কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সংকট : যুদ্ধ কি আসন্ন

ড. সুজিত কুমার দত্ত [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২১ নভেম্বর ২০২৫]

যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সংকট : যুদ্ধ কি আসন্ন

আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক উচ্চতায় পৌঁছেছে। সামরিক মহড়া, শক্তি প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক হুমকি—সব মিলিয়ে ক্যারিবীয় সাগরের জলসীমা যেন হঠাৎই ভূ-রাজনৈতিক ফুটন্ত কড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড যখন লাতিন আমেরিকার জলসীমায় পৌঁছেছে, তখন ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এটিকে আন্তর্জাতিক মাদকপাচার দমনের একটি স্বাভাবিক কৌশল হিসেবে দাবি করা হলেও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এটিকে তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি সুস্পষ্ট সামরিক পাঁয়তারা হিসেবে দেখছেন।

 

 

মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কেবল একটি রণতরিতেই সীমাবদ্ধ নেই।

 
মার্কিন প্রতিরক্ষা সূত্র অনুযায়ী, আরো একটি রণতরি ভেনেজুয়েলার জলসীমার অত্যন্ত কাছে অবস্থান নেবে। এর পাশাপাশি আমেরিকাশাসিত অঞ্চল পুয়ের্তো রিকোতে যুদ্ধবিমান মোতায়েন এবং ক্যারিবীয় সাগরে আরো ছয়টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি পরিস্থিতির পারদকে আরো উত্তপ্ত করেছে। এর সঙ্গে একটি পারমাণবিক সাবমেরিনও যুক্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি, যার নির্দেশ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় তিন সপ্তাহ আগে দিয়েছিলেন, তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য আন্তঃসীমান্ত মাদকপাচার চক্র নির্মূল করা হলেও এর নেপথ্যের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
 
মাদুরো প্রশাসনও নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিশাল বাহিনী মোতায়েনসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই অপারেশনের উদ্দেশ্য আন্তঃসীমান্ত মাদকপাচার চক্র নির্মূল করা। কয়েক সপ্তাহে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের লাতিন উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনী অন্তত ২০টি অভিযানে অংশ নিয়েছে এবং এতে ৭৬ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েন শুধু মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য প্রয়োজন হয় না।

 

 

 
বিশেষ করে যখন মোতায়েনের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরি। মাদুরোর বক্তব্য তাই যুক্তিসংগতই মনে হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এটি ভেনেজুয়েলাকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করার মার্কিন কৌশল। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, তেল রপ্তানি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো এরই মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি সামরিক চাপ সৃষ্টি করলে মাদুরো সরকারের ওপর আস্থার সংকট বাড়বে—এটি ওয়াশিংটনের অজানা নয়।
 
 

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতি ক্লাসিক বাস্তববাদী তত্ত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে শক্তিই শেষ কথা। ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউসে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প নিয়ে তিনটি বৈঠক করেছেন বলে রয়টার্স নিউজ এজেন্সি গত শনিবার জানিয়েছে। এর থেকে স্পষ্ট যে শুধু মাদক দমন নয়, বরং সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যই ওয়াশিংটনের মূল এজেন্ডা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য ভেনেজুয়েলা এখন একটি রাজনৈতিক ফাঁদে পরিণত হয়েছে। তিনি জানেন, নিকোলাস মাদুরোকে সরাতে ব্যর্থ হলে সেটি তাঁর জন্য ব্যক্তিগতভাবে লজ্জার কারণ হবে। কিন্তু সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপে মাদুরোকে সরানো হলেও ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা প্রবল। এতে যে রক্তগঙ্গা বইবে, তার দায়ভার অনিবার্যভাবে ট্রাম্পের ওপর বর্তাবে।

 

 

হোয়াইট হাউসের মধ্যে এই গভীর অনাস্থা বিদ্যমান যে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে ফেলে ভেনেজুয়েলায় শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না। এর অর্থ হলো, সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদি ফল হবে বিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা হারানো। যদিও সিনেটে ট্রাম্পের যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তবু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টকেই নিতে হবে। এখন পর্যন্ত তিনি এমন কোনো কৌশল বেছে নিতে পারেননি, যা তাঁকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেবে অর্থাৎ মাদুরোকে অপসারণ এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। সামরিক শক্তি প্রয়োগের চরম ঝুঁকি নিয়েও যদি কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ না হয়, তবে সেটি হবে এক চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা।

 

 

এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর আঞ্চলিক প্রভাব। ২০০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্যাকইয়ার্ড’ হিসেবে পরিচিত লাতিন আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ক্ষমতার খেলার বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিউবার হাভানায় ২০১৪ সালে কমিউনিটি অব লাতিন আমেরিকান অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান স্টেটস (CELAC), ৩৩টি দেশের আঞ্চলিক জোট এই অঞ্চলকে ‘শান্তি অঞ্চল’ হিসেবে মনোনীত করে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তির মূলকথা ছিল, কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ বা হুমকি দেওয়া যাবে না। মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই ব্যাপক মোতায়েন সুস্পষ্টভাবে সেই চুক্তির লঙ্ঘন।

 

 

 কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রড্রিগেজ পাররিলা এটিকে ‘উসকানিমূলক কাজ, যা আমাদের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণে হুমকি’ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রাজিলীয় নেতা লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং কলম্বিয়ার নেতা গুস্তাভো পেত্রোর মতো প্রভাবশালী আঞ্চলিক নেতারাও যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিকীকরণ নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁরা মনে করেন, এই সামরিক কার্যকলাপ কেবল উত্তেজনা বাড়াবে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বৃদ্ধি করবে।

 

 

এই সংকটে বহিরাগত শক্তিগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চীনা পণ্ডিতরা রাশিয়ার ভেনেজুয়েলা কৌশলকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে’ হাইব্রিড পাওয়ার প্রোজেকশন বা সংকর শক্তি প্রদর্শনের একটি মডেল হিসেবে দেখছেন। এর অর্থ হলো সামরিক হুমকির পাশাপাশি অর্থনৈতিক, তথ্যগত এবং রাজনৈতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কাজে লাগানো। ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন চাপ সৃষ্টি হওয়ায় চীন ও রাশিয়া এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে। মস্কো ও বেইজিং কারাকাসকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে ওয়াশিংটনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

 

 

এই সংকট শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীনা গবেষকরা প্রকাশ্যে বলেছেন, রাশিয়া যেভাবে সিরিয়া ও ভেনেজুয়েলায় সীমিত কিন্তু কার্যকর হাইব্রিড শক্তি-প্রক্ষেপণ করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক অঞ্চলে বড় শক্তির প্রতিরোধ কৌশলের মডেল হয়ে উঠছে। অর্থাৎ ভেনেজুয়েলা সংকট একটি পরোক্ষ মহাশক্তির প্রতিযোগিতার পরীক্ষাগার। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ যতই একতরফা মনে হোক, এর প্রতিক্রিয়া আসতে পারে বহুমাত্রিক পথে কূটনীতি, অর্থনীতি, তথ্যযুদ্ধ এবং সামরিক সহযোগিতা—সবকিছুই এখানে ভূমিকা রাখবে।

 

 

যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সংকট কেবল দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ নয়, এটি লাতিন আমেরিকার স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার এক কঠিন পরীক্ষা। একটি বিমানবাহী রণতরি এবং এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে ওয়াশিংটন হয়তো ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইছে, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা পুরো অঞ্চলের আঞ্চলিক শান্তিচুক্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত সামরিক সমাধানের পথ পরিহার করে কূটনীতি ও বহুপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের দিকে মনোনিবেশ করা।

 

 

 সামরিক আগ্রাসন হয়তো মাদুরোকে সরাতে পারে, কিন্তু এর পরিণতিতে সৃষ্ট রক্তপাত, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর হবে। বিশ্বের এই অংশটিকে সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি ও সহযোগিতার অঞ্চলে পরিণত করার দায়িত্ব শুধু কারাকাস বা ওয়াশিংটনের নয়, বরং সমগ্র আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। সংঘাত এড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে বিশ্বনেতৃত্বের এখনই হস্তক্ষেপ করা জরুরি।

 

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়