ভিসা বন্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে
এম হুমায়ুন কবির [প্রকাশ: সমকাল, ১০ জানুয়ারি ২০২৬]

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের জন্য মার্কিন ভিসা বন্ড জারি করেছেন, যার মাধ্যমে দেশটিতে ব্যবসা ও পর্যটকদের আর্থিক জামানত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে। গত বছরের আগস্টে প্রথমে ভিসা বন্ডের শর্তযুক্ত দেশের তালিকায় ছয়টি দেশের নাম যুক্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন। পরে আরও সাতটি দেশকে এই তালিকায় যুক্ত করা হয়। এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই গত মঙ্গলবার বাংলাদেশসহ আরও ২৫টি দেশের নাম যোগ করল যুক্তরাষ্ট্র।
মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি চালিয়ে আসছেন। এই পদক্ষেপ তাঁর সেই রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা। ভিসা বন্ডের শর্ত অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট দেশের ভ্রমণকারীদের প্রবেশ করার আগে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত দিতে হবে। ভিসা বন্ডের এই সিদ্ধান্তে বিশেষত বাংলাদেশের মতো দেশগুলো থেকে যারা অভিবাসী হিসেবে গেছেন, তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ব্যবসার খরচও এতে বেড়ে যেতে পারে, কারণ ব্যবসায়ীদের প্রায়ই আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে হয়।
ট্রাম্পের এই ধারার রাজনীতির বিচিত্র মুখ রয়েছে, যা আমরা দেখছি। এটি তারই সর্বশেষ প্রকাশ। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি দুটি বিষয়কে বেশ জোরালোভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। অভিবাসন ও অর্থনীতি। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি ক্ষমতায় আসার দু-এক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেন। বহু মানুষ তাঁর এই কঠোর পদক্ষেপের শিকার হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে বাধ্য হন। অনেক বাংলাদেশিকেও ইতোমধ্যে এ কারণে দেশে ফিরতে হয়েছে, সামনে আরও অনেককে একই দুর্ভাগ্য বরণ করতে হবে। বাংলাদেশ, ভারতসহ অন্যান্য দেশে কীভাবে অভিবাসীরা ফিরে এসেছেন, তা আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। দেশটির বিভিন্ন শহরে যেভাবে ধরপাকড় হয়েছে, তা আমরা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ইতিহাসে কখনও দেখিনি। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে, তাদের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বের করে দিয়েছেন। ব্যাপারটি ঘটেছে সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষদের ক্ষেত্রে, যাদের বেশির ভাগই অনিবন্ধিত, ল্যান্ড অব অপরচুনিটি বলে পরিচিত দেশটিতে গিয়েছিলেন নিজের ভাগ্য বদলের আশায়।
প্রচুর উচ্চশিক্ষিত লোকও যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। করপোরেট, আইটি, ব্যবসা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ এখানে কাজ করছেন। চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে তারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছেন বি২ ভিসা নিয়ে। এ ক্ষেত্রেও তিনি এখন বহু জটিল শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ফলে অতি দক্ষ মানুষদেরও আগের মতো চাইলেই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া সম্ভব নয়। এসব কারণে অভিবাসীরা বেশ সমস্যার মধ্যে পড়েছেন, বিশেষত দক্ষ ভারতীয় কর্মীরা এখন বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি। গ্রিনকার্ডধারীরা অতীতে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেতেন, তাতেও বিভিন্ন বাধানিষেধ আরোপ করা হয়েছে। একজন সাধারণ অভিবাসী এম্বাসিতে যেসব কাগজপত্র ও স্বীকারোক্তি দেন, এখন একজন গ্রিনকার্ডধারীকেও একই শর্ত পালন করতে হচ্ছে; এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা জামানতও দিতে বাধ্য থাকবেন।
এসব ছাড়াও ইতোমধ্যে ট্রাম্প কয়েকটি দেশ থেকে অভিবাসন বন্ধ করার জন্য ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চলমান বিতর্কের উদ্দেশ্যও সে রকম, যাতে অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে যেতে নিরুৎসাহিত হন। ভিসা বন্ডের উদ্দেশ্য অভিবাসন বন্ধের পূর্ব পদক্ষেপ। বলে রাখা দরকার, নতুন নিয়ম অনুযায়ী ভিসাপ্রত্যাশীদের সবাইকে নিজ দেশের মার্কিন দূতাবাসে সশরীর সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে হবে। এ ছাড়া তাদের গত কয়েক বছরের সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টের ইতিহাস এবং নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের আগের ভ্রমণ ও বসবাসের বিস্তারিত তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাই। নির্বাচনী প্রচারণাকালে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি রেমিট্যান্সের ওপর ট্যাক্স আরোপ করবেন। ক্ষমতায় বসার পর তিনি এ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করেছেন। এটা ছিল তাঁর অর্থনৈতিক হিসাব। যদিও অভিবাসন নীতিও তার বাইরে নয়, তবে এর সঙ্গে বহু কিছু যুক্ত।
ভিসা বন্ডের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ কয়েকটা দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়ীরা হয়তো ১৫ হাজার ডলার জামানত একভাবে ব্যবস্থা করতে পারবেন, কিন্তু যারা সাধারণ নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে যাদের পরিবার-পরিজন থাকেন, তাদের জন্য দেখা করতে যাওয়াটা বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ১০ লাখের মতো বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। বলা যায়, ভিসা বন্ডের মধ্য দিয়ে এই ১০ লাখ মানুষের জন্য বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলো। যারা শুধু পর্যটক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, তাদের জন্যও এটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে।
যুক্তরাষ্ট্রে গমনকারী অধিকাংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত, তাদের অবস্থান থেকে এই ১৫-১৮ হাজার ডলার বিশাল অঙ্ক। তা ছাড়া সেখানে যাতায়াত, বসবাস ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। ট্রাম্প সেসব দেশের ওপর পদক্ষেপগুলো নিচ্ছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভাতা গ্রহণ করছে। বাংলাদেশ থেকে যারা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে সরকারি ভাতা গ্রহণ করছেন, তাদের জন্য ভিসা বন্ডের সিদ্ধান্ত বড় একটি অর্থনৈতিক চাপ। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর এ সিদ্ধান্তে বড় রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। অন্তত জামানত কমিয়ে আনার জন্য ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে আলাপ করতে পারে। কয়েক হাজার ডলার কমিয়ে আনলেও মধ্যবিত্তের জন্য এটি বড় একটি ছাড় হবে। তা ছাড়া এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্নমুখী চুক্তি রয়েছে। সেটিও কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি শুল্ক নিয়েও আমাদের নতুন চুক্তি হয়েছে, সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে মতবিনিময় কাজে দেবে বলে মনে করি। অন্তত ভিসা বন্ড পুরোপুরি তুলে না দিলেও যেন কমিয়ে আনে। এ ক্ষেত্রে যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন, সেটি যদি আমরা তুলে ধরতে পারি তাহলে আমাদের দেনদরবারে সুবিধা হবে।
এম হুমায়ুন কবির: যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত