কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া প্রতিশ্রুতির মতোই শুল্ক সুবিধা চায় জাপান

বদরুল আলম [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ৫ অক্টোবর ২০২৫]

যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া প্রতিশ্রুতির মতোই শুল্ক সুবিধা চায় জাপান

বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার দেশ জাপান। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো নিবিড় করতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে। চলতি বছর চুক্তিটি সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নিয়ে প্রস্তাবিত চুক্তির প্রতিশ্রুতি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা ইপিএর দরকষাকষিতে শুল্ক সুবিধা আদায়ের কৌশল হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া শুল্ক সুবিধার বিষয়গুলো। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া প্রতিশ্রুতির মতোই শুল্ক সুবিধার দাবি করা হচ্ছে জাপানের পক্ষ থেকে।

 

 


বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ইপিএ শীর্ষক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। দুই দেশের সরকার ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর যৌথভাবে ‘জয়েন্ট স্টাডি গ্রুপ অন দ্য পসিবিলিটি অব আ জাপান-বাংলাদেশ ইপিএ’ শীর্ষক সম্ভাবতা যাচাই সমীক্ষার ঘোষণা দেয়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পায় ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর। এরপর একাধিক আলোচনায় দরকষাকষি হয়। এ ধারাবাহিকতায় ইপিএ চুক্তিটি চলতি বছরেই সম্পন্ন হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 


জাপানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে এমন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, চুক্তির আলোচনার পর্যায় প্রায় শেষ। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে দুই দেশের আলোচনায় নতুন উপাদান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ এগ্রিমেন্ট’ শীর্ষক চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া বাংলাদেশের প্রতিশ্রুত বাণিজ্য সুবিধার বিষয়াদি যুক্ত হয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রকে যে ধরনের শুল্ক সুবিধা দেয়া হচ্ছে সেই একই ধরনের সুবিধা যেন জাপানকেও দেয়া হয়। এক্ষেত্রে তাদের দাবির কেন্দ্রে রয়েছে জাপান থেকে গাড়ি আমদানিতে উচ্চ হারের শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইপিএ নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষিতে যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া বাণিজ্য সুবিধার বিষয়গুলো (জাপান) রেফারেন্স হিসেবে উত্থাপন করছে।’

 

 

বাংলাদেশ-জাপান ইপিএর অগ্রগতি বিষয়ে জানতে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি বছরই বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি।’

 

 

কোনো পণ্যে শুল্ক সুবিধা আদায়ে জাপান যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে কিনা বা উত্থাপন করেছে কিনা জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী একপক্ষীয়, দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ যদি নির্দিষ্ট কোনো পণ্যে শুল্ক ছাড় দেয়; এরপর বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গে এফটিএ বা ইপিএ করার ক্ষেত্রে সেই দেশও একই ধরনের সুবিধার দাবি করতে পারে।’

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তির আওতায় শুল্ক সুবিধা পেতে দেশটিকে একাধিক আমদানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো কৃষিপণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। গত ২০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে এক সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশ প্রতি বছর ৭ লাখ টন গম আমদানি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সরকার এরই মধ্যে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে।

 

 

গম ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা (কটন) ও অন্যান্য কৃষিপণ্য কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশ সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটি থেকে পণ্য ও সেবা আমদানি আগামী দেড় বছরের মধ্যে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বড় অংকের ক্রয় চুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজ ক্রয়, জ্বালানি খাতে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানির পরিকল্পনা সামনে এনেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও বিশেষ বন্ডেড ওয়্যারহাউজের মাধ্যমে কটন আমদানির সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

 

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মতোই সুবিধার প্রত্যাশা করছে জাপান। এক্ষেত্রে জাপান থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর আরোপ থাকা উচ্চ হারে শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী।

 

 

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আব্দুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাপানের সঙ্গে ইপিএর ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা হলো জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা। জাপান তাদের দেশ থেকে গাড়ি আমদানিতে উচ্চ হারে আরোপ করা শুল্ক হ্রাসের সুবিধা দাবি করতে পারে। কিন্তু সেটা দেয়া ঠিক হবে না। আমরা চাই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ বৃদ্ধি হোক।’

 

 

জেবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি আনোয়ার শহীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাপানের সঙ্গে আলোচনার পর্যায়টি শেষ হয়ে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো উল্লেখের কারণ হলো সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। সুবিধা আমরা দেব কিনা সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত। জাপানের সঙ্গে আমরা দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে যাচ্ছি, এক্ষেত্রে ডব্লিউটিওর কোনো ধারা বা বিষয় বিবেচ্য বলে আমি মনে করি না। ইপিএ নিয়ে আলোচনায় দরকষাকষিতে জাপান সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে, সেটাই স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তারা রেফার করছে দরকষাকষির কৌশল হিসেবে। আমরা যেটা দিতে পারব সেটা নিয়েই অগ্রসর হব। জাপান তাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করবে, তেমনি আমরাও আমাদের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখব।’

 

 

জাপান থেকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে আছে যন্ত্রপাতি ও মেকানিক্যাল ডিভাইস, বৈদ্যুতিক মেশিন ও যন্ত্রপাতি, ইস্পাত ও লোহাজাত পণ্য, রাসায়নিক পদার্থ, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য এবং গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ। জাপানে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রফতানি পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক খাদ্য (মাছ ও চিংড়ি), হোম টেক্সটাইলস, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষিপণ্য যেমন তাজা সবজি ও ফল।

 

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাপান থেকে বাংলাদেশ ১৮১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাপানে ১৩১ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে জাপানের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই স্টকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি ৭১ লাখ ডলারে। আর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত জাপানের প্রতিশ্রুত ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ২৩২ কোটি ডলার। একই সময় পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ২ হাজার ২৩৬ কোটি ডলার।

 

 

জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা যাচাই করতে গঠিত যৌথ গবেষণা দল চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, চুক্তিটি হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। তবে পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সক্ষমতায় অগ্রসর, অন্যদিকে বাংলাদেশ শ্রমঘন শিল্প ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দুই দেশের অর্থনীতি একে অন্যের পরিপূরক। এক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ ইপিএ স্বাক্ষরিত হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বহুগুণে বাড়বে।

 

 

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করবে। এতে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। এ প্রেক্ষাপটে একটি ইপিএ বাংলাদেশের রফতানি খাতকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

 

 

যৌথ গবেষণা দল আলোচনার জন্য মোট ১৬টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য বাণিজ্য ও বাজার প্রবেশাধিকার, রুলস অব অরিজিন, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদসংক্রান্ত মান, প্রযুক্তিগত বাধা, সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব, প্রতিযোগিতা নীতি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, সরকারি ক্রয়, শ্রম ও পরিবেশ, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি।

 

 

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, অবকাঠামো ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক মান ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থায় দুর্বলতা। অন্যদিকে জাপানের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বিনিয়োগ সুরক্ষা, স্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতি ও স্বচ্ছ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর। যৌথ গবেষণা দলের মতে, এ চুক্তি স্বাক্ষর হলে তা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠ করবে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াবে এবং টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখবে। তবে বাংলাদেশকে এজন্য অভ্যন্তরীণ নীতি, আইনি কাঠামো ও বাণিজ্য সহায়ক অবকাঠামোতে সংস্কার ও উন্নয়ন আনতে হবে।

 

 

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চম দফা বৈঠকটি চলতি বছরের ২০ থেকে ২৬ এপ্রিল টোকিওতে অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকের বিষয়ে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে পণ্য বাণিজ্য, সেবা খাত, বিনিয়োগ, উৎপত্তি নির্ধারণের নিয়ম, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্য সহজীকরণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন অধ্যায়ের খসড়া পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয়, উভয় পক্ষ এসব খসড়া নথি পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করেছে।

 

 

ষষ্ঠ দফা বৈঠকটি ২১ থেকে ২৬ জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়, যা সামনাসামনি এবং অনলাইনের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। এ দফায় জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়, আগের আলোচনার ধারাবাহিকতায় পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শুল্ক সহায়তাসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং কাস্টমস সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে দুই পক্ষই পারস্পরিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

 

 

সপ্তম দফা বৈঠকটি ৩ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর টোকিওতে অনুষ্ঠিত হয়, যা একইভাবে সামনাসামনি ও অনলাইন পদ্ধতির সমন্বয়ে সম্পন্ন হয়। এ নিয়ে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, আলোচনায় পণ্য বাণিজ্য, সেবা খাত, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মকানুন, পণ্যে প্রযুক্তিগত বাধা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামোসহ একাধিক অধ্যায়ের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আরো বলা হয়, উভয় পক্ষ আলোচনার গতি বজায় রেখে দ্রুত চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে পরবর্তী বৈঠকে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।

 

 

ইপিএর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাপানকে এবং জাপান বাংলাদেশকে কী ধরনের সুবিধা দিতে পারে তার ব্যাখ্যায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ জাপানি শিল্পজাত পণ্য যেমন যন্ত্রপাতি, যানবাহন ও ইলেকট্রনিকসের ওপর পর্যায়ক্রমিক শুল্ক হ্রাস করতে পারে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ সুবিধা দিতে পারে। এছাড়া সীমিত সেবা খাত যেমন লজিস্টিকস, ব্যাংকিং, আইসিটিতে সুবিধাসহ সরকারি ক্রয়ে সীমিত প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তিগত ও ফাইটোস্যানিটারি মানের সঙ্গে সমন্বয় এবং সবুজ শক্তি, ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ দিতে পারে।

 

 

বিনিময়ে জাপান বাংলাদেশী পণ্য (গার্মেন্টস, বস্ত্র, চামড়া, পাট ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য ইত্যাদি) ও সেবা খাতের (হোম কেয়ার, বয়স্কদের সেবা খাত ইত্যাদি) জন্য শুল্কমুক্ত বা প্রাধান্যপ্রাপ্ত বাজার প্রবেশাধিকার সুবিধা দিতে পারে। এছাড়া জাপান উচ্চপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, বাংলাদেশী উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা ও জাপানে পড়াশোনা করতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কাজের অনুমতি এবং বাংলাদেশের শিল্প খাতে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তর এবং বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে শক্তিশালীভাবে সংযুক্ত করার সুযোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো জাপানি ইকোনমিক জোনে উৎপাদনের মাধ্যমে শুল্ক ছাড়াই পণ্য তাদের দেশের বাজারের জন্য নিয়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সংবেদনশীল খাতের জন্য পর্যায়ক্রমিক মুক্তি বা নেগেটিভ লিস্টের মাধ্যমে গঠিত এ ব্যবস্থা উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে, শিল্প ও প্রযুক্তি সক্ষমতা শক্তিশালী করবে, দীর্ঘমেয়াদি বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে এবং জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা অর্জন করতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন তারা।

 

 

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সুবর্ণ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত এবং জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-জাপান এফটিএ এমনভাবে তৈরি করা যেতে পারে, যা পারস্পরিক সুবিধার সমতা নিশ্চিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রকে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কমানোর বিনিময়ে যেসব সুবিধার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে জাপানের সঙ্গে ঐতিহাসিক বাণিজ্য সম্পর্ক ও সম্ভাবনার বিবেচনায় একইভাবে বিশেষ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। এতে বাংলাদেশ নানাভাবে অপেক্ষাকৃত বেশি লাভবান হতে পারে। তবে এ সুবিধায় ব্যাপক পার্থক্য থাকবে, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশ বিপরীতমুখী বাণিজ্য সম্পর্ক চালিয়ে আসছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক বেশি সারপ্লাস (আমদানির চেয়ে রফতানি অনেক বেশি, গড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪), অন্যদিকে জাপানের সঙ্গে ঘাটতি (রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি, গড়ে ০.৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি)। এ ধরনের সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে শুধু জাপান নয়, বাংলাদেশও তার রফতানি গন্তব্য বিস্তারের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারে।’