যুদ্ধ অর্থনীতি ও খাদ্য রাজনীতি
মোস্তফা কামাল [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ৩১ মার্চ ২০২৬]

একতরফা, একচেটিয়া যুদ্ধ দেখতে দেখতে বহুদিন পর এবার বিশ্বে মিলল, সেয়ানে সেয়ানে যুদ্ধের দেখা। বিশ্বের নাম্বার ওয়ান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র আর দুর্ধর্ষ ইসরায়েলের ঘাম ছুটিয়ে ফেলার চেষ্টায় তেহরান। ইরানের ওপর হামলার পাল্টা জবাবে ইসরায়েলের অ্যালুমিনিয়াম, রাসায়নিক প্লান্ট ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি দুবাই, বাহরাইনের অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল প্ল্যান্ট যেগুলোর মালিকানা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, সেগুলোও ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায়, মার্কিনিদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাল্টা হামলার আয়োজন। ইসরায়েলের লোকজনের জিল্লতি জীবন শুরু হয়েছে। বিদেশের কোনো হোটেল-মোটেলে ইসরায়েলের পাসপোর্ট দেখলেই, রিজেক্ট করা হচ্ছে।
এটি কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ডের পর এবার মালয়েশিয়ায়ও। ইসরায়েলের ভেতরও প্রচন্ড অসন্তোষ ও জনবিস্ফোরণ পরিস্থিতি। দেশটির ভেতরকার সামরিক সূত্র থেকে ফাঁস হওয়া তথ্যে জানা যাচ্ছে, লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ যুদ্ধ ও ইরানের মিসাইলে এখন পর্যন্ত ৬০০০ ইসরায়েলের সেনা মারা গেছে। তারা আর মরতে চায় না। তাই আইডিএফসহ ইসরায়েলের নানা ফোর্সে জনবল কমতে শুরু করেছে। পালিয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ। বাঙ্কারে থাকতে থাকতে দেশটির লোকজন পাগলপ্রায়। তাদের ডাক্তার আর নার্সরা আর বীভৎস সার্জারি করতে অপারগ। জ্বালানি সংকট, খাদ্য সংকট চরমে পৌঁছে গেছে ইসরায়েলে। মার্কিনিদেরও সেনাদের লাশ দেখতে আর ভালো লাগছে না। কিন্তু তাদের টোমাহক ক্রুজের আঘাতে ইরানের বাচ্চা শিশু মারা গেলে খুশি লাগে। তাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও খেমটি ছাড়ছেন না। যুদ্ধে জেতেন আর হারেন, তিনি ইরানের জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। সেই সঙ্গে ইরানের খারগ দ্বীপের রপ্তানি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণও চান।
বিষয়টি লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে তুলনা করেছেন ট্রাম্প। দেশটির রাজধানী কারাকাসে গত জানুয়ারিতে সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। ওই সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে স্ত্রীসহ তুলে এনে নিউ ইয়র্কে আটক রাখা হয়েছে। এরপর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে থাকা ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ইচ্ছার কথা জানিয়ে আসছে ওয়াশিংটন। দেশটির বিভিন্ন স্তরের লোকজনও বিষিয়ে পড়েছেন ট্রাম্পের ওপর। ইরানে পেন্টাগনের আরও কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থল অভিযানের পরিকল্পনার খবরে প্রকাশ্যে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড এনবিসি চ্যানেলের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিষয়ে বলেন, ‘আমরা কেন সেনা পাঠাচ্ছি, সেটা জানা জরুরি।’
ইরানে সেনা পাঠাতে ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হবে কি না এ প্রশ্নের জবাবে জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড বলেন, এটা নির্ভর করছে মার্কিন সেনাদের কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার ওপর। ইরানে চলমান সংঘাত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে নিউ জার্সির ডেমোক্রেটিক সিনেটর কোরি বুকার বলেন, ‘কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়ে ট্রাম্প আমাদের এমন এক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো দৃশ্যমান পথ নেই।’ মেরিল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এবিসি নিউজের ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এ যুদ্ধ আমাদের আরও নিরাপদ করার পরিবর্তে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। প্রতিদিন শত শত কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামও বাড়ছে।’
অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ অনেক দূর গড়িয়েছে। চলমান যুদ্ধের কারণে তারা পেট্রোল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির উদ্বেগের মধ্যে আছেন। মার্কিনিরা তাদের এই মতামত দিয়েছেন একটি জরিপের মাধ্যমে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। পদত্যাগের দাবি এমন সময়ে উঠল, যখন ইরানে স্থল অভিযান অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে আছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে মার্কিন সেনারা ইরানের ভূখণ্ডে যাবেন আর অক্ষত অবস্থায় লক্ষ্য অর্জন করে চলে আসবেন বিষয়টা আর সরল পর্যায়ে নেই। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযানের কথা বিবেচনা করছে ইরানের খারগ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ ঘিরে। অনেক মার্কিন সেনা সদস্যের পক্ষ থেকে যুদ্ধে যেতে না চাওয়ার খবরও এরই মধ্যে সামনে এসেছে। তাদের কাছে তথ্য আছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ইরানি দ্বীপটিতে মরণফাঁদে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেনারা। স্থল অভিযানের ক্ষেত্রে মার্কিন সৈন্যরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। যে কোনো সফল হামলার পর ইরানি প্রশাসন সেই আক্রমণের ভিডিও অনলাইনে প্রকাশ করবে বলেও গুঞ্জন আছে। কারণ, মার্কিন সেনাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর দৃশ্যগুলো প্রচার হলে, তা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ট্রাম্পবিরোধী ক্ষোভ আরও তীব্র করবে। যুদ্ধ পরিস্থিতি যে পর্যায়েই হোক, তা গোটা বিশ্বকে যে ঝাঁকুনি দিয়েছে, এর শিকার কম-বেশি সবাই।
দেশে দেশে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। জ্বালানি তেল এমনই এক উপকরণ, যা বেশির ভাগ উৎপাদন কার্যক্রমের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে প্রয়োজন হয়। জ্বালানি তেলের কার্যকর বিকল্প এখনো উদ্ভাবিত হয়নি। জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বিপদে পড়েছে। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংযমী হতে সবাইকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, কিন্তু তাতে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। তখন বিমানের জন্য ব্যবহার্য জ্বালানির দাম বাড়ানো হলেও সাধারণভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সরকার জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
কিন্তু, ধরিবাজ শ্রেণির কাছে মানুষকে আতঙ্কে রাখাও একটা ব্যবসা। পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনের সামনে ভিড় গণ্ডগোল এরই জের। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের সংকট ভয়াবহ রূপ নেবে। এটি বলার জন্য বলা কথা নয়। তেল ভোজ্য হোক আর জ্বালানি হোক, এর কেরামতি মারাত্মক। ১৯৭৩ সালে ইসরায়েল-আরব যুদ্ধের সময় যুদ্ধ শুরুর পর আরব দেশগুলো জ্বালানি তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি তিন মার্কিন ডলার। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তা ১২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। নিকট অতীতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অস্বাভাবিক আচরণ প্রত্যক্ষ করা গেছে ২০০৮ সালে। সেই সময় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে এক সময় ব্যারেলপ্রতি ১৪৮ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো রাশিয়ান জ্বালানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে ওপেকভুক্ত দেশগুলো জ্বালানি তেলের উত্তোলন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কমিয়ে দেয়। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। উল্লেখ্য, রাশিয়া বিশ্ব জ্বালানি তেলের এক-দশমাংশ জোগান দেয়। রাশিয়া সেই সময় ভিন্ন পথে জ্বালানি তেল রপ্তানি শুরু করে। ২০২২ সালে যে জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তার মূলে ছিল প্রধানত পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতা। কিন্তু ২০২৬ সালে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে জ্বালানি তেলের সংকট শুরু হয়েছে, তার পেছনে পরিবহন সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার বিষয়টিও সমভাবে দায়ী। আর কূটনীতির বিষয়-আশয় তো রয়েছেই। এছাড়া যুদ্ধও যুক্তরাষ্ট্রসহ কারও কারও কাছে একটা অর্থনীতি। ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বিশ্ব জুড়ে ডলার সংকটকে উসকে দিয়েছে। অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস ও মূল্যস্ফীতির তীব্র শঙ্কাও দেশে দেশে। বাংলাদেশেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি গত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বোরো মৌসুমে সেচ সংকট ও আমদানিকৃত পণ্যের বাড়তি দামের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ার শঙ্কা ঘুরছে।
নতুন বছরের জানুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পুষ্টিকর খাদ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ডলার ঘাটতির কারণে টাকার অবমূল্যায়ন এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হচ্ছে, যা আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। এছাড়া সার উৎপাদনে ঘাটতি আসন্ন ফসলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা মৌসুমের শুরুতে সারের চাহিদা তুঙ্গে থাকে, কিন্তু জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সাধারণের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ক্রয়ে চলে যাওয়ায় জীবনযাত্রার মান কমছে। সামনে জুনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বর্ষা মৌসুমের চাষাবাদ শুরু হবে। বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোয় এ সময় সারের চাহিদা তুঙ্গে থাকে। কৃষকরা তখন প্রয়োজনীয় সার না পেলে কৃষি উৎপাদনের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। এরইমধ্যে জাতিসংঘের সতর্কবার্তায় সেই ইঙ্গিত মিলেছে। সেখানে সরাসরি বলা হয়েছে খাদ্য অনিশ্চয়তায় পড়ার শঙ্কার কথা। যুদ্ধের কারণে সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত সব দেশের কৃষকদের জীবনযাত্রা ও উৎপাদন এরইমধ্যে হুমকির মুখে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে জানিয়েছে, চলমান সংকটের কারণে আগামী জুনের মধ্যে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এর আগে থেকেই বিশ্বে খাদ্য সংকটে ছিল প্রায় ৩১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। দেশের স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরাই গত ক’দিন ধরে সতর্ক করে বলে আসছেন, চলমান সংঘাতের প্রভাব ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট খাদ্য সংকটের চেয়েও মারাত্মক হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন