ভূরাজনীতি : ট্রাম্পিজম সংকটে বাংলাদেশের পথ কি হবে
ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক [সূত্র : বণিক বার্তা, ৯ জানুয়ারি ২০২৬]

ওয়াশিংটনে যখন রাজনৈতিক কম্পন শুরু হয়, তার প্রতিধ্বনি সচরাচর আমেরিকার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই কম্পন ছড়িয়ে পড়ে বাণিজ্য ব্যবস্থা, জলবায়ু আলোচনার টেবিল, ভূরাজনৈতিক মিত্রতা, পুঁজিপ্রবাহ এবং আরো সূক্ষ্মভাবে—ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা উচিত, সে সম্পর্কিত ধারণার মধ্য দিয়ে।
ওয়াশিংটনে যখন রাজনৈতিক কম্পন শুরু হয়, তার প্রতিধ্বনি সচরাচর আমেরিকার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই কম্পন ছড়িয়ে পড়ে বাণিজ্য ব্যবস্থা, জলবায়ু আলোচনার টেবিল, ভূরাজনৈতিক মিত্রতা, পুঁজিপ্রবাহ এবং আরো সূক্ষ্মভাবে—ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা উচিত, সে সম্পর্কিত ধারণার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য, যার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার, পূর্বানুমানযোগ্য আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন এবং জলবায়ু অর্থায়নে বৈশ্বিক সহযোগিতার ওপর, আমেরিকার রাজনীতির পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী নাটক নয়; এটি সরাসরি বাস্তব ও প্রাসঙ্গিক। এ প্রেক্ষাপট থেকেই ট্রাম্পিজমের সম্ভাব্য ভাঙন বা অন্তর্দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও গভীর মনোযোগের দাবি রাখে।
প্রায় এক দশক ধরে ট্রাম্পিজম কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। এটি একটি বৈশ্বিক সংকেত হিসেবে কাজ করেছে—যেন ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা যায় তাৎক্ষণিক ধ্বংস ছাড়াই, রাজনীতিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করা যায় সীমাহীন ও বেপরোয়াভাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলোকে কাঠামোগত দায়িত্বের বদলে দরকষাকষির পণ্যে পরিণত করা যায়। এখন সেই সংকেত নিজেই অস্থির হয়ে উঠছে। ‘মাগা’ আন্দোলনের ভেতরের ভাঙন, শাসন ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা এবং আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন পাল্টা প্রবণতার উত্থান একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনছে: ট্রাম্পিজম কি অবনমনপর্বে প্রবেশ করছে? এবং যদি তাই হয়, তবে তার প্রভাব বৈশ্বিক ব্যবস্থায়, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে ও বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে কীভাবে পড়বে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই ট্রাম্পিজমকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। ট্রাম্পিজম ছিল না ঐতিহ্যগত রক্ষণশীলতা, আবার কেবল ডানপন্থী জনতাবাদও (পপিউলিজম) নয়। এটি ছিল একটি সংকর রাজনৈতিক গঠন, যার চারটি মূল উপাদান ছিল। প্রথমত, একক ক্যারিশমাটিক নেতাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যক্তিকরণ। দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক ও মর্যাদাগত অবস্থান হারানোর শঙ্কানুভূতিকে ঘিরে ক্ষোভনির্ভর গণসংহতি। তৃতীয়ত, আদালত, গণমাধ্যম, আমলাতন্ত্র এবং এমনকি নির্বাচনের মতো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পদ্ধতিগত অবমূল্যায়ন ও বৈধতা হ্রাসের সক্রিয় প্রয়াস এবং চতুর্থত, একটি লেনদেনভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, যেখানে আইন, জোট ও নীতিমালাকে বাধ্যতামূলক কাঠামো নয়, বরং দরকষাকষির উপকরণ হিসেবে দেখা হয়। ট্রাম্পিজমের বিশেষত্ব ছিল মধ্যস্থতার প্রত্যাখ্যান। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করার বদলে পাশ কাটানো, বিদ্রূপ করা বা জোর-জবরদস্তির (বুলিংয়ের) মাধ্যমে আনুগত্যের অধীনস্থ করার প্রবণতাই ছিল এর বৈশিষ্ট্য।
এ মডেলটি ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ ও মনোযোগ সংগঠিত করতে অত্যন্ত কার্যকর ছিল, কিন্তু শাসন কাঠামো হিসেবে ছিল ভীষণ ভঙ্গুর। স্থায়ী উত্তেজনা ও সংঘাতের ওপর দাঁড়ানো রাজনীতি বাস্তব নীতি ও প্রশাসনিক ফলাফলে রূপ নিতে গিয়ে হোঁচট খায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গণজাগরণ ও কার্যকর শাসনের মধ্যকার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রাম্পিজমের শক্তি ছিল প্রচলিত ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টিতে; তার দুর্বলতা ছিল স্থায়িত্বে।
এ দুর্বলতাগুলোই এখন প্রকাশ পাচ্ছে। একসময় ঐক্যবদ্ধ মনে হওয়া মাগা জোট ক্রমে নিজস্ব অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত। কঠোর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো আরো চরম অবস্থানের জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক রিপাবলিকানদের একটি অংশ—যাদের মধ্যে দাতা, অঙ্গরাষ্ট্র পর্যায়ের নেতা ও নীতিনির্ধারক রয়েছেন—নির্বাচনী সক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। নীতিগত বিতর্কের জায়গা দখল করছে আনুগত্যের পরীক্ষা। আদর্শিক বিশুদ্ধতা কার্যকর শক্তি না হয়ে দায়ে পরিণত হচ্ছে। যে আন্দোলন মূলত আবেগী সংযুক্তি এবং বিভক্তিমুখী রাজনীতি ও বাগাম্বড়িতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ওপর নয়, তার ভাঙন আকস্মিক নয়; সেটিই স্বাভাবিক পরিণতি।
তবে এ অন্তর্দ্বন্দ্বকে জনতুষ্টিবাদের অবসান হিসেবে দেখাও ভুল হবে। এখানে মূল প্রশ্ন জনঅসন্তোষ বিলুপ্ত হয়েছে কিনা, তা নয়; বরং সেই অসন্তোষ কীভাবে রাজনৈতিকভাবে রূপায়িত হচ্ছে। এ জায়গাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা প্রবণতা সামনে আসতে শুরু করেছে, যা ট্রাম্পিজমের পতনের সরল ব্যাখ্যাকে জটিল করে তোলে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে জোহরান মামদানি এবং তার মতো রাজনীতিকদের উত্থান এমন একটি ধারার প্রতিনিধিত্ব করে, যা সাংস্কৃতিক বিভাজনের বদলে বস্তুগত অর্থনৈতিক প্রশ্নের দিকে ক্ষোভকে কার্যকরভাবে পুনর্নির্দেশিত করছে। কায়েমি স্বার্থবাদীদের, ক্ষমতাসীন দল ও গোষ্ঠীদের, বিশেষ করে মার্কিন জায়নবাদীদের, এমনকি স্বয়ং ট্রাম্পের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও বিরোধিতাও মামদানির বিজয়কে ঠেকাতে পারেনি। ইতিহাস গড়ে তিনি নিউইয়র্কের প্রথম মেয়র যার প্রথম হিসেবে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য রয়েছে: কনিষ্ঠতম মেয়র, মুসলিম মেয়র, ভারত এবং উগান্ডার জন্মসূত্র থেকে মেয়র এবং সর্বোপরি ইসরায়েলের বাইরে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদিদের নিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শহর নিউইয়র্কে ইসরায়েলি গণহত্যা এবং দখলদারি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উন্মুক্তভাবে অবস্থান নেয়া প্রথম মেয়র। তার পরও তিনি এখন নিউইয়র্কের মেয়র।
মামদানি ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ট্রাম্পিজমের একটি মৌলিক দুর্বলতাকে উন্মোচন করে। ট্রাম্পিজম একটি বিশেষ গোষ্ঠীর অসন্তোষ ও ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিলেও বাসস্থান ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবার খরচ কিংবা আয়-নিরাপত্তার মতো দৈনন্দিন অর্থনৈতিক চাপের কাঠামোগত সমাধান দিতে পারেনি। বরং তার শাসনামলে পলিসিগুলোই সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে, বিশ্বে আমেরিকার অবস্থানকে খর্ব করেছে। মামদানি ধরনের রাজনীতি বরং ভাড়া, মজুরি ও জনসেবার মতো প্রশ্নগুলোকে সরাসরি সামনে আনে এবং তা করে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর থেকেই, তার বিরুদ্ধে নয়। এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে না; বরং সেগুলোকে নতুনভাবে কাজে লাগাতে চায়, ক্ষমতায়নের নতুন বিন্যাসের ওপর গুরুত্ব দেয়।
