কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ভূরাজনীতি : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের অভিঘাত

ফারুক মঈনউদ্দীন [আপডেট: বণিক বার্তা, ১ এপ্রিল ২০২৬]

ভূরাজনীতি : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের অভিঘাত

‘কেবলি জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে/ দেখেছি ফসল নিয়ে উপনীত হয়;.../ দেখেছি যা হ’লো হবে মানুষের যা হবার নয়/ শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।’ কবি জীবনানন্দ দাশ যতই আমাদের বন্দরে ফসল নিয়ে উপনীত হওয়া জাহাজের কথা, কিংবা শাশ্বত রাত্রির বুকে সূর্যোদয়ের কথা বলেন, প্রকৃতপক্ষে আমাদের দুঃখের তিমিরে জ্বলে না মঙ্গলালোক।

 
 
 

বাংলাদেশ যখনই কোনো নতুন সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়, তখনই কিছু একটা সমস্যা এসে এলোমেলো করে দেয় সব। নিকট অতীতে দেশের অর্থনীতি যখন করোনা মহামারীর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে দৃশ্যমানভাবে পুনরুদ্ধার লাভ করতে যাচ্ছিল, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলে নতুন সংকটের মুখে পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশে আমদানি করা গম, ভোজ্যতেল, পোলট্রি খাবারের মূল উপাদান ভুট্টা, রাসায়নিক সার, তেল-গ্যাস সব ধরনের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিরূপ প্রভাবের আঘাত সইতে হয় বাংলাদেশকে, যা এখনো চলমান।

 
 
 
 
 
 
আওয়ামী সরকার আমলে স্বজনতোষণের অর্থনীতি, ব্যাপক দুর্নীতি, বাজার সিন্ডিকেট ও মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল যে প্রবল ক্ষোভ, সে ক্ষোভ প্রশমনে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল বিভিন্ন মাজার ও ভাস্কর্য কিংবা ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙার প্রশ্রয়দানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, মবের রাজত্ব, নতুন রূপে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব কোনোটাই দমন করতে পারেনি তারা। ২০২২ সালের দারিদ্র্যের হার ১৮ থেকে বেড়ে চলে গিয়েছিল ২৮ শতাংশের কাছাকাছি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানো গেলেও তাতে সরকারের কৃতিত্বের চেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে হ্রাসকৃত আমদানি এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের বর্ধিত রেমিট্যান্স। বিনিয়োগ ও অন্যান্য প্রায় সব বিষয়ে জাতিকে একগাদা বায়বীয় প্রতিশ্রুতি এবং বেশকিছু অপকর্মের বাইরে দেশ ও জাতিকে কিছুই দিয়ে যেতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার।
 
 
 

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের বিপুল আশাবাদের মধ্যে একক দল হিসেবে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। দীর্ঘ ২০ বছর পর নবোদ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের দুই সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই শুরু হয় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, যার পক্ষভুক্ত হয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাধর দেশও। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে যে ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার ষোলোকলা পূর্ণ হয় যেন। এ যুদ্ধের অভিঘাতে ইরান ছাড়াও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আমিরশাহি ও কাতার।

 

 

 

 হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ায় এসব দেশ থেকে জ্বালানি তেল ও তরল গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে কিংবা কমে গেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। বিশ্বের মোট তেল ও তরল গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ২০২৫ সালে এ পথ ব্যবহার করে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি হয়েছে বিভিন্ন দেশে, যা ছিল মোট জ্বালানি সরবরাহের ৩১ শতাংশ। সুতরাং ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী পারস্য উপসাগর ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা প্রায় ১৫০ কিলোমিটারের বাঁকানো জলপথটি বন্ধ হওয়া কিংবা স্বাভাবিক পরিবহন ব্যবস্থার বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতিতে ডেকে আনবে বিশ্ব তেলের বাজারের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল কিংবা তরলীকৃত গ্যাসের জাহাজ বহির্বিশ্বে যাওয়ার জন্য হরমুজ প্রণালি ছাড়া দ্বিতীয় বিকল্প পথ আর নেই। ফলে উপসাগরীয় তেল ও তরল গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হবে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান, কোরিয়া প্রভৃতি দেশও।

 
 
 

উপসাগরীয় তেলের সরবরাহ বন্ধ হলে বা হ্রাস পেলে বাংলাদেশের ওপর সরাসরি আঘাত আসবে মূলত দুটো দিক থেকে—প্রথমত, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও তরল গ্যাস কিনতে হলে গুনতে হবে অবিশ্বাস্য চড়া দামে। দ্বিতীয়ত, আরব বিশ্বের তেল উৎপাদন ও বিক্রি কমে গেলে আমাদের রেমিট্যান্স খাতে পড়বে এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব। কারণ বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের একটা বিশাল অংশ আসে আরব বিশ্বে কর্মরত ৫৫ লাখেরও বেশি জনশক্তি থেকে। এদের মধ্যে কেবল সৌদি আরবেই বাস করে ৩৫ লাখ বাংলাদেশী, তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বার্ষিক পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার। সংযুক্ত আমিরশাহি, ওমান, কাতার ও কুয়েত মিলিয়ে দেশগুলোয়ও কাজ করে প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশী। সুতরাং আমাদের প্রবাসী আয়ের ৭৫ শতাংশই যেখানে আরব বিশ্ব থেকে আসে, সেখানে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে প্রবাসী আয়ের ওপর কতখানি বিরূপ প্রভাব পড়বে, সেটা সহজেই অনুমেয়।

 

 

 

বিরূপ প্রভাব কেবল এ দুই খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটির ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া অনুভূত হবে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, স্বাভাবিক বাণিজ্যপ্রবাহে বিঘ্ন, মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মচ্যুতির ফলে রেমিট্যান্স আয়ে ভাটা, রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারানো, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সর্বোপরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপের মধ্য দিয়ে। রিজার্ভ কমায় আমাদের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা ৫ দশমিক ৭ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ মাসে নেমে আসতে পারে। কেবল রিজার্ভের ওপর চাপই নয়, ভর্তুকি বাবদ সরকারের খরচও বেড়ে যাবে অস্বাভাবিক হারে। জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের বার্ষিক খরচ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। বর্তমান বিশ্ব বাজারের হিসাবে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয় মাসে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

 

 

সরকার এখনো ভর্তুকির চাপ কমানোর কথা চিন্তা করছে না, কিন্তু সরকারি রাজস্ব আহরণের যে হাল, তাতে কতদিন বাড়তি চাপ সামাল দেয়া যাবে তাতে সংশয় আছে। সামাল দিতে না পারলে অর্থাৎ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে যদি ভর্তুকি কমিয়ে দিতে হয়, তাহলে জ্বালানির বর্ধিত দামের মাশুল দিতে হবে দেশের ধনী-নির্ধন সর্বস্তরের মানুষকেই। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ, পরিবহন ও যাতায়াত এবং শিল্পের উৎপাদন খরচ সবই বেড়ে যাবে, যার অভিঘাত অনুভূত হবে মূল্যস্ফীতির ভেতর দিয়ে। কঠোরভাবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োগ করে এতদিনেও মুল্যস্ফীতির হার কোনোভাবেই ৮ শতাংশের নিচে নামানো যায়নি, যা আবার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধের ফলে কেবল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির এ হার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা এখনই কল্পনা করা যাচ্ছে না।

 

 

 

সর্বশেষ ৩১ মার্চ খবরে জানা যায় অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৩ ডলার, জানুয়ারিতেও যা ছিল ৬৫ ডলারের ঘরে। এক গবেষণা রিপোর্ট থেকে জানা যায় এ দাম যদি ১২০ ডলার ছাড়ায়, তাহলে বছরে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের খরচ বেড়ে যাবে ৬১ হাজার কোটি টাকা। অন্য এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার বাড়তি দাম যদি এক বছর স্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশের আার্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০২৪ সালের মোট জিডিপির ১ শতাংশের সমান। যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহলে আগামী দুই বছরে জিডিপি ৩ শতাংশ কমবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং, সানেম। ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যে তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো সংস্কার করে আগের উৎপাদনক্ষমতা পুনর্বহাল করতে কত সময় লাগবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।

 

 

 

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক মাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নয়টি দেশের কমপক্ষে ৪০টি তেল ও গ্যাস স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী এক সরবরাহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান সংকটের ভয়াবহতার পরিমাণ ১৯৭০ সালের তেল এবং ২০২২ সালের কভিড-পরবর্তী গ্যাস সংকটের সম্মিলিত ক্ষতির সমান হবে। ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবাহী গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারের লাস রাফান শিল্পশহরের তরল গ্যাস স্থাপনাটির উৎপাদন কমে গেছে ২০ শতাংশ, যা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে তিন-পাঁচ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

 

 

 

আমাদের জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধানতম উৎসের দেশগুলোকে ঘিরে যুদ্ধের প্রভাবে কেবল জ্বালানি নিরাপত্তাই যে হুমকির মুখোমুখি হবে তা নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবহন খাতেও দেখা দেবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। এ রকম যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পণ্য জাহাজীকরণের ইন্স্যুরেন্স খরচ বেড়ে যায়। ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ এড়িয়ে চলতে গিয়ে জাহাজের ভাড়াও বাড়িয়ে দিতে হয়, যার সঙ্গে যুক্ত হবে জ্বালানি তেলের বাড়তি মূল্য। ফলে আমদানি খরচ যেমন বাড়বে, তেমনই রফতানি বাজারে কমবে আমাদের মূল্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। এ উপসর্গের সঙ্গে যদি ডলারের বিপরীতে টাকার আরেক দফা অবমূল্যায়ন ঘটে, তাহলে আমদানি ব্যয়ের ওপর চেপে বসবে আরো বাড়তি বোঝা।

 

 

 

যে আরেকটি খাতে যুদ্ধের প্রভাব পড়বে, সেটি হচ্ছে রাসায়নিক সার সরবরাহ। প্রতি বছর প্রায় ২৭ লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করে বাংলাদেশ, যার ৭০ শতাংশই আসে মূলত সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আমিরশাহি থেকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর।

 

 

 

ওপরে বর্ণিত ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য ও ভীতিকর প্রভাবগুলোর সঙ্গে আরো বহু সম্পূরক দুর্যোগ যুক্ত হতে পারে, যা মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা এখনও নির্ণীত হয়নি। এমনকি নির্ণয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে তেমন লক্ষণ সরকারি মহলের মনোভাবে এখনো দৃশ্যমান নয়। এমনো হতে পারে, জনগণকে আতঙ্কিত না করার জন্য প্রকৃত পরিস্থিতিকে অস্বীকার একটা চেষ্টা চালানো হচ্ছে। যেমন সারা দেশে যখন জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার চলছে, তখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসদে জোর দিয়ে বলছেন দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আশ্বস্ত করছে যে যুদ্ধ তিন-চার মাস পর্যন্ত চললেও আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে আমাদের, টাকা-ডলার বিনিময় হারও এখন পর্যন্ত স্থিতিশীল। পরিস্থিতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে বিদেশী ঋণ পাওয়ার চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। তবে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণের আরেকটি কিস্তি পাওয়ার শর্ত হিসেবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর জন্য চাপ দেয়, সেটি উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে আমাদের জন্য। সেক্ষেত্রে আরেক দফা মূল্যস্ফীতি ঘটবে, যা কেবল মুদ্রানীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হবে।

 

 

 

নবনির্বাচিত সরকারের সামনের চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো কঠিন করে দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাহীন অদক্ষতার ফলে রেখে যাওয়া জঞ্জাল পরিষ্কার করার পাশাপাশি সরকারের ওপর মানুষের প্রত্যাশার অতিরিক্ত চাপ মোকাবেলা করা খুব সহজ কাজ হবে না। আরো কঠিন হবে দীর্ঘদিন ক্ষমতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকা দলীয় নেতাকর্মীদের সংযত রাখা। পাশাপাশি রয়েছে সরকারের জনতুষ্টিমূলক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। যেমন ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের জন্য বার্ষিক ৬০ হাজার কোটি কিংবা কৃষি-ঋণ মওকুফের জন্য দেড় হাজার কোটি টাকার মতো বাজেট-বহির্ভূত খরচ। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের বিশাল চাপ, যার জন্য বাড়তি প্রয়োজন হবে বার্ষিক ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। দেশের রাজস্ব আদায়ের চলমান দুরবস্থায় এসব চাপ মোকাবেলা করার জন্য সরকারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। এ বিষয়ে সরকারের দুশ্চিন্তা কতখানি আছে বোঝা না গেলেও দেশের সচেতন মানুষ উদ্বিগ্ন।

 

 

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিএনজিচালিত যানবাহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ, জ্বালানির ওপর কর প্রত্যাহার, অফিসে না গিয়ে বাড়ি থেকে কাজ করা, গাড়ির ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী তেলের রেশনিং ব্যবস্থা, সরকারি স্থাপনা ও অফিসের অপচয় রোধের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ তেল সরবরাহ বৃদ্ধির ব্যর্থ চেষ্টার বদলে চাহিদা কমানোর উদ্যোগ হবে অনেক বেশি সহজ ও ফলপ্রসূ। কিন্তু সরকার যদি স্বীকারই না করে যে দেশে জ্বালানি সংকট আছে, তাহলে পরিস্থিতির আশু উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই। বিভিন্ন দেশে গৃহীত স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাগুলো অনুসরণের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার সংস্কার ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে কর-জিডিপির হার গ্রহণযোগ্য মাত্রায় উন্নীত করতে হবে, (এখানে করদাতাদের মানসিকতা পরিবর্তনের গুরুত্ব অপরিসীম) গতি আনতে হবে নবায়নযোগ্য শক্তি সংগ্রহ ও উৎপাদনে, রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য আরব বিশ্বের বাইরের বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, দেশের তরুণদের জন্য প্রয়োজনীয় বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও বিদেশী ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বিদেশী শ্রমবাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়, বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কথার ফুলঝুরি ছড়ানোর পরিবর্তে কার্যকর করতে হবে ঘোষিত সব ধরনের প্রণোদনা। এ ব্যাপারে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ, কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে রফতানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিতে হবে।

 

 

সর্বোপরি উপরোক্ত করণীয়গুলোকে উপেক্ষা না করে কার্যকরের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে সরকারপ্রধানের কথাগুলো ইউনূসীয় বাগাড়ম্বরে পরিণত না হয়।

ফারুক মঈনউদ্দীন: ব্যাংকার ও লেখক