কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ভূ-রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে আসিয়ান

ড. সুজিত কুমার দত্ত [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ৩০ অক্টোবর ২০২৫]

ভূ-রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে আসিয়ান

এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র আজ এমন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রকে ভারসাম্যের দড়ির ওপর দাঁড়িয়ে পথ খুঁজতে হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল আঞ্চলিক সংগঠন আসিয়ান সেই দড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক সংকট ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষার ভারসাম্য রক্ষার এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে। গত ২৬ থেকে ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ৪৭তম আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন ছিল সংগঠনের ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং, জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাতিসংঘসহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

 

 


এ বছরেই পূর্ব তিমুর আনুষ্ঠানিকভাবে আসিয়ানের ১১তম সদস্য দেশ হিসেবে সদস্য পদ লাভ করে। দুই দশকের বেশি সময় পর ব্লকের প্রথম সম্প্রসারণ। তবে এই উৎসবমুখর সম্প্রসারণের পেছনেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট। আসিয়ান কি এখনো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক, নাকি এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে মহাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের রণক্ষেত্রে?
এই সম্মেলনকে ‘আসিয়ানের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা’ বলা হচ্ছে।

 

 


কারণ সংগঠনটি একই সঙ্গে তিনটি জটিল ইস্যুর মুখোমুখি। প্রথমত, মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট, যা আসিয়ানের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে মায়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি চলমান। আসিয়ানের গৃহীত পাঁচ দফা ঐকমত্যের (Five Point Consensus) মধ্যে শান্তি সংলাপ, সহিংসতা বন্ধ ও মানবিক সহায়তার কথা বলা হয়েছিল, তা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

 

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে নতুন শীতল যুদ্ধের থিয়েটারে পরিণত করছে। তৃতীয়ত, ২০৪৫ সালের মধ্যে ‘ASEAN Community Vision 2045’ বাস্তবায়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যা অর্থনৈতিক সংহতি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন ও মহাশক্তির টানাপড়েন সেই লক্ষ্য পূরণকে জটিল করে তুলছে।
ফিলিপিন্স আজ আসিয়ানের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। কিভাবে ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির দ্বন্দ্বে পড়ে দিশাহারা হতে পারে।

 

 


প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছেন, চারটি নতুন ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের প্রবেশাধিকার দিয়েছেন এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী অবস্থানের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব নিয়েছেন। কিন্তু এই নীতি ফিলিপিন্সের জন্য যেমন নিরাপত্তার আশ্বাস, তেমনি ঝুঁকিও বয়ে আনছে। কারণ এতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো তিক্ত হচ্ছে, যা পুরো আসিয়ান জোটের ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মার্কোসের এই নীতির পর মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামকেও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হচ্ছে।

 


ভিয়েতনাম এ অঞ্চলের এক অনন্য উদাহরণ। তারা দেখিয়েছে, কিভাবে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হ্যানয় যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে ‘Comprehensive Strategic Partnership’-এ উন্নীত করেছে। তবে একই সঙ্গে ভিয়েতনাম চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ঘনিষ্ঠতা ধরে রেখেছে। এই ভারসাম্যের কূটনীতি আসিয়ানের জন্য মডেল হতে পারত যদি না বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এত অনিশ্চিত হতো। ট্রাম্পের অস্থির নীতি ও চীনের ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস আসিয়ানের এই ‘মধ্যপথ’ কৌশলকে দুর্বল করছে।

 

 

আসিয়ান গঠিত হয়েছিল পারস্পরিক সম্মান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতিতে। এই নীতিগুলো একসময় সংগঠনটিকে স্থিতিশীলতা দিয়েছিল। কিন্তু আজ এগুলোই অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। মায়ানমারের সংকটেই দেখা গেছে, কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে একাধিক সদস্য আপত্তি জানায়। ফলে ‘সম্মতি’র নামে সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে, আর আন্তর্জাতিক মহলে আসিয়ানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এদিকে আসিয়ান সচিবালয়ের সীমিত বাজেট ও ক্ষমতা কার্যত নীতি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

 

 

মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি মোহাম্মদ হাসান সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে ‘ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে আসিয়ানকে নিরপেক্ষতার বাতিঘর ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে টিকে থাকতে হবে। এই পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব নিতে হবে মায়ানমারের জনগণকেই; আসিয়ান থাকবে সহায়ক ভূমিকায়, চাপের নয়।’ এই বক্তব্যে আসিয়ানের আত্মপরিচয়ের মূল দিকটি স্পষ্ট হয়—উন্মুক্ততা, দৃঢ়তা ও ঐক্য। মালয়েশিয়া ও চীনের জন্য আসিয়ান সমন্বয়কারী হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর আচরণবিধি প্রণয়নের অগ্রগতি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

 

৪৭তম আসিয়ান সম্মেলন ছিল এক ধরনের স্ট্রেস টেস্ট। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান বহুপক্ষীয় সংস্থা হিসেবে আসিয়ান এখনো কতটা প্রাসঙ্গিক, তা যাচাই করার সুযোগ। ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, মায়ানমারের অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই যুগে আসিয়ানকে শুধু নীতির জোট নয়, কার্যকর কর্মপরিকল্পনার জোটে পরিণত হতে হবে। আসিয়ান কি তার ঐক্য রক্ষা করে নিরপেক্ষতার মশাল জ্বালিয়ে রাখতে পারবে, নাকি ভূ-রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে যাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেই ঐক্যের স্বপ্ন? যদি আসিয়ান আজ সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ‘এক অঞ্চল, এক দৃষ্টি, এক ভবিষ্যৎ’ আদর্শে দৃঢ় থাকে, তবে এশিয়ার এই অংশ এখনো হতে পারে বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতার অনন্য দৃষ্টান্ত। অন্যথায় আসিয়ানের ভবিষ্যৎও হারিয়ে যাবে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অন্ধকার ঘূর্ণিপাকে।

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়