তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন ও কিছু কথা
আবদুল লতিফ মাসুম [প্রকাশ : যুগান্তর, ২৭ নভেম্বর ২০২৫]

সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। বিশ্বব্যাপী সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় সরকার এমনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেন তা যে কোনো মানদণ্ডে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, তথা নির্বাচনপরম্পরা প্রমাণ করে, মধ্যবর্তী সরকারটি দলীয় আচরণদুষ্ট হয়।
এভাবে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে বৈশিষ্ট্য, তা লঙ্ঘিত হয়। নব্বইয়ের দশকে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলগুলো দাবি তোলে যে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন হলে ভোট জালিয়াতি ও প্রভাব খাটানোর ঝুঁকি থাকে। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৯০-১৯৯৬ সময়কালে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে।
১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ সংসদে ১৩তম সংশোধনী পাশ হয়, যেখানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিরোধীদলগুলো আবারও এ ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করেছে। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রায় ঘোষণা করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে চৌদ্দ বছর আগে আদালতের রায়ে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবারও ফিরে এলো। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে গত ২০ নভেম্বর রায় দিলেন সর্বোচ্চ আদালত।
এর আগে ১১ নভেম্বর শুনানি শেষ করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই ফেরানোর দাবি জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আবারও সর্বোচ্চ আদালতে ওঠে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি। এ বছরের ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা আবেদন মঞ্জুর করে আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়। ২১ অক্টোবর থেকে শুরু হয় আপিলের শুনানি।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করলেও এখনই তা কার্যকর হচ্ছে না। এজন্য জনগণকে অন্তত ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচনটি হওয়ার কথা, সেটি হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই। নতুন গঠিত সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হবে। ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত ৫৮-খ(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর বা মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে যে তারিখে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কার্যভার গ্রহণ করেন, সেই তারিখ থেকে সংসদ গঠিত হওয়ার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তার পদের কার্যভার গ্রহণ করার তারিখ পর্যন্ত মেয়াদে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, উপদেষ্টা নিয়োগ ইত্যাদি সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ৫৮-গ(২)-এ বলা হয়েছিল, সংসদ ভেঙে দেওয়ার বা ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা বা অন্য উপদেষ্টারা নিযুক্ত হবেন। কিন্তু এখন সে সুযোগ নেই। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর গণ-অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এটি পরবর্তীকালে সুপ্রিমকোর্টের অনুমোদন লাভ করে। এত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর বাস্তব কারণেই সংবিধানে সংযোজিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রত্যাবর্তন সচেতন নাগরিক সাধারণকে স্বস্তি দিয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল এ প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে। বিএনপি বলেছে, এর মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার পুনরুত্থান রোধ করা যাবে। এনসিপি সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে যুগান্তকারী বলেছে। অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপকে গণতন্ত্রের কবর ও এর পুনর্জীবনকে গণতন্ত্রের মহাসড়কে প্রত্যাবর্তন বলে অভিহিত করেছেন। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকৃতপক্ষে এ পুনঃসংযোজন বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক উন্নয়নকে কতটা ত্বরান্বিত করবে তা একটি বিবেচ্য বিষয়। অন্য ভাষায় বলা যায়, প্রকৃত গণতন্ত্রের বাস্তবায়ন সংবিধানের ওপর নির্ভর করে না। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক আচার-আচরণের ওপর তা নির্ভরশীল। অতীত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আমরা চারটা ভালো নির্বাচন পেয়েছি।
দেশে নির্বাচনে যারা পরাজিত হয়েছেন, তারা তা মেনে নেননি। সূক্ষ্ম অথবা স্থূল কারচুপি বলে অভিহিত করেছেন। কোনো জাতীয় সংসদেই বিরোধী দল পুরো সময় থাকেনি। আর সরকারি দলও সেই পুরোনো কথা, Winner takes all স্ট্র্যাটেজিতে বিশ্বাস করেছে। সরকারবিরোধী দলকে কখনোই আস্থায় নেয়নি। সবকিছু পরিচালিত হয়েছে স্বেচ্ছাচারী কায়দায়। বিশেষ করে বিগত ১৭ বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বাতিল করে নিজ দলের বিজয়কে ছলেবলে কলে কৌশলে নিশ্চিত করেছে আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একটি স্বল্পকালীন আয়োজন। আর রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা দীর্ঘদিনের বিষয়। প্রতি ৫ বছর অন্তর সংবিধান মোতাবেক আমাদের সরকার পরিবর্তনের ব্যবস্থা রয়েছে। গণতন্ত্র যদি তারা দেশ পরিচালনার নীতি হিসাবে গ্রহণ না করে তবে ইউনূস সাহেবের অন্তর্বর্তী সরকার বা পরবর্তী ৩ মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে গণতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সেই সঙ্গে একটি জীবনব্যবস্থা (A way of life)। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি তাদের কথাবার্তা, চালচলন ও রীতিনীতিতে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল না হয়, তাহলে পরে গণতন্ত্রের চর্চা সুদূরপরাহতই থেকে যাবে। সহনশীলতা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা গণতন্ত্রের তাৎপর্যপূর্ণ গুণাবলি। এটি জোর করে কাউকে শেখানো যায় না। এটি হচ্ছে সহজাত বিষয়। প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চার অভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটেনি। ১৯৭৩ সালে ২৯৩টি আসনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। তারা মনেপ্রাণে গণতান্ত্রিক ছিল না। ৩ বছরের মাথায় ‘এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ ঘোষিত হয়। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে সরকারের পতন ঘটে। ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে এরশাদের কৃত্রিম নির্বাচনের সংসদকে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদায় নিতে হয়। সে তুলনায় ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে গঠিত সংসদ দুটি ছিল ভারসাম্যমূলক এবং সীমিত পরিসরে হলেও তা কার্যকর ছিল।
এ রায়ের পর এ প্রশ্ন সামনে এসেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি ত্রয়োদশ সংশোধনীর মতো করে হবে? নাকি জুলাই সনদে যেভাবে আছে, সেভাবে গঠিত হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান কে হবেন, তাও একটি আলোচ্য বিষয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি যেহেতু ফিরে এসেছে, এখন তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ত্রুটিগুলো দূর করে আরও আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে। সুপ্রিমকোর্টের রায়ে বলা হয়, এরূপ পুনরুজ্জীবন পরিচ্ছেদ ২-এর ক-এ উল্লিখিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধানাবলির স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল নিশ্চিত হবে। তবে পুনরুজ্জীবিত অনুচ্ছেদ ৫৮-খ(১) এবং অনুচ্ছেদ ৫৮-গ(২)-এর বিধানের প্রয়োগ সাপেক্ষে তা কার্যকর হবে। পুনর্বহাল ও পুনরুজ্জীবিত ‘পরিচ্ছেদ ২ক’-এ উল্লিখিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধানাবলি কেবল ভবিষ্যৎ প্রয়োগ যোগ্যতার ভিত্তিতে কার্যকর হবে। এসব কথার সরল অর্থ হচ্ছে এই যে, ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদ বা সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীন এখতিয়ার রাখে। উল্লেখ্য, বিগত ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংযুক্ত হয়।
সেখানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত ৫৮-খ(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর বা মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে যে তারিখে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কার্যভার গ্রহণ করবেন, সেই তারিখ থেকে সংসদ গঠিত হওয়ার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তার পদের কার্যভার গ্রহণ করার তারিখ পর্যন্ত মেয়াদে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, উপদেষ্টা নিয়োগ ইত্যাদি সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ৫৮-গ(২)-এ বলা হয়েছিল, সংসদ ভেঙে দেওয়ার বা ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্য উপদেষ্টারা নিযুক্ত হবেন। আর প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধানে বলা হয়েছিল, সর্বশেষ বিদায়ি প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা কি হুবহু আগের কাঠামোতে থাকবে, নাকি নতুন কাঠামো তৈরি হবে? এর উত্তরে বলা যায়, এ রায়ে আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হলো। এটি কার্যকর হবে পরবর্তী সংসদ ভাঙার পরের ১৫ দিনের মধ্যে। এ বিষয়ে গঠিত সাংবিধানিক পরিষদ তথা জাতীয় সংসদের ভূমিকা থাকবে। ইচ্ছা করলে তারা অদল-বদল করতে পারবেন। তবে জুলাই সনদে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, তা আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থেকে ভিন্নতর। এর গঠনপ্রকৃতি ব্যাখ্যা করলে তা দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলে প্রতীয়মান হতে পারে। সরকারপ্রধান, বিরোধীদলীয় নেতা, উপনেতা ও স্পিকার সমন্বয়ে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো দেওয়া হয়েছে, তা জটিল ও কঠিন। জুলাই সনদ ৪টি বিকল্প নিয়ে গণভোটে পাঠানো হচ্ছে।
এগুলো গণভোটে পাশ হলে এবং নতুন সংসদের সংবিধান সংস্কার সভায় গৃহীত হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। এটা নির্ভর করবে জুলাই সনদ গণভোটে পাশ করার ওপর এবং সংবিধান সভা তা গ্রহণ করবে কি না তার ওপর। অন্তর্বর্তী সরকার বলছে জুলাই সনদে যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা দেওয়া আছে, সে মোতাবেকই হবে। কিন্তু বিএনপি ত্রয়োদশ সংশোধনীতেই ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব হলে সেটা হবে খুবই সহজ ও সরল উপায়। তার কারণ এটি ইতোমধ্যে অনুশীলন হয়েছে। লোকজন ব্যবস্থাটি সম্পর্কে অবহিত আছে।
নেতিবাচক ব্যাখ্যা করে অনেকে বিচারকদের সংশ্লিষ্টতা এড়াতে চাচ্ছে। আবার কেউবা ১/১১-এর অবস্থা তৈরির জন্য তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থাকে দুষছে। আসলে দুটি অভিযোগই অবাস্তব। বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একজন নির্দলীয় নির্ভরযোগ্য ও সবার সমর্থনযোগ্য ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সেক্ষেত্রে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে যে সাবেক প্রধান বিচারপতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেটাই যৌক্তিক। যদিও খায়রুল হকের মতো অবিবেচকরা বিচার বিভাগের দোহাই দিয়ে অন্যকিছু করতে চেয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। এর কারণ, বিচারব্যবস্থা তো রয়েছে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগই হচ্ছে নির্ভরতার সর্বশেষ আশ্রয়। সুতরাং জটিল ও কুটিল রাজনৈতিক উপায় অনুসন্ধান না করে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে স্থিত থাকলে অনেক জটিলতা ও কুটিলতা পরিহার করা যায়।
নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের অস্থির, অনির্ভরযোগ্য ও দ্বৈধতা আক্রান্ত রাজনৈতিকব্যবস্থাকে অনেকটা আস্থা, বিশ্বাস ও স্থিতিশীলতা দেবে। রাজনৈতিক উন্নয়নের অর্থ হলো-একটি রাষ্ট্র বা সমাজে রাজনৈতিকব্যবস্থার সংগঠন, কার্যকারিতা, স্থিতিশীলতা, নাগরিক অধিকার ও অংশগ্রহণের উন্নয়ন। একটি দেশে সুশাসন, দায়বদ্ধ সরকার, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, নাগরিকের অধিকার, আইনের শাসন, স্বচ্ছ নির্বাচন, এবং মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যত বৃদ্ধি পায়, সেই দেশ রাজনৈতিকভাবে তত উন্নত বলে গণ্য হয়। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিষ্ঠা ও অব্যাহত প্রয়োগ রাজনৈতিক উন্নয়নের কথিত শর্তগুলো পূরণ করবে। সুতরাং আশা করা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত করবে।
আবদুল লতিফ মাসুম : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক