যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলার মুখোমুখি অবস্থান ও বৈশ্বিক উদ্বেগ
ড. সুজিত কুমার দত্ত [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫]

ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট এখন আর শুধু দক্ষিণ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর শক্তি প্রদর্শনের এক নতুন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজে পূর্ণ অবরোধ আরোপ করার পর পরিস্থিতি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন যখন কারাকাসের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পতন নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে মস্কোর পর বেইজিংয়ের সরাসরি সমর্থন মাদুরো সরকারকে নতুন প্রাণশক্তি জোগাচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পর এবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের মাদুরোর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এই পুরো বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাশিয়া অনেক আগে থেকেই মাদুরোর প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক মিত্র।
প্রথমেই বোঝা দরকার চীন-ভেনেজুয়েলা সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থে গড়ে উঠেছে। চীন বর্তমানে ভেনেজুয়েলার বৃহত্তম তেল ক্রেতা, যার মাধ্যমে চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪ শতাংশ পূরণ হয়। গত দশকে ‘তেলের বিনিময়ে ঋণ’ চুক্তির আওতায় চীন ভেনেজুয়েলাকে ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণ দিয়েছে, যার একটি বড় অংশ এখনো পরিশোধিত হয়নি। তাই ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার চাপ ও অস্থিতিশীলতা সরাসরি চীনের অর্থনৈতিক ও শক্তি নিরাপত্তার স্বার্থকে প্রভাবিত করে। মাদুরো সরকার যদি পড়ে যায়, তবে বেইজিংয়ের সেই বিপুল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। নতুন কোনো সরকার সেই ঋণ মেনে নেবে কি না তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। সুতরাং চীনের জন্য মাদুরো সরকারকে সমর্থন করা একটি বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সুরক্ষা কৌশল। চীনের এই সমর্থনের পেছনে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার সংকটে চীনের অটল অবস্থানের পেছনে কাজ করছে অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ। প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে বেইজিংয়ের কাছে কারাকাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বর্তমানে চীন ভেনেজুয়েলার তেলের বৃহত্তম ক্রেতা। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের ‘তেলের বিনিময়ে ঋণ’ চুক্তির মাধ্যমে চীন দেশটিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ফলে মাদুরো সরকারের পতন ঘটলে বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে এই বিশাল বিনিয়োগ এবং ঋণের অর্থ ফেরত পাওয়া সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। পরিশেষে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথাগত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ভেনেজুয়েলা বেইজিংয়ের জন্য একটি মোক্ষম ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত ঘাঁটি। মূলত নিজের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ রক্ষা এবং ওয়াশিংটনের ওপর কৌশলগত চাপ বজায় রাখতেই শি চিনপিং পুতিনের পর এখন মাদুরোর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, যা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সংকেত দিচ্ছে।
যদিও চীন মাদুরোর পাশে দাঁড়িয়েছে, তবু বেইজিংকে খুব সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। দীর্ঘদিনের শুল্ক যুদ্ধ এবং বাণিজ্য বিরোধের পর দুই দেশের সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। বেইজিং একদিকে যেমন তার জ্বালানি স্বার্থ এবং কৌশলগত মিত্রকে রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও নিতে চায় না। তাই ওয়াং ই-র বিবৃতিতে ‘হয়রানির বিরোধিতা’র কথা থাকলেও সরাসরি কোনো সামরিক সহায়তার ঘোষণা আসেনি।
ভেনেজুয়েলা ইস্যু এখন রাশিয়া-চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতীকী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প যখন মাদুরো সরকারকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করছেন, তখন পুতিন ও চিনপিং তাঁকে একটি বৈধ সার্বভৌম শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে রক্ষা করছেন। এটি অনেকটা বিংশ শতাব্দীর শীতল যুদ্ধের ছায়া মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো বৃহৎ শক্তির দাবার ঘুঁটি হয়ে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান এবং অবরোধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা শুধু ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের কষ্টই বাড়াবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। মাদুরোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো চীনের এই অস্পষ্ট সহায়তার আশ্বাসকে বাস্তবে রূপান্তর করা। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো চীনের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে কিভাবে ভেনেজুয়েলায় তাদের লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এখন একটি ‘ডিপ অ্যান্ড লং-টার্ম স্ট্র্যাটেজিক টেস্ট’। এটি শুধু একটি দেশের শাসন পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক আইনের শাসন বনাম শক্তির রাজনীতির লড়াই। চীন ও রাশিয়ার সমর্থন মাদুরোর ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে পারে, কিন্তু মার্কিন অবরোধ ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে আরো পঙ্গু করে দেবে। ধারণা করা হয়, শেষ পর্যন্ত কারাকাসের ভাগ্য নির্ধারিত হবে বেইজিং এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার বৃহত্তর দর-কষাকষির টেবিলে। পুতিনের পর চিনপিংয়ের এই অবস্থান নিশ্চিতভাবেই ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে যে আমেরিকার ‘পেছনের উঠোনে’ এখন অন্য কারোর আধিপত্য বাড়ছে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়