সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র
সংবাদআন্তর্জাতিক

সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

১২ জুলাই, ২০২৬

জাহিদুল ইসলাম জন [সূত্র : আমাদের সময়,১৩ জুন ২০২৬]

দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এমওইউ) ঘিরে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিমান হামলা তিনি স্থগিত করেছেন, কারণ উভয় পক্ষ একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে তেহরান এখনও বলছে, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

 

 

সর্বশেষ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উভয় পক্ষের মধ্যে অন্তর্বর্তী একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগোলেও পূর্ণাঙ্গ

চুক্তির আগে এখনও বেশ কয়েকটি জটিল ইস্যু অমীমাংসিত রয়েছে। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়াকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি।

 

 

ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, সম্ভাব্য চুক্তির মূল বিষয়গুলো নীতিগত ও বিস্তারিত পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে। তিনি জানান, ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ আপাতত বহাল থাকবে এবং চুক্তি চূড়ান্ত হলে স্বাক্ষরের সময় ও স্থান ঘোষণা করা হবে।

পরে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, চুক্তি হয়তো সপ্তাহান্তেই স্বাক্ষর হতে পারে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে জানান, তেহরান এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

 

 

এদিকে এনবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন হামলা শুরু করার মাত্র তিন ঘণ্টা আগে ট্রাম্প তা স্থগিত করেন। ফলে সম্ভাব্য সমঝোতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

 

 

সমঝোতা স্মারকের দুটি পৃথক খসড়া সামনে এসেছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থ মেহর প্রকাশিত ১৪ দফা খসড়ায় যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফেরতের মতো বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

 

অন্যদিকে মার্কিন অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে প্রকাশিত খসড়াটি তুলনামূলকভাবে সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ। এতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণকে ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

 

 

তবে উভয় খসড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলোÑ ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং সেই সময়ের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা অব্যাহত রাখা।

 

 

ইরানের খসড়ায় কী আছে : ইরানি খসড়া অনুযায়ী লেবাননসহ সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহার, ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানি ব্যবস্থাপনায় হরমজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত, ইরানের পুনর্গঠনে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি, ২৪ বিলিয়ন ডলার জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা, তার অর্ধেক চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই ছাড়, ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনার কাঠামো তৈরি।

 

 

ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টি আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।

 

 

মার্কিন সংস্করণে কী রয়েছে : মার্কিন সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ হরমুজ প্রণালি তাৎক্ষণিকভাবে টোলমুক্তভাবে খুলে দেওয়া, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ে আলোচনা, পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতি, ধাপে ধাপে প্রত্যাহারযোগ্য নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ।

 

 

তবে ইরানের দাবি অনুযায়ী বিপুল পুনর্গঠন তহবিল বা ক্ষতিপূরণের বিষয়টিতে মার্কিন খসড়ায় তেমন গুরুত্ব নেই।

 

 

অমীমাংসিত তিন বড় ইস্যু : ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরবর্তী ৬০ দিনে তিনটি মূল বিষয়ে আলোচনা হবেÑ ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কাঠামো, যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ। তেহরানের অবস্থান হলো, জব্দকৃত সম্পদের অর্ধেক ফেরত এবং তেল নিষেধাজ্ঞা স্থগিত না হলে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে না।

 

 

চুক্তি জেনেভা নাকি ভিয়েনায় : সম্ভাব্য স্বাক্ষর অনুষ্ঠান কোথায় হবে তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জেনেভা বর্তমানে সবচেয়ে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন বলেও খবর রয়েছে। তবে ইরানি সূত্রগুলো ভিয়েনাকেও সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেছে।

 

 

চলমান প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে। বেশ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতাকে ‘ইসলামাবাদ ঘোষণা’ নামেও উল্লেখ করা হচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অর্জিত অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা প্রকাশ করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিকদের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন।

 

 

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সব চাপ ও হুমকির মধ্যেও ইরান তার স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করবে। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেন নোয়েল ব্যারট টেলিফোনে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা নিয়ে কথা বলেছেন।

 

 

সম্ভাব্য চুক্তির অন্যতম আলোচিত অংশ হলো লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে, সমঝোতা হলে ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করবে। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েলি সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

 

 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। ইসরায়েলি সূত্রগুলোর মতে, এমনকি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও তা চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেবেÑ এ বিষয়ে তেল আবিব নিশ্চিত নয়। একই সঙ্গে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে, যাতে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার প্রশ্নে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়।

 

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, উভয় পক্ষের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়েই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত চুক্তির ঘোষণা দেয়নি। তৃতীয়ত, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাÑ এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

ট্যাগ:BCSসংবাদআন্তর্জাতিক