ভারত-ইইউ চুক্তি : ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নতুন চাপে
আহমেদ সোহেল বাপ্পী [সূত্র : সমকাল, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

বিশ্ববাণিজ্য যখন ক্রমেই অনিশ্চয়তা, সংরক্ষণমূলক নীতি ও শুল্কযুদ্ধের কবলে, তখন ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রায় দুই দশক ঝুলে থাকা এ চুক্তিতে ইইউ ভারতীয় পণ্যের ৯৯.৫ শতাংশে এবং ভারত ইইউর প্রায় ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার শক্তির ভারসাম্যেও একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে।
এ চুক্তি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কনীতি ও চলমান বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার প্রতিফলন। ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত ভারতকে বিকল্প বাজার ও অংশীদার খুঁজতে বাধ্য করেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বাণিজ্য কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়েছে। এই বাস্তবতা থেকেই ভারত-ইইউ চুক্তি মূলত একটি কৌশলগত ও ভূ-অর্থনৈতিক সমঝোতায় রূপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এ চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকেন্দ্রিক ছিল। ভারত-ইইউ চুক্তি সেই কাঠামোতে একটি কার্যকর তৃতীয় মেরু গড়ে তুলতে পারে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, আগামী দশকের শুরুতেই ইইউ থেকে ভারতে রপ্তানি দ্বিগুণ হবে এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বছরে বিপুল পরিমাণ শুল্ক সাশ্রয় করতে পারবে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন জোট, নতুন বিন্যাস এবং নতুন প্রতিযোগিতার বাস্তবতা তৈরি হবে।
এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য স্বার্থ চাপের মুখে পড়বে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। ইতোমধ্যে ভারত-ইইউ বাণিজ্যের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়লে এবং ভারতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ জোরদার হলে, যুক্তরাষ্ট্র উভয় বাজারেই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাতে পারে। এটি সরাসরি কোনো শুল্কযুদ্ধ না হলেও, বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রভাবের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
এ চুক্তির উদ্যোগে নেতৃত্বের প্রশ্নে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সক্রিয়তা স্পষ্ট। ইউরোপীয় কমিশনের মতে, এটি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়; বরং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি। ভারতের পক্ষ থেকেও এ চুক্তি অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যের কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এটি উভয় পক্ষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সমন্বয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
লাভ-ক্ষতির ভারসাম্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বল্প মেয়াদে ইউরোপীয় শিল্পগোষ্ঠীই তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হবে। অটোমোবাইল, মেশিনারি, কেমিক্যাল ও স্টিল খাতের ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে আগে থেকে সুরক্ষিত বাজারে প্রবেশের ঐতিহাসিক সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত দীর্ঘ মেয়াদে প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কাঠামোগত সুবিধা অর্জনের পথে এগোচ্ছে।
এ চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ার তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রেখেছে মূলত এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে পাওয়া বিশেষ সুবিধার কারণে। ‘এভরিথিং বাট আর্মস-ইবিএ’ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশ প্রায় শতভাগ শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করছে, যা ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশের মূল শক্তি।
এ সুবিধা স্থায়ী নয়। ২০২৬ সালের পর এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এই শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে এবং তখন জিএসপি প্লাস বা নতুন কোনো বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে। ঠিক এ সন্ধিক্ষণেই ভারত-ইইউ নতুন চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। কারণ এ চুক্তির আওতায় ইইউ ভারতীয় টেক্সটাইল, তৈরি পোশাকসহ প্রায় সব পণ্যে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনবে–যে সুবিধা এতদিন বাংলাদেশের জন্য ছিল।
ভারতের এই নতুন সুবিধা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে একাধিক কারণে। প্রথমত, ইউরোপীয় বাজারে ভারত ও বাংলাদেশের পোশাকপণ্য সরাসরি পরস্পরের প্রতিযোগী। বেসিক গার্মেন্ট, নিটওয়্যার ও তুলাভিত্তিক পোশাকে ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে দামের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সুবিধায় ক্ষয় ধরতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভারতের রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত টেক্সটাইল ভ্যালু চেইন–কাঁচা তুলা থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক পর্যন্ত; যার ফলে উৎপাদন ব্যয়, লিড টাইম ও অর্ডার ব্যবস্থাপনায় তারা দ্রুত সুবিধা নিতে পারবে।
তৃতীয়ত, পরিবেশ ও কার্বন নীতির দিক থেকেও ভারতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের সবুজ রূপান্তরে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে ভারতীয় পোশাকশিল্পকে ইউরোপের কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে এগিয়ে রাখবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যদি সবুজ উৎপাদন, কার্বন কমপ্লায়েন্স ও প্রযুক্তি আধুনিকায়নে গতি না আসে, তবে ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বাস্তব।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে এলডিসি-উত্তর সময়ে। তখন একদিকে বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা কমবে, অন্যদিকে ভারত আইনি ও স্থায়ী ভিত্তিতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করবে। ফলে ইউরোপীয় ক্রেতাদের অর্ডার স্থানান্তর, মূল্যচাপ বৃদ্ধি এবং দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শক্তি রয়েছে–বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, অভিজ্ঞ শ্রমশক্তি, নিটওয়্যারে বিশেষ দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের ক্রেতা সম্পর্ক। যদিও এসব শক্তিকে কার্যকর রাখতে হলে এখনই কৌশলগত পরিবর্তন জরুরি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে জিএসপি প্লাস বা সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, উচ্চমূল্য সংযোজিত ও ফ্যাশনভিত্তিক পোশাকে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
সবশেষে বলা যায়, ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একদিকে সতর্কবার্তা, অন্যদিকে সময়োপযোগী সংস্কার ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ। এ সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্জিত অবস্থান ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
আহমেদ সোহেল বাপ্পী: গবেষক ও বিশ্লেষক