যুদ্ধবাজিতে নয়া বিশ্বায়ন
মোস্তফা কামাল [প্রকাশ : প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল ২০২৬]

ইসলামাবাদে ওয়াশিংটন-তেহরানের বহুল প্রত্যাশিত শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে মানে, সব শেষ নয়। ট্রাম্প-পুতিন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, রাশিয়া, চীন বা ইসরায়েল কেউ দমার নয়। কর্মব্যস্ত সবাই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে, এমনটি এখনো ভাবছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটু দম নিলেও, ধমকা-ধমকি ঠিকই চালাচ্ছেন। চীনকে করছেন একটু বেশি মাত্রায়। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন, মাথা ঢোকাচ্ছেন নতুন করে মধ্যস্ততার আশায়। এসবের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক প্রভাব বলয়ের নাটবল্টুতে নতুনত্ব। কারও আরও প্রভাব কায়েম, কারও টিকে থাকা, কারও অন্যকে ব্যস্ত করে নিজের সেইফ জোন নিশ্চিত করা।
যুদ্ধ বা সংঘাত জিইয়ে রেখে বর্তমান-ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার কূটনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের মজ্জাগত। ট্রাম্পের মধ্যে মাত্রাগতভাবে তা বেশি। সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ট্রাম্পের আশপাশের লোকজন তত লাভবান হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে শেয়ারবাজারে লেনদেন, রাজনৈতিক বাজি বা অস্ত্র ব্যবসা সবই চলছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা বাজেট ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাবের দিকে নজর বিশ্বের। এটি আসলে সেই সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য এক ধরনের ‘প্রলোভন’, যাদের সমর্থন তার দরকার। বিদেশি যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম করা সহজ না হলেও, ট্রাম্প বরাবরই ব্যতিক্রম। এশিয়ান দেশগুলোর কড়া পর্যবেক্ষণ সেদিকে। এ দেশগুলোর বেশিরভাগ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চীনকে বেছে নিয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউট প্রকাশিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যম চায়না ডেইলিতে গত শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি পরিচালিত এ জরিপে অংশ নেওয়া ৫২ শতাংশ মানুষ চীনকে বেছে নিয়েছে, বাকি ৪৮ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রকে। জরিপ আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এ বছর ফলাফলে বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। গত বছরও যুক্তরাষ্ট্র এ জরিপে এগিয়ে ছিল। জরিপে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, তিমুর-লিশত, থাইল্যান্ড ও ব্রুনেইসহ বেশ কয়েকটি দেশে চীনের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতি সংস্থার (আসিয়ান) দেশগুলোর প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি চীন।
এসব দেশের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে, জরিপে অংশগ্রহণকারী ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ বর্তমান ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের জন্য ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অবনতি হওয়ার আশঙ্কাও করেছেন অনেকে। জরিপে আরও দেখা যায়, আগামী তিন বছরে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির আশা করছেন ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির সম্ভাবনা দেখছেন মাত্র ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। জরিপে প্রকাশিত অঙ্ক বা সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, চীনের প্রতি এ অঞ্চলের ভর-ভরসা বেড়েছে তা সহজেই বোধগম্য।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দেশের কাছে বিষয়টি আরও বেশি উপলব্ধির বিষয়। এর মধ্যেই চীনকে ধমকানো, চোখ রাঙানোর মাজেজা সেখানে। ইরান যুদ্ধে কার কী চাওয়া সেটাও বোঝেন। এর ফলোআপে ইরানের সঙ্গে চুক্তি হওয়া এখনো সম্ভব বলে মনে করেন ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইসলামাবাদ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া ভ্যান্স আলোচনা শেষে এই বিশ্বাস নিয়ে ফিরেছেন। একইভাবে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হওয়া অসম্ভব নয় বলে মনে করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তাও আবার জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে। পুতিনের সঙ্গে আলাপকালে পেজেশকিয়ানের এ আশাবাদের খবর বড় করে জানিয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনা শেষ হওয়ার পর পুতিন ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে এ ফোনালাপ হয়। এর আগে রয়া নিউজের এক প্রতিবেদনে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট। তিনি এ বিষয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে অবহিত করেছেন। একই সময়ে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর বিবৃতি। এতে জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তবে বেসামরিক চলাচলের সুযোগ থাকলেও, সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান।
আইআরজিসি সমান্তরালে এ কথাও জানিয়েছে, ‘যেকোনো অজুহাত বা কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালির দিকে এগিয়ে আসা সামরিক জাহাজকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নির্ণায়ক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি সরবরাহ রুটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং বিদেশি আধিপত্য ঠেকাতেই তেহরানের এ হুঁশিয়ারি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালিতে যে মাইন পেতেছে, তা ধ্বংস করা শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির। ইরানের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হতে পারে, এমন আশঙ্কায় সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াইনেট জানায়, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইতিমধ্যে যুদ্ধ প্রস্তুতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
সেনাবাহিনীর সব ইউনিটকে উচ্চ সতর্কবার্তা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গোটা বিষয়টাই যে আসলে তেলের যুদ্ধ, তা শুরু থেকে স্পষ্ট। তেল কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্য একটা অর্থনীতি। ইতিহাসের প্রয়োজনে উল্লেখ করতেই হয়, প্রথম বড় ধরনের তেলের খনি ১৯০৮ সালে পারস্যে (বর্তমান ইরান) আবিষ্কৃত হয়। এরপর ১৯৩৮ সালে সৌদি আরবে বাণিজ্যিকভাবে প্রথম তেল পাওয়া যায়, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতি সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এ অঞ্চলে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের সঙ্গে সঙ্গে (১৯৪৬ সালে) ইউরোপকে নিজ নিজ বলয়ে নিতে গিয়ে পুঁজিবাদের নেতা যুক্তরাষ্ট্র এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয় এবং এ পরিস্থিতির মধ্যে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা ঘোষণার পরদিনই মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে ইসরায়েল জয়ী হয় এবং বিভাজন পরিকল্পনায় ইহুদিদের জন্য নির্ধারিত এলাকার চেয়েও বেশি ভূমি দখল করে নেয়। বিগত স্নায়ুযুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য ছিল অন্যতম প্রধান অস্থিরতার ক্ষেত্র। এ অঞ্চলটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। বিপুল তেলসম্পদ, ইউরোপ-এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে এ এলাকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিজম মতবাদ ঠেকাতে ইসলামি চেতনা কাজে লাগাতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোকে কাছে টেনে নেয়। তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখা, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকানো এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে মোড়লগিরি করার জন্য স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি স্থায়ী কৌশলগত ঘাঁটি স্থাপনের লক্ষ্যে পশ্চিমা শক্তিগুলো (বিশেষ করে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র) মধ্যপ্রাচ্যে একটি মিত্ররাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে বেছে নেয় এবং এর সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করতে থাকে। ২০১৭ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, আবারও বিশ্বরাজনীতিকে এক অনিশ্চিত ও উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ইসরায়েল কর্র্তৃক গাজা ধ্বংস এবং যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করায় আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়ে। ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের এক নম্বর শক্তিতে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ায় ইরান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইরানে শাসকগোষ্ঠী বদল করে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি সরকার বসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকার বসাতে গেলে, শুরু হয় সংঘাত। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করে সুবিধা করতে না পারায়, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভূমিকা রাখে। আবার যুক্তরাষ্ট্র সুবিধা না করতে পেরে, ইরানকে সমঝোতায় আসতে বলে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে দেওয়া হুমকি ‘সমঝোতা না হলে পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’ এমন কথা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক চাপ নয়; এটি একধরনের স্নায়ুবিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ । বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো সীমাবদ্ধ থাকে না।
তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে বিশ্বব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। প্রথম স্নায়ুযুদ্ধের অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, ততই তা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তোলে। আজকের বাস্তবতায় সেই ঝুঁকি আরও গভীর। তা আন্তর্জাতিক-ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দিতে বসেছে। পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় পাকিস্তান আবারও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে যেখানে তার প্রতিটি পদক্ষেপ শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। এখন পর্যন্ত নমুনা সে রকমই। মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, গতকাল থেকে তারা ইরানি বন্দরগুলো অবরোধ করা শুরু করবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে ইরানের ‘ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতার’ জবাবে তিনি এই নির্দেশ দিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখতে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন