কার্যকর প্রয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার রয়েছে। এসব মান নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ বিদ্যমান তৈরি পোশাক রফতানি রক্ষার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমূল্যের বাজারেও প্রবেশ করতে পারবে।

 

 

বাংলাদেশে একটি বৃহৎ, তরুণ ও ক্রমবর্ধমান দক্ষ জনশক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিচের সেবাগুলোর রফতানি বাড়ানোর দাবি করতে পারে—সফটওয়্যার উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা সেবা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, হিসাবরক্ষণ, গ্রাফিক ও ডিজিটাল ডিজাইন এবং গ্রাহকসেবা। দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য স্থানান্তর, ই-কমার্স এবং সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

 

 

 বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে নিচের খাতগুলোতে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে—নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত, টেলিযোগাযোগ, সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের জন্য মানসম্মত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ অংশীদার হতে পারে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, যন্ত্রপাতি, কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, জ্বালানি প্রযুক্তি ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনার পরিমাণ বাড়াতে পারে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমবে।

 

 

পাশাপাশি বাংলাদেশী উৎপাদনকারীরা মার্কিন সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অধিক সুবিধা পাওয়ার আলোচনাও শক্তিশালী হবে। এছাড়া বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহরগুলোতে নিয়মিত বাণিজ্য প্রতিনিধি দল পাঠানো। বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো মার্কিন আমদানিকারক, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারীদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে পারে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসীরাও দেশী পণ্যের প্রচার এবং প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

 

অবশেষে বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক পুরনো এবং এ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সবসময়ই ছিল সাহায্য ও সহযোগিতার। নিউইয়র্ক টাইমসের মার্চ ১০, ১৯৭৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সাহায্যদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা এখনো বর্তমান। এ সহযোগিতার সম্পর্ক যেন অটুট থাকে সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশকে কাজ করতে হবে।

 

 

বাংলাদেশকে এখন কম খরচে তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পরিচিত থাকার পরিবর্তে একটি নির্ভরযোগ্য, মানসম্মত, বহুমুখী উৎপাদন অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কার্যকর বন্দর ব্যবস্থা, স্বচ্ছ নীতিমালা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা সম্প্রসারণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে। এছাড়া আমেরিকা ফার্স্ট পলিসিতে আমেরিকা যেমন আমেরিকাকে প্রাধান্য দিচ্ছে তেমনি বাংলাদেশ ফার্স্ট পলিসিতে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে।

 

 

সানজিদা বারী: ডক্টরাল ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো

ট্যাগ:BCSকলামআন্তর্জাতিক