কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

যেভাবে আবার বাগরামের দখল নিতে পারেন ট্রাম্প

জাভিদ আহমাদ [প্রকাশ : আমার দেশ,০৩ অক্টোবর ২০২৫]

যেভাবে আবার বাগরামের দখল নিতে পারেন ট্রাম্প

যেভাবে আবার বাগরামের দখল নিতে পারেন ট্রাম্প

জাভিদ আহমাদ
 
[প্রকাশ : আমার দেশ, ০৩ অক্টোবর ২০২৫]

শত্রুর কাছে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামরিক ঘাঁটি দাবি করাটা একটি বিরল ঘটনা। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক সেটাই করেছেন। তিনি বলেছেন, তালেবানদের কাছ থেকে বাগরাম এয়ারফিল্ড আবার নেওয়ার জন্য কাজ করছে তার টিম। তার এই বিবৃতি একই সঙ্গে বিস্ময় আর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক তৎপরতা ছিল, তার কেন্দ্রে ছিল বাগরাম। ২০২১ সালে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যখন সেনা সরিয়ে আনে, তখনই এই এয়ারফিল্ড ছেড়ে আসতে হয়েছে। এর পরপরই সেটার নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। এখন ট্রাম্প আবার সেটা ফেরত চাচ্ছেন। তালেবান-শাসিত আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের এখন কী এমন লক্ষ্য থাকতে পারেÑসেটি নিয়ে এখন নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

 
 

আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর থেকেই বিভিন্ন সময় বাগরামের কথা উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। ২০ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছেন, ‘আমরা শিগগির এটা ফেরত চাই। এখনই চাই।’ কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘাঁটি ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করে দেখছে হোয়াইট হাউস। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং চীনের নিকটস্থ পারমাণবিক স্থাপনার ওপর নজরদারির জন্য এটাকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের ৪০ মাইল উত্তরে অবস্থিত বাগরাম ঘাঁটি থেকে বড় বিমান, ড্রোন, বিশেষ বাহিনী এবং ঝটিকা মিশন পরিচালনা করা যায়। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর থেকে এটি এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের সাক্ষী হয়ে আছে। এটি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সমস্যাকবলিত এই অঞ্চলে আবার নিজের শক্তি দেখাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

 

 

তালেবানরা তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু ইস্যুটা পুরোপুরি চলে যায়নি। তালেবানদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা রয়েছে। তালেবানপ্রধান যেভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছেন, সেটি কিছু তালেবান সদস্য পছন্দ করেন না। তিনি ধর্মের সঙ্গে সরকারের নিয়ন্ত্রণ মিলিয়ে দিয়েছেন, যেটি উত্তেজনা তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক সংগ্রাম আর ইসলামিক স্টেট-খোরাসানের (আইএস-কে) হামলার কারণে চাপ আরো বেড়েছে। এসব সমস্যার কারণে তালেবানরা চুক্তিতে রাজি হতেও পারে। চুক্তি করার জন্য ট্রাম্পের টিম তাদের সহায়তা দিতে পারে, গোপন আলোচনা করতে পারে, আবার আশপাশে দেশগুলোর মাধ্যমে চাপও দিতে পারে। বাগরামের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আবার তাদের হারানো প্রভাব ফিরিয়ে আনতে পারবে।

 

 

২০ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘আফগানিস্তান যদি বাগরাম ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে না দেয়, তাহলে খারাপ অনেক কিছু ঘটবে!’ এই কড়া হুমকি থেকে বোঝা যায় মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আসছে। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর থেকে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেছে। আইএস-কে আরো শক্তিশালী হয়েছে। সন্ত্রাসীদের আস্তানাগুলো আবার ফিরে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দা তৎপরতা দুর্বল হয়ে গেছে। এদিকে, চীন, রাশিয়া এবং ইরান আফগানিস্তানে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করে তুলছে।

 

 

নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাগরামে ফিরে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, আইএস-কেকে থামানো না হলে তারা শিগগির দেশের বাইরে হামলা চালাতে পারে। আফগানিস্তানে কোনো ঘাঁটি না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রকে এখন বহু দূরে উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘাঁটিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সন্ত্রাস মোকাবিলার জন্য এই কৌশলের কার্যকারিতা কম। আরো উন্নত গোয়েন্দা তথ্য ও অভিযান পরিচালনার জন্য বাগরামের মতো কাছাকাছি অবস্থানে ঘাঁটি দরকার যুক্তরাষ্ট্রের।

 

 

ট্রাম্পের টিমকে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপেরই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি আছে। তাদের লক্ষ্য হলো নিজের অবস্থান সংহত করা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কোনো মিশনে তারা জড়িয়ে পড়তে চায় না। ট্রাম্প যে স্টাইলে চুক্তি করে থাকে, সেটি এ ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। একটা উপায় হলো, তালেবানদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করা। মার্কিন-তালেবান দোহা চুক্তির ভিত্তিতে এটি করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা, সন্ত্রাস দমনে সহায়তা বা তালেবানদের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে। বিনিময়ে তালেবানরা জাতিসংঘে সদস্যপদ বা নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে আনার দাবি করতে পারে। চুক্তির পরিসর বড় হলে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের লিথিয়ামখনিতে বিনিয়োগ করতে পারে। এতে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে এবং আফগানিস্তান এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হবে।

 

 

কান্দাহারে তালেবান আমিরের নেতৃত্বে তাদের যে রক্ষণশীল অংশ রয়েছে, তারা এর বিরোধিতা করতে পারে। তবে তালেবানদের অন্য গ্রুপগুলো এ ধরনের চুক্তিকে সুবিধাজনক মনে করতে পারে। তালেবান আমিরের শক্তি চূড়ান্ত নয়। তার বিরুদ্ধে যদি বিদ্রোহ হয়, তাহলে তিনি ছাড় দিতেও পারেন। আফগানিস্তানের দুর্বল অর্থনীতি এবং আইএস-কের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। সে ক্ষেত্রে চুক্তি সম্ভব হতেও পারে।

 

 

 

আরেকটি বিকল্প হলো, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে চুক্তি করা। সে ক্ষেত্রে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক অথবা উজবেকিস্তানের মতো কোনো দেশ বাগরাম নিয়ন্ত্রণ করবে। এই দেশগুলোর সঙ্গে তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই সম্পর্ক রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাগরাম সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে অভিন্ন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। যুক্তরাষ্ট্র সেটাকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও অভিযানের জন্য ব্যবহার করবে। কাতারে এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান আলোচনা হয়েছে। তালেবানরা যেসব মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম দরকার, প্রতিবেশী উজবেকিস্তানের কাছে সেসব আছে। আরব আমিরাত আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর পরিচালনা করছে। এর মধ্যে কাবুল বিমানবন্দরও রয়েছে। তালেবানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক গভীর এবং চুক্তির ক্ষেত্রে তারা সাহায্য করতে পারে।

 

 

 

তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তালেবানদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে হবে না। তালেবানরা দাবি করতে পারবে, তারা একটি মুসলিম দেশের সঙ্গে কাজ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়। বাগরামে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের ওপর তারা কিছু নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারে। একটা বোঝাপড়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা সেখানে পূরণ হতে পারে।

 

 

 

তৃতীয় একটি উপায় হলো, নাইন-ইলেভেনের পর পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের যে ধরনের অবস্থান ছিল, সে ধরনের একটা অবস্থান আফগানিস্তানে তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা নীরবে পাকিস্তানের বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করেছিল। বাগরামের ব্যাপারেও একই ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হলে তালেবানদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী সেখানে চুপচাপ কাজ করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে ত্রাণ এবং সন্ত্রাস দমন নিয়ে যে আলোচনা আগে থেকেই চলে আসছে, সেই আলোচনা ধরেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। তালেবানরা যদি রাজি না হয়, তাহলে পাকিস্তান তাদের নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারের প্রস্তাব দিতে পারে।

 

 

 

আরেকটি উপায় হলো, বাগরামে বেসামরিক-সামরিক হাব গড়ে তোলা। উপসাগরীয় দেশগুলো, তালেবান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গ্রুপ একসঙ্গে এটা পরিচালনা করতে পারে। এটা একটা লজিস্টিকস ও বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা টিম সেখানে কাজ করবে। সোমালিয়া, ইরাকসহ আরো কিছু জায়গায় এ ধরনের কৌশলে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

 

 

আলোচনায় কাজ না হলে যুক্তরাষ্ট্র গোপন কৌশল ব্যবহার করতে পারে। গোয়েন্দা টিম, আধাসামরিক ইউনিট এবং বেসরকারি ঠিকাদাররা বাগরামে কাজ করতে পারে। তারা সাবেক আফগান মিত্র এবং তালেবান গ্রুপ ত্যাগ করে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে পারে। আফগান যুদ্ধের শুরুর দিকে সিআইএর টিমগুলো এভাবেই কাজ করেছিল। কিন্তু এই কৌশলে তালেবানদের প্রতিশোধের ঝুঁকি থাকবে। যেমন : তারা মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি হিসেবে বন্দি করতে পারে।

 

 

সন্ত্রাসবাদ ছাড়াও বাগরামের আরো বৃহত্তর গুরুত্ব রয়েছে। চীন আফগানিস্তানে তাদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। তারা খনিজ ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছে। রাশিয়া তালেবানদের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করেছে। ইরান অস্ত্র ও জঙ্গি বিমান স্বাধীনভাবে স্থানান্তরিত করতে পারছে। পাকিস্তানকে নিজস্ব অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ভারতের উদ্বেগ থাকলেও তারা চুপ করে আছে। তালেবানরা জানে বিনিয়োগের জায়গায় কোনো দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারবে না।

 

 

 

চীন আর রাশিয়া বাগরামে যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসাকে হুমকি হিসেবে দেখবে। তারা তালেবানদের চাপ দেবে, যাতে তারা এটার অনুমতি না দেয়। ইরানও সরাসরি এর বিরোধিতা করবে। পাকিস্তান তালেবান আর চীনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া সুযোগ-সুবিধা হিসাবনিকাশ করে দেখবে। ভারত নীরবে এটাকে সমর্থন দেবে। বাগরামকে ফিরে পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না। তবে স্মার্ট চুক্তি এবং সৃজনশীল পরিকল্পনার মাধ্যমে বড় সংঘাতে না জড়িয়েও ট্রাম্প হয়তো এই নিয়ন্ত্রণ পেতে পারেন। যে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রভাব খুইয়েছে, সেখানে বাগরামের মতো ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ বড় জয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এই সুযোগটা নেওয়া যেতেই পারে।

 

 

ফরেন পলিসি থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর : জুলফিকার হায়দার