কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ভূরাজনীতি, জাতীয় সক্ষমতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

ড. মিজানুর রহমান [প্রকাশ : ইত্তেফাক, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫]

ভূরাজনীতি, জাতীয় সক্ষমতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল, বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার, বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিকটবর্তী এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। একদিকে এর সামনে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে পেছনে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের মতো অঞ্চল। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য যেমন বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি বহুমুখী চাপ ও চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো যখন বাণিজ্যিক করিডর, সামুদ্রিক পথ, নিরাপত্তা জোট কিংবা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়, তখন বাংলাদেশের অবস্থান তাদের কৌশলগত হিসাবের অংশ হয়ে ওঠে।

 

 


চীন ও ভারতের মতো বিশ্বের দুই বৃহৎ জনসংখ্যার ও শক্তিধর দেশের মধ্যখানে অবস্থান করাকে অনেকেই ঝুঁকি হিসেবে দেখেন, কিন্তু কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। এর জন্য প্রথম শর্ত হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি-কারো সঙ্গে স্থায়ী শত্রুতা নয়, আবার অন্ধ আনুগত্যও নয়। ভারত ও চীনের সঙ্গে আলাদা আলাদা অর্থনৈতিক, অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে পৃথক ট্র্যাকে রেখে বাংলাদেশ যদি 'ইস্যুভিত্তিক সহযোগিতা' নীতি গ্রহণ করে, তবে প্রতিযোগিতামূলক শক্তিগুলোর মধ্যকার ভারসাম্য থেকেই সে উন্নয়নমূলক সুবিধা আদায় করতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে নীল অর্থনীতি, বন্দর, জ্বালানি করিডর ও লজিস্টিক হাব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা গেলে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্য বহুগুণে বাড়বে।

 

 


ভূরাজনীতিকে বোঝার জন্য তাত্ত্বিক ভিত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাসিক্যাল ভূরাজনীতির চিন্তাবিদরা বহু আগেই দেখিয়েছেন যে, ভূগোল রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক সময়ে এসব তত্ত্ব আরো বিস্তৃত হয়ে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যা আজ 'জিও-ইকোনমিকস' নামে পরিচিত। অর্থাৎ, এখন কেবল সামরিক ঘাঁটি বা ভৌগোলিক দখল নয়, বরং বন্দর, বিনিয়োগ, ঋণ, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাজারে প্রবেশাধিকারও ভূরাজনীতির অংশ।

 

 

এই তাত্ত্বিক বাস্তবতায় 'জাতীয় সক্ষমতা' ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। জাতীয় সক্ষমতা বলতে শুধু সামরিক শক্তি বোঝায় না; বরং এর মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও অন্তর্ভুক্ত। অনেক রাষ্ট্র রয়েছে, যাদের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তারা সেই সুবিধা থেকে কাঙ্ক্ষিত লাভ তুলতে পারে না-কারণ তাদের জাতীয় সক্ষমতা সেই গুরুত্বকে ধারণ ও পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত নয়। আবার কিছু রাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ কূটনীতি ও সুস্পষ্ট কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।

 

 


বাংলাদেশকে এই প্রেক্ষাপটে একটি 'মধ্যম ক্ষমতাধর' বা উদীয়মান রাষ্ট্র হিসেবে দেখা যায়, যার কাছে সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

 

 

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব মূলত তার ভৌগোলিক অবস্থান থেকে উৎসারিত হলেও, একে কেবল মানচিত্রের একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকা হিসেবে দেখলে বাস্তবতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলাদেশ এমন একটি ভূখণ্ডে অবস্থিত, যেখানে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত গতিশীলতা একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত। এই সংযোগস্থল হওয়ার কারণেই দেশটি শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর জন্যও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। বঙ্গোপসাগরের উত্তর তীরে অবস্থিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি স্বাভাবিক প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

 

 

বঙ্গোপসাগর নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল। এই উপসাগর দিয়ে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য চলাচল করে। বিশ্বের ব্যস্ততম সামুদ্রিক রুটগুলোর সঙ্গে যুক্ত এই অঞ্চল কেবল পণ্য পরিবহনের পথ নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সম্পদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা একদিকে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও বাড়িয়েছে।

 

 

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এর স্থলভিত্তিক সংযোগ। দেশটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক করিডর হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে চীন, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে স্থল ও নৌ-যোগাযোগের সম্ভাবনাও বাংলাদেশের মাধ্যমে প্রসারিত হতে পারে। এই সংযোগব্যবস্থা কেবল বাণিজ্যিক নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাব, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ফলে বাংলাদেশের প্রতিটি অবকাঠামো প্রকল্প, বন্দর উন্নয়ন বা যোগাযোগ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় স্থান পায়।

 

 

এই বাস্তবতার ফলে বাংলাদেশ একাধিক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসাবের মধ্যে পড়েছে। ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে তার আঞ্চলিক কানেকটিভিটি ও নিরাপত্তা-কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক সংযোগের প্রশ্নে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার উপস্থিতি জোরদারের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে, কৌশলগত অবস্থান ও শক্তিশালী পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হবে না, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বাড়াতে সক্ষম হবে।

 

 

তবে এই কৌশলগত অবস্থান সব সময় স্বস্তিদায়ক নয়, বরং ভৌগোলিক বাস্তবতা দেশটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ঝুঁকির মুখেও ফেলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তার মিত্ররা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও মুক্ত বাণিজ্যপথ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে। এই বহুমুখী আগ্রহ একদিকে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ালেও, অন্যদিকে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন করে তুলেছে।

 

 

অবস্থানের বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। বৃহৎ জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একই সঙ্গে দেশটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে শ্রমঘন শিল্পে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের ভূরাজনীতিকে কেবল সামরিক বা নিরাপত্তাগত নয়, বরং অর্থনৈতিক কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আজকের বিশ্বে যেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিপ্রবাহ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান একটি স্পষ্ট জিও-ইকোনমিক গুরুত্ব ধারণ করছে।

 

 

বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় সুবিধা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে নেপাল, ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যসমূহ এবং অন্যান্য উত্তর-পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও পরিকাঠামোগত সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে এই দেশ ও রাজ্যগুলোর সঙ্গে সরাসরি পণ্য পরিবহনের জন্য একটি মূল রুট হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য করলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য আর্থিক লাভ অর্জন করতে পারবে। এছাড়াও, এ ধরনের নেগোসিয়েশন বাংলাদেশের বহুজাতিক বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধিতেও সাহায্য করবে, যা অর্থনীতির উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ক্ষয় এবং নদীভিত্তিক পরিবেশগত সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও চাপের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

 

বাংলাদেশের অবস্থান যেমন সুযোগের, একই সঙ্গে একটি ঝুঁকিরও। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যখানে অবস্থান করার অর্থ হলো-প্রতিটি সিদ্ধান্তই আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষিত হবে এবং প্রায়শই চাপের মুখে পড়বে। কোন অবকাঠামো প্রকল্পে কার বিনিয়োগ থাকবে, কোন নিরাপত্তা উদ্যোগে অংশ নেওয়া হবে কিংবা কোন আন্তর্জাতিক ফোরামে কী অবস্থান নেওয়া হবে-প্রতিটি প্রশ্নই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে ওঠে।

 

 

এই জটিল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে কোনো সামরিক জোটে হঠাৎ করে যুক্ত হওয়ার চেয়ে বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্ল্যাটফরমে সক্রিয় হওয়াই বেশি লাভজনক। আসিয়ানের সঙ্গে সেক্টরাল পার্টনারশিপ, BIMSTEC-কে কার্যকর করা ও Indo-Pacific কাঠামোতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা-এসবের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেকে একটি 'সংযোগকারী শক্তি' হিসেবে তুলে ধরতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পর্যায়ে রাখা যেতে পারে, কিন্তু ন্যাটোর মতো পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে জড়ানো হবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এমন চুক্তি বাংলাদেশকে বড় শক্তির সংঘাতে টেনে নিতে পারে, যা তার অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হবে। বরং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে 'ডিটারেন্স নয়, রেজিলিয়েন্স'; অর্থাৎ নিজেকে আক্রমণ-অযোগ্য নয়, বরং ব্যয়বহুল লক্ষ্য বানানোর কৌশল গ্রহণ করাই যুক্তিসংগত।

 

 

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট