ভূরাজনীতি : ভারতের গণতন্ত্র কোন পথে?
সানজিদা বারী [সূত্র : বণিক বার্তা, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র নানা দিক থেকে সংকটের মুখে পড়ছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া, বিচার ব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যম যে প্রতিষ্ঠানগুলো গণতন্ত্রের ভিত্তি রচনা করে সবখানেই দেখা দিচ্ছে ভাঙন ও দুর্বলতা। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্র ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। একসময় ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র’ হিসেবে গর্বিত পরিচয় দেয়া দেশটি আজ বিভিন্ন সূচকে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে; বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষা, নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদিহির ক্ষেত্রে।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, বিরোধীদের গ্রেফতার-হয়রানি, মিডিয়ার ওপর চাপ এবং ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণের মতো প্রবণতা মিলেই ভারতের গণতন্ত্রকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
এ সংকটের প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে চলতি বছরের ১১ আগস্ট। সেদিন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও ইন্ডিয়া জোটের আরো কয়েকজন নেতাকে দিল্লি পুলিশ আটকে দেয়, যখন তারা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের দিকে পদযাত্রা করছিলেন। লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন। বিরোধীদের দাবি—তালিকা সচেতনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ক্ষমতাসীনদের সুবিধা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে যেভাবে পথরোধ করা হলো তা বৃহত্তর এক প্রবণতার অংশ, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণকে সংকুচিত করা হচ্ছে।
ভারত স্বাধীনতার পর যে দুই স্তম্ভে গণতন্ত্রকে মজবুত করতে চেয়েছিল—(ক) বহুদলীয় প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি ও (খ) স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা-গণমাধ্যমের মাধ্যমে নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা—তার উভয়টিই আজ চাপের মুখে।
আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটি সেনাবাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষা করার নিয়মনীতি গড়ে তুলেছে এবং নারীদেরসহ বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থাৎ রাজনৈতিক আচরণবিধি, পারস্পরিক সংযম, ‘খেলার ন্যূনতম নিয়ম’ মেনে চলা—এসব জায়গায় ক্ষয় গভীরতর। ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার মতো সুস্পষ্ট ভাঙন আজ নেই; কিন্তু নীরবে, ক্রমান্বয়ে, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হচ্ছে—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক সূচকগুলোর রায়ও একই সুর তোলে। কারো ভাষ্য ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’, কারো ভাষ্য ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’ বা ‘হাইব্রিড রেজিম’ শব্দের ভিন্নতা থাকলেও সারকথা এক: ভারত সম্পূর্ণ গণতন্ত্র নয়, আবার নগ্ন স্বৈরশাসনও নয়; মাঝামাঝি ধূসর অঞ্চলে অবস্থান করছে। এ শ্রেণীবিন্যাসে যেটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে তা হলো নাগরিক স্বাধীনতার ধারাবাহিক অবনতি। নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতদৃষ্টিতে টিকে আছে, কিন্তু কথা বলার, সংগঠিত হওয়ার, সমালোচনা করার, গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত রাখার যেসব অধিকার, সেগুলোর বাস্তব চর্চা ক্রমে সংকোচিত হচ্ছে।
গণতন্ত্র কাকে বলে—এ প্রশ্নে স্পষ্টতা জরুরি। গবেষণা-সাহিত্যে বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে, একটি দেশকে গণতান্ত্রিক বলার জন্য পাঁচটি স্তম্ভ প্রয়োজন: এক. নিয়মিত, প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন; দুই. প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিরোধীদের সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা; তিন. সরকারের নীতিনির্ধারণে বহিরাগত শক্তির অযাচিত প্রভাব না থাকা; চার. বিস্তৃত নাগরিক স্বাধীনতা এবং পাঁচ. নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি।
গত কয়েক দশকে স্বৈরাচারী সরকারগুলো নির্বাচনকে ‘রঙচঙে মুখোশ’ হিসেবে রেখে বাকি স্তম্ভগুলোকে খর্ব করতে শিখেছে। ফলে পর্যবেক্ষকরাও মানদণ্ড বদলেছেন: শুধু ব্যালট বাক্সে ভোট পড়লেই হলো না; আইন-কানুন ও প্রতিষ্ঠানগুলো আসলেই কাজ করছে কিনা, অধিকারগুলো কাগজের বাইরে বাস্তবে আছে কিনা—এগুলোই আজ গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রেক্ষাপটে ন্যান্সি বারমেওর ‘ডেমোক্রেটিক ব্যাকসলাইডিং’ ধারণা বিশেষ প্রাসঙ্গিক। তার মতে, আজ গণতন্ত্র ভাঙে কম; ক্ষয়ে যায় বেশি। সোজাসুজি ট্যাংকে চেপে ক্ষমতা নেয়ার বদলে, ‘আইনের ভিতর দিয়েই আইন ভাঙা’—এ কৌশল ব্যবহার হয়। নির্বাচনের নিয়ম পাল্টে দেয়া, বিরোধীদের জন্য খেলা কঠিন করে তোলা, প্রশাসনিক যন্ত্রপাতি ‘পার্টিসান’ভাবে কাজে লাগানো, মিডিয়া-সিভিল সোসাইটির শ্বাসরোধ—সবই ঘটে আইনবিধির আড়াল বা আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জটিলতায়। স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র টিকে থাকে ‘লেখাহীন নিয়মে’—পারস্পরিক সহনশীলতা ও ক্ষমতা সংযমে। এ অদেখাই যদি ভেঙে যায়, ব্যালট থাকলেও রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি নিঃশেষিত হয়।
ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকেত আসে নাগরিক স্বাধীনতায়। বক্তব্য, মতপ্রকাশ, সমাবেশ, সংগঠনের অধিকার আইনে এখনো বিদ্যমান; বাস্তবে বারবার খর্ব। ঔপনিবেশিক যুগের দেশদ্রোহ আইন এবং সাম্প্রতিক অবৈধ কার্যকলাপ নিবারণ আইন (ইউএপিএ) মিলিয়ে ভিন্নমত দমনের শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, পোস্টার, স্লোগান কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা—অতি ফাঁপা সংজ্ঞার ভেতর অসংখ্য মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন মামলার জালে। ইউএপিএর সংশোধনে ব্যক্তিকেও ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণার পথ খুলে যায়; জামিন দুষ্প্রাপ্য, বিচার বিলম্বিত। আইনের এ শক্তি-মত্ত প্রয়োগ একাডেমিয়া, সাংবাদিকতা, নাগরিক-অধিকারকর্মী—সবাইকে ভীত করে তুলেছে।
সংখ্যালঘু বিশেষত মুসলমানদের পরিস্থিতি আরো নাজুক। গণপিটুনি, ঘৃণাত্মক প্রচার, ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল’ তকমা—এসবের ঘনঘটা বেড়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ধর্মভিত্তিক নাগরিকতার যুক্তি সামনে এনে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে; জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে একাংশ মানুষের ভোটাধিকার ও আইনি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের পর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ নিষেধাজ্ঞা, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট—সব মিলিয়ে ‘ব্যতিক্রমী আইনশাসন’ যেন স্বাভাবিকে পরিণত হয়েছে। আইন যেটুকু সুরক্ষা দেয় বাস্তবতা তা খণ্ডিত করে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দুর্বল হওয়াও ছবিটিকে আরো গাঢ় করে। লাইসেন্সিং কর্তৃত্ব, কর তল্লাশি, মামলা, মালিকানার ঘনত্ব—সব মিলিয়ে ‘মিডিয়া ক্যাপচার’ ঘটেছে। সমালোচনামূলক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ, বড় বড় কনগ্লোমারেটের হাতে টেলিভিশন-ডিজিটাল প্লাটফর্ম যেখানে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রকাশ্য-গোপনে—এ বাস্তবতায় বৈচিত্র্যময় জনআলোচনা সংকোচিত। ফল: প্রাইম-টাইমে সরকারি নীতির গুণকীর্তনই অধিক; শাসকবিরোধী সমালোচনামূলক বিতর্ক বিরল। প্রধানমন্ত্রী দশকে একটিও উন্মুক্ত সংবাদ সম্মেলন করেননি—এটিও ক্ষমতা-সংলাপের দূরত্বের ইঙ্গিত বহন করে।
এদিকে নির্বাহী শাখার ওপর সংসদীয় নজরদারিও ক্ষয়ে গেছে। বড় বড় নীতি নোটবন্দি, আকস্মিক লকডাউন, কৃষি আইন—পর্যাপ্ত কমিটি-পর্যালোচনা, বিরোধী-আলোচনা ছাড়াই পাস হয়েছে। সংসদের ওপর সরকারের জবাবদিহি কমলে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একসময় ‘বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী’ সুপ্রিম কোর্ট হিসেবে পরিচিত ভারতীয় সর্বোচ্চ আদালত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিতর্কিত রাজনৈতিক মামলায় সরকারের অবস্থানের প্রতি সহনশীলতা দেখিয়েছে, যা ন্যায়বিচারের নিখাদ দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিচারপতিদের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ, মামলা-বণ্টন নিয়ে অভিযোগ—এসব ঘটনাও বিচারিক স্বাধীনতার ঝুঁকিকে সামনে আনে।
তবে এসব সত্ত্বেও ভারতের গণতন্ত্র পুরোপুরি নিভে যায়নি। কারণ নির্বাচন এখনো রয়েছে এবং গোপন ব্যালট যদি তা নিরপেক্ষভাবে হয়—ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার বাস্তব মুহূর্ত। ‘হাইব্রিড’ ব্যবস্থায় শাসকরা নির্বাচনের পথে বৈধতা খোঁজে; তাই জনমত যদি সত্যিই দিক বদলায় তা রাজনৈতিক পরিণাম ডেকে আনতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনগুলো—শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপাল ইঙ্গিত দেয়, জনগণের সংগঠিত চাপ রাষ্ট্রকে পথ বদলাতে বাধ্য করতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো এমন সংগঠনক্ষমতা—বিশেষত বিরোধী রাজনীতির ভিত কতটা মজবুত?
এখানেই ‘প্রকৃত বিরোধী দল’ গড়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। দীর্ঘ সময় কংগ্রেস সেই ভূমিকা পালন করলেও দলীয় ভাঙন, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, সংগঠন শৈথিল্যে তারা পিছিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তৃণমূল স্তরে প্রচারাভিযান, যেমন ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ এবং কয়েকটি রাজ্যে সাফল্য কংগ্রেসকে নতুন প্রাণ দিয়েছে; তবে জাতীয় পর্যায়ে টেকসই সাংগঠনিক পুনর্গঠন ছাড়া তা দীর্ঘমেয়াদি হবে না। আম আদমি পার্টির মতো উদীয়মান বিকল্পও আছে কিন্তু ক্যারিশমার বাইরে স্থায়ী সংগঠন, নীতি-বিশ্বাসের ধারাবাহিকতা, রাজ্যসীমা পেরোনো—এসবই বড় চ্যালেঞ্জ। বিজেপি এক শতাব্দী জোড়া সংগঠনিক নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে; এ প্রাচীর ভাঙতে হলে বিরোধীদের দীর্ঘশ্বাস, সমন্বয় ও স্থানীয়-জাতীয় দুই স্তরেই উপস্থিতি দরকার।
সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের ভূমিকাও এখানে জরুরি। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, ছাত্রসমাজ, নারী নেতৃত্ব, শ্রমজীবী—এদের সক্রিয় উপস্থিতি গণতন্ত্রের ‘অটোকারেক্ট’ আবার সক্রিয় করতে পারে। কিন্তু আইনি–প্রশাসনিক বাধা, বিদেশী অনুদান নিয়ন্ত্রণ, কর-তদন্ত—এসবের ভেতর দিয়ে এক্ষেত্রের কাজ করা কঠিন। তাই কৌশলগত নমনীয়তা—স্থানীয় ইস্যুতে সংগঠন, ডিজিটালনিরাপত্তা, আইনি সহায়তার নেটওয়ার্ক, বিকল্প মিডিয়া—এসব পথেই নাগরিক পরিসর ধরে রাখতে হবে। একইসঙ্গে আদালতকে, অন্তত নিম্ন ও উচ্চ আদালতের স্তরে, মৌলিক অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা ফিরিয়ে আনার চাপ তৈরি করাও নাগরিকদের কাজ।
