দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন পিছিয়ে

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন পিছিয়ে
সংবাদআন্তর্জাতিক

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন পিছিয়ে

২ আগস্ট, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ আসিয়ানের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৬০ শতাংশেরও বেশি তানিয়া আফরোজ [প্রকাশ: কালের কণ্ঠ, ০২ আগস্ট ২০২৬]

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার কথা। কারণ নৈকট্যের ফলে পরিবহন ব্যয় কমে, বাজারে প্রবেশ সহজ হয় এবং সরবরাহব্যবস্থা দ্রুত ও কার্যকরভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়।ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আসিয়ান সেই বাস্তবতারই উদাহরণ।

 


কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র ভিন্ন। এখানে আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকশিত হয়নি। বহু ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা অর্থনৈতিক স্বার্থকে ছাপিয়ে গেছে।

 


ফলে প্রশ্ন উঠছে—দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য পিছিয়ে থাকার কারণ কি শুধু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, নাকি এর গভীরে রয়েছে রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা?

 

 

সহযোগিতার স্বপ্ন, সীমিত অগ্রগতি

আশির দশক থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে সার্ক গঠনের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। পরে ১৯৯৩ সালে সাপটা এবং ২০০৪ সালে সাফটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। লক্ষ্য ছিল ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলা।

 


কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই কাঠামো প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ আসিয়ানের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৬০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ সহযোগিতার কাঠামো থাকলেও কার্যকর অর্থনৈতিক সংহতি এখনো অর্জিত হয়নি।

 

রাজনীতি যখন বাজারের নিয়ন্ত্রক

আঞ্চলিক বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আস্থার সংকট।বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক।২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর ভারত পাকিস্তানের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। একই বছরের আগস্টে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিত করে দেয়। এরপর দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং বাণিজ্য কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

 

 

২০২৫ সালে পেহেলগাম হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ভারত পাকিস্তান থেকে সব ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে। এতে শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ঐক্য আরো দুর্বল হয়।

 

 

ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনাও একইভাবে আঞ্চলিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ও ভারতের প্রতিরক্ষামূলক বাণিজ্যনীতি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সংহতিকে দুর্বল করছে।

 

 

এদিকে মালদ্বীপে ভারতের প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণা নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বাণিজ্য পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

 

 

সীমান্ত যত কাছে, ব্যয় তত বেশি

রাজনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার বড় সংকট কাঠামোগত দুর্বলতা। অশুল্ক বাধা, জটিল কাস্টমস প্রক্রিয়া, দীর্ঘ সীমান্ত অপেক্ষা, ভিন্ন মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত কাগজপত্র বাণিজ্য ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

 

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. সঞ্জয় কাঠুরিয়ার মতে, আস্থার ঘাটতি এবং উচ্চ পরিবহন ব্যয়ই আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রধান বাধা।

 

 

সবচেয়ে বড় সমস্যা সংযোগ অবকাঠামোতে। রেল, সড়ক ও সমুদ্রপথে পর্যাপ্ত আন্তর্দেশীয় যোগাযোগ না থাকায় প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাণিজ্য অনেক সময় দূরের দেশের তুলনায়ও বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে ভারতের জন্য ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্য পাকিস্তানের তুলনায় সস্তা।

 

 

হারানো সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ সম্ভাব্য বাণিজ্য অন্তত ৬৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারত। অর্থাৎ প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনো অনাবিষ্কৃত। এই ব্যবধান শুধু পরিসংখ্যানের নয়—এটি হারানো শিল্পায়ন, হারানো কর্মসংস্থান এবং স্থগিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাণিজ্য বাধা কমানো গেলে এই সম্ভাবনার বড় অংশ বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

 

 

বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো সীমিত। বিশ্বব্যাংকের ‘এ গ্লাস হাফ ফুল : দ্য প্রমিজ অফ রিজিওনাল ট্রেড ইন সাউথ এশিয়া’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের মাত্র ৯ শতাংশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে হয়। অথচ এই বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি, বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি।

 

 

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের অপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে প্রায় ৭.৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করে, যেখানে সম্ভাবনা প্রায় ১৮.৯ বিলিয়ন ডলার।

 

 

অর্থাৎ আঞ্চলিক বাজারের বড় অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত। এসব বাধা কমানো গেলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

 

মূলত, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যের চিত্র এক অর্ধভর্তি গ্লাসের মতো—যেখানে সম্ভাবনা স্পষ্ট, কিন্তু বাস্তবায়ন সীমিত। এখানে বাজার, জনসংখ্যা এবং শ্রমশক্তির কোনো ঘাটতি নেই; ঘাটতি মূলত আস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর সংযোগ ব্যবস্থার। এই তিন বাধা অতিক্রম করা গেলে দক্ষিণ এশিয়া একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয়ে পরিণত হতে পারে।

 

ট্যাগ:BCSসংবাদআন্তর্জাতিক