
ভর্তুকি দ্বন্দ্বে আইএমএফের ঋণ
আবু আলী [সূত্র : যুগান্তর, ২০ জুলাই ২০২৬]
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় অচলাবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের ভর্তুকি নীতি। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে সরকারি ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমিয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার সুপারিশ করে আসছে। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকার উল্টো ভর্তুকির বরাদ্দ বাড়িয়েছে। এতে আইএমএফের সঙ্গে চলমান সংস্কার কর্মসূচি এবং নতুন করে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ঋণ কর্মসূচি দুটিই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকায় সফর করে যাওয়া আইএমএফের প্রতিনিধি দল সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে ভর্তুকি বৃদ্ধির বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বাজেটে ভর্তুকি বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তারা পূর্ববর্তী সংস্কার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা, আর্থিক খাত সংস্কার এবং ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণসহ একাধিক কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো, যাতে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমে।
তবে নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন সচল রাখা এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার যুক্তি দেখিয়েছে। সরকারের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভর্তুকি দ্রুত কমিয়ে দিলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এতে শিল্প ও কৃষির উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে আইএমএফের অবস্থান হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে বড় আকারের ভর্তুকি সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে। এতে বাজেট ঘাটতি বাড়ে, উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অর্থের সংকট তৈরি হয় এবং সরকারি ঋণের চাপও বৃদ্ধি পায়। সংস্থাটি মনে করে, সার্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বেশি কার্যকর।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান তিন বছরের ঋণ কর্মসূচির বিভিন্ন অসম্পূর্ণ শর্ত নিয়ে আলোচনা চললেও সরকার একই সময়ে নতুন করে প্রায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে দর-কষাকষি করছে। তবে নতুন কর্মসূচিতে যেতে হলে আগের সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে বলে সংস্থাটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে ভর্তুকি কমিয়ে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ঋণ কর্মসূচির আওতায় কমিয়ে আনার হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, ভর্তুকি ইস্যু এখন শুধু বাজেট ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশ-আইএমএফ সম্পর্কের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে সরকার মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক চাপ সামাল দিতে ভর্তুকি ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে আইএমএফ আর্থিক শৃঙ্খলা ও বাজেট সংস্কারের অংশ হিসেবে ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে। এই দুই অবস্থানের সমন্বয় না হলে বর্তমান কর্মসূচির ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত হতে পারে, তেমনি নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবকে প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে জনস্বার্থ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থা বজায় রেখে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা। সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী মাসগুলোতে সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
এদিকে আইএমএফের পরামর্শ ছিল ধাপে ধাপে ভর্তুকির বোঝা কমিয়ে বাজেটের ওপর চাপ হ্রাস করা। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার উল্টো ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ফলে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় ভর্তুকি ইস্যু আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি।
যদিও কৃষি ভর্তুকি ২৭ হাজার কোটি টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চ খরচ সামগ্রিক ভর্তুকি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির আর্থিক ঘাটতি পূরণ এবং সারের দাম কৃষকের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে আইএমএফের অবস্থান হলো, দীর্ঘমেয়াদে সার্বজনীন ভর্তুকি অর্থনীতির জন্য টেকসই নয়। সংস্থাটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য ধাপে ধাপে বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা চালুর সুপারিশ করে আসছে। আইএমএফের মতে, এতে বাজেট ঘাটতি কমবে, সরকারি ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে সরকারের যুক্তি ভিন্ন। তাতে সংস্থাটিকে জানানো হয়েছে: বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ভর্তুকি দ্রুত কমিয়ে দিলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। তাই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার আপাতত ভর্তুকি বহাল রাখার পথ বেছে নিয়েছে।



