বড় সমঝোতা ছাড়াই শেষ ট্রাম্পের বেইজিং সফর

বড় সমঝোতা ছাড়াই শেষ ট্রাম্পের বেইজিং সফর
সংবাদআন্তর্জাতিক

বড় সমঝোতা ছাড়াই শেষ ট্রাম্পের বেইজিং সফর

১২ জুলাই, ২০২৬

জাহিদুল ইসলাম জন [সূত্র : আমাদের সময়, ১৬ মে ২০২৬]

বড় কোনো ফলাফল বা সমঝোতা ছাড়াই চীন সফর শেষ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনের রাজধানী বেইজিং থেকে শুক্রবার দেশে ফিরেছেন তিনি। ইরান যুদ্ধ নিরসনে তাৎক্ষণিক কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি তার এ সফরে; তবে দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক নতুন করে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে­Ñ এমন ইঙ্গিত মিলেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত নিরসনে বেইজিং এখন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

 

 

দুই নেতার মধ্যে টানা দুই দিনের বৈঠকে ইরান যুদ্ধ, তাইওয়ান, বাণিজ্য, জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। তবে সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সংকট।

 

 

ইরানের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক অংশীদার এবং দেশটির সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা চীন শুরু থেকেই যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বেইজিং বৈঠকে ট্রাম্প চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন কিনা, তা নিয়ে ওয়াশিংটনে জোর আলোচনা থাকলেও সফর শেষে কোনো স্পষ্ট সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।

 

 

তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প ও শি একমত হয়েছেন যে হরমুজ প্রণালি অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিকে সামরিকীকরণের বিরোধিতা করবে এবং সেখানে টোল আরোপের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে।

 

 

ট্রাম্প মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, শি জিনপিং ইরান সংকট সমাধানে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং চীন ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এনবিসিকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছে ইরান সংকট সমাধানে সহযোগিতা চায়নি।

 

 

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনও তাদের পুরনো অবস্থানেই রয়েছেÑ সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান। বেইজিং বারবার বলছে, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার রয়েছে, তবে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে নাÑ এমন প্রতিশ্রুতিকে চীন সমর্থন করে।

 

 

এদিকে ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে চীনের যেকোনো কূটনৈতিক উদ্যোগকে ইরান স্বাগত জানাবে।’ তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়নি, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের কারণে শান্তির পথ কঠিন হয়ে উঠেছে।

 

 

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ইস্যু ট্রাম্পের সফরকালে বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই চায় এই নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল অব্যাহত থাকুক।

 

 

সফরে সম্ভাব্য একটি মার্কিন-চীন জ্বালানি চুক্তিরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি জ্বালানি আমদানি করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি বেইজিং।

 

 

ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যুতেও দুই নেতার মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গেছে। শি জিনপিং ট্রাম্পকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়। চীনা বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তাইওয়ান ইস্যু সঠিকভাবে সামাল দেওয়া না হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত, এমনকি মুখোমুখি অবস্থাও তৈরি হতে পারে।’

 

 

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুনঃএকত্রীকরণের হুমকি দিয়ে আসছে। তবে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, তাইওয়ান বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

 

 

সফরের আগে ট্রাম্প যে বিশাল বাণিজ্যচুক্তির কথা বলেছিলেন, তার বেশির ভাগই এখনও অস্পষ্ট। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রের দাবি করেছেন, আগামী তিন বছরে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে। ওদিকে ট্রাম্প দাবি করেন, চীন ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে এসব চুক্তির বিষয় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি চীন; তাদের পক্ষ থেকে শুধু বলা হয়েছে, দুই দেশ অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

 

 

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সফরে দুই নেতার ব্যক্তিগত উষ্ণতা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জেং উপস্থিত ছিলেন, যা বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মানের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

 

গ্রেট হল অব দ্য পিপলে সামরিক ব্যান্ড, শিশুদের পতাকা নাড়ানো এবং জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানো হয়। এমনকি ঝংনানহাই কমপ্লেক্স ও ঐতিহাসিক উদ্যানও ঘুরিয়ে দেখান শি জিনপিং।

 

 

ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো পারস্পরিক সম্মান।’

 

 

বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং অত্যন্ত সচেতনভাবে পুরো সফরকে এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে বিশ্ববাসীর কাছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন স্থিতিশীলতার বার্তা পৌঁছে যায়।

 

 

বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের মধ্যে ট্রাম্প-শি বৈঠক অন্তত একটি বার্তা দিয়েছে­Ñ ওয়াশিংটন ও বেইজিং সরাসরি সংঘাত নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলায় আগ্রহী। যদিও ইরান যুদ্ধ বন্ধে এখনও কোনো কার্যকর রূপরেখা প্রকাশ পায়নি, তবু চীনকে কেন্দ্র করে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগই এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানোর একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।

ট্যাগ:BCSসংবাদআন্তর্জাতিক