কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক

বাংলাদেশের সংযুক্তি অনিশ্চয়তার মুখে নিজস্ব প্রতিবেদক [প্রকাশ: বণিকবার্তা, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫]

ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক

মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা এবং সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক টানাপড়েন—এ বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের সংযুক্তি এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যদিও গত দেড় দশকে এ বহুপক্ষীয় নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে রেল অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে রেল অবকাঠামোয় করা বিপুল বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্যিক সুফল আদৌ পাওয়া যাবে কিনা—তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভারতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ট্রানজিট ও করিডোর-নির্ভরতার বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন বাড়লে শুধু বাংলাদেশের সংযুক্তিই নয়, বরং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের পুরো কাঠামোই কার্যকর বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তায় পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 
 
 
 
 
 
 
 
 

অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে কূটনৈতিক টানাপড়েন চলছে, তা রেল সংযোগভিত্তিক ট্রানজিট ও করিডোর পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের বড় অংশই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে বাংলাদেশ হয়ে বিকল্প রুট, সীমান্ত পারাপার, ট্রানজিট সুবিধা এবং বন্দর ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সম্পর্কের টানাপড়েন বাড়লে এসব সমন্বয় ও ছাড়ের জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তখন উত্তর-পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ ও উপ-অঞ্চলীয় বাজারকে যুক্ত করে যে রেল-করিডোর গড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাস্তবে থমকে যাওয়া বা কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

 

 

এশিয়ার দেশগুলোর বর্তমান কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক আন্তঃসম্পর্কের বাস্তবতায় ট্রান্স-এশিয়ান রেল নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিনিয়োগের বিষয় যেমন আছে, তেমনি এখানে ভূরাজনৈতিক বিষয়ও জড়িত। এক্ষেত্রে স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো না থাকে, তাহলে তো এ প্রকল্প কার্যকর হবে না। বর্তমানে আমরা সে রকম একটা অবস্থার মধ্যে আছি। কারণ এশিয়ার কয়েকটা দেশের আন্তঃসম্পর্কে রাজনৈতিক টানাপড়েন চলছে, বাংলাদেশও সেখানে আছে। এ কারণে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। কোনো প্রকল্পে একাধিক দেশ জড়িত থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্কে উন্নতি না থাকলে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’

 

 

বাংলাদেশের রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের তিনটি রুটে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরো একটি নতুন রুট প্রস্তাবিত অবস্থায় আছে। এর মধ্যে রুট-১ ভারতের গেদে থেকে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। এরপর ঈশ্বরদী-যমুনা সেতু-জয়দেবপুর হয়ে টঙ্গী পর্যন্ত আসবে। সেখান থেকে আখাউড়া-চট্টগ্রাম-দোহাজারী-রামু হয়ে গুনধুম সীমান