রাষ্ট্রনীতির ভাষায় ফিরে গেলে, গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের জন্য তিনটি ফ্রন্ট জরুরি। প্রথমত, আইনে সংস্কার—দেশদ্রোহের মতো ঔপনিবেশিক ধারার পরিত্যাগ, ইউএপিএতে কঠোরতা-অপব্যবহার রোধের গ্যারান্টি, জামিন-বিচার প্রক্রিয়ার যুক্তিযুক্ততা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন—নির্বাচন কমিশনের কার্যকর স্বাধীনতা, সংসদীয় কমিটিগুলোর বাধ্যতামূলক রেফারাল, তথ্যের অধিকার আইনকে পুনরুজ্জীবিত করা, সরকারি বিজ্ঞাপন নীতিতে স্বচ্ছতা এনে মিডিয়া ক্যাপচার কমানো। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিবিরোধীর বৈধতা স্বীকার, ‘ভূমিধস জয়ের’ অহংকারের বদলে ক্ষমতা-সংযম, সংবিধানের অলিখিত নিয়মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
এখানে রাজ্য পরিসরে রাজনীতি একটি বড় জানালা। ভারতের ফেডারাল কাঠামো এমন যে, রাজ্যগুলোয় বিকল্প নীতি চর্চা অসম্ভব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, নারী সুরক্ষা, ধর্মীয় সম্প্রীতি—এসব ক্ষেত্রে সফল রাজ্যনীতিই পরে জাতীয় আলাপে জায়গা করে নেয়। বিরোধী রাজ্য সরকারগুলো যদি স্বচ্ছতা-সাম্য-সেবার আদর্শে পারফর্ম করে, তা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে এবং ভোটারদের দেখাবে, ‘ভিন্ন পথও’ সম্ভব। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হতে পারে এ উদাহরণগুলো।
সবশেষে, গণতন্ত্র কেবল প্রতিষ্ঠান বা আইন নয়; এটি একটি নৈতিক কল্পনাও—নিজের বিপরীতের কথা চিন্তা করার সক্ষমতা। ‘আমি ভুল হতে পারি, তাই তোমার কথা বলার অধিকার আছে’—এ বোধ না থাকলে শক্তিশালী আদালত-মিডিয়া-সংসদও রাবারের ছাঁচে ফেলে দেয়া যায়। ভারতের বর্তমান সংকট তাই শুধু রাজনীতির নয়; সামাজিক-সাংস্কৃতিকও। ঘৃণাত্মক ভাষা, বিভাজনের রাজনীতি, ইতিহাসের নির্বাচনী পাঠ—এসবের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রতিরোধই দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রকে বাঁচায়। পরিবার, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র—সবখানেই নাগরিকত্বের অনুশীলন দরকার: ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, যুক্তির প্রতি আস্থা, তথ্য পরীক্ষার অভ্যাস।
ভারতের গণতন্ত্র রক্ষা পুনর্গঠনের পথ তাই খুব সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। ব্যালট রয়েছে, ফেডারেল কাঠামো রয়েছে, উদ্যমী নাগরিক সমাজ রয়েছে, আদালতের ভিত এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি—এসবই সম্ভাবনার উৎস। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র আজ যে টানাপড়েনে, সেখানে ভারতের গতিপথ শুধু দিল্লির রাজনীতির প্রশ্ন নয়; বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক কল্পনারও পরীক্ষা। প্রশ্নটি তাই এমন: ভারত কি আবার সেই পথেই ফিরবে, যেখানে ‘জনতার দ্বারা, জনতার জন্য, জনতার শাসন’ কেবল স্লোগান নয়—জীবন্ত বাস্তবতা? এ উত্তরের দায় দেশের রাজনীতিক, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সবার।
আর ইতিহাস বলে, দীর্ঘশ্বাসে, সংগঠিত প্রয়াসে গণতন্ত্র নিজেকে নতুন করে মেরামত করতে পারে—শুধু তাকে সেই সুযোগ দিতে হয়।
সানজিদা বারী: পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গবেষক ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়, শিকাগো