এ ধরনের আন্দোলন যদি বিস্তৃতি পায়, তবে তা ট্রাম্পিজমকে নৈতিক নিন্দার মাধ্যমে নয়, বরং প্রাসঙ্গিকতার প্রতিযোগিতায় হারাতে পারে। যে রাজনীতি কেবল ক্ষোভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, বাস্তব অর্থনৈতিক সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান হাজির হলে তার বাতাস ফুরিয়ে যায়। এ বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্পিজমের সম্ভাব্য ভাঙন কেবল বিরোধিতার ফল নয়; বরং আরো বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক বয়ানের কাছে পরাজয়ের ফলও হতে পারে।
এর বৈশ্বিক তাৎপর্য কম নয়। ট্রাম্পিজম যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে পুনর্গঠন করেছিল বহুপক্ষীয়তার প্রতি অনীহা, জোট নিয়ে সংশয়, বাণিজ্যের অস্ত্রীকরণ এবং বৈশ্বিক শাসনকে ঐচ্ছিক হিসেবে দেখার মাধ্যমে। মিত্রদের জন্য এটি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, প্রতিপক্ষদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে এবং উদীয়মান অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে। যে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র কখনো সম্পৃক্ত, কখনো প্রত্যাহারমুখী, সেই বিশ্বে স্থিতিশীল নিয়মের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি অনেক বেশি, মূল্যও অনেক বেশি দিতে হয়।
ট্রাম্পিজম দুর্বল হলে একটি সম্ভাব্য ফল হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সম্পৃক্ততায় আংশিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা। এটি প্রাক-ট্রাম্প বৈশ্বিকীকরণে প্রত্যাবর্তন নয়, তবে জলবায়ু সহযোগিতা, বাণিজ্য স্থিতিশীলতা এবং প্রতিষ্ঠান সংস্কারে নতুন করে গুরুত্ব দেয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। জলবায়ু অর্থায়ন, বাণিজ্য সুবিধা, শ্রমমান আলোচনা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা—সবকিছুই নির্ভর করে বড় শক্তিগুলো বৈশ্বিক সহযোগিতাকে বোঝা হিসেবে দেখছে নাকি বিনিয়োগ হিসেবে।
একই সঙ্গে একটি বিশৃঙ্খল বা অসম্পূর্ণ ভাঙনের ঝুঁকিও আছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক আন্দোলনগুলো সাধারণত পরিষ্কার বা চূড়ান্তভাবে মিলিয়ে যায় না। ট্রাম্পিজম যদি সুসংগঠিত বিকল্প ছাড়া ভেঙে পড়ে, তবে এর সবচেয়ে চরম অংশগুলো আরো কঠোর হতে পারে, যা মেরুকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস ও অসহযোগিতা আরো বাড়াবে। বৈশ্বিকভাবে এর অর্থ হবে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, গণতান্ত্রিক শাসনের প্রতি আস্থা হ্রাস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকে স্বাভাবিক অবস্থায় পরিণত করা।
বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব বহুমাত্রিক। বাহ্যিকভাবে, একটি স্থিতিশীল ও সহযোগিতামুখী আন্তর্জাতিক পরিবেশ রফতানি প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য সহায়ক। অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকার অভিজ্ঞতা একটি পরোক্ষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—জনঅসন্তোষ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়, সেটিই আসল। অর্থনৈতিক চাপ, যুব বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস বাংলাদেশের জন্যও অপরিচিত নয়। প্রশ্ন হলো, এগুলো কি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক শাসনের মাধ্যমে মোকাবেলা করা হবে, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও বিভাজনের মাধ্যমে কাজে লাগানো হবে।
ট্রাম্পিজম দেখিয়েছে, প্রতিষ্ঠানকে বাধা হিসেবে দেখলে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড কত দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। মামদানি ধরনের পাল্টা প্রবণতা দেখাচ্ছে, কীভাবে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে রাজনীতিকে পুনঃসংযোগ করলে ক্ষোভকে গঠনমূলক পথে নেয়া সম্ভব। উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে বহন করা উদীয়মান দেশগুলোর জন্য এ বৈপরীত্য অত্যন্ত শিক্ষণীয়।
সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্পিজমের সম্ভাব্য ভাঙনকে উদার গণতন্ত্রের সহজ বিজয় বা জনতাবাদের চূড়ান্ত পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি বরং একটি রূপান্তরের মুহূর্ত, যা ক্ষোভনির্ভর শাসনের সীমা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক ফলাফলের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের আবশ্যকীয়তা উন্মোচন করে। বিশ্ব সহযোগিতার পথে ফিরবে নাকি আরো বিভক্ত হবে, তা নির্ভর করবে কোন শিক্ষা গ্রহণ করা হয় এবং কোনগুলো উপেক্ষিত থাকে তার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক গতিপথ ছোট অর্থনীতিগুলোর সম্ভাবনার ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেয়। ট্রাম্পিজম ছিল একটি সংকেত। তার অবনমন—যদি তা ঘটে, তাও হবে আরেকটি সংকেত। প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলো সেই সংকেতের জবাব দেবে দূরদর্শিতার সঙ্গে, নাকি কেবল প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের জন্য এ প্রেক্ষাপটে করণীয় ও বর্জনীয়—দুটিই এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্পষ্ট। করণীয় হলো বৈশ্বিক রাজনীতির ওঠানামাকে আবেগ বা পক্ষপাতের চোখে না দেখে স্বার্থভিত্তিক, বাস্তববাদী এবং প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা। একক কোনো শক্তি বা রাজনৈতিক ধারার ওপর অতিনির্ভরতা এড়িয়ে বহুপক্ষীয়তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি কৌশলগত অঙ্গীকার জোরদার করাই হবে বিচক্ষণ পথ। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক চাপ, যুবসমাজের হতাশা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত উদ্বেগকে অস্বীকার বা দমন না করে নীতিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের মাধ্যমে মোকাবেলা করা জরুরি, যাতে এসব ক্ষোভ ব্যক্তিকেন্দ্রিক, বিভাজনমূলক কিংবা প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতির কাঁচামাল হয়ে না ওঠে।
এ জায়গাতেই জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে তৈরি হওয়া নতুন উত্তরণের সুযোগটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা জাতিকে দেখিয়েছে—অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং সচেতন নাগরিকত্ব; ভয় নয়, বরং আত্মমর্যাদা এবং শক্তিশালী ব্যক্তির ওপর নির্ভরতা নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা। এ অভিজ্ঞতালব্ধ বিচক্ষণতা যদি টেকসই আত্মবিশ্বাসে রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশ কেবল প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিজের অবস্থান সুসংহত করা একটি আত্মবিশ্বাসী উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারে।
যা এড়ানো প্রয়োজন তা হলো বাইরের রাজনৈতিক মডেলের অন্ধ অনুকরণ—বিশেষ করে এমন প্রবণতা, যা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, জবাবদিহির বদলে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয় এবং স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ট্রাম্পিজমের অভিজ্ঞতা যদি কোনো শিক্ষা দিয়ে থাকে, তবে তা হলো: অনিশ্চিত ও বহুধাবিভক্ত বিশ্বে টিকে থাকতে হলে আক্রমণাত্মক বা বর্জনমূলক জাতীয়তাবাদ নয়, বরং সত্যিকার, সুষম ও আত্মবিশ্বাসী জাতীয়তাবাদই প্রয়োজন, যা জাতিকে বিভক্ত করে না, বরং ঐক্যবদ্ধ করে; যা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে না, বরং শক্তিশালী করে এবং যা কেবল অতীতের গৌরব নয়, ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির দিকেই দৃষ্টি রাখে।
ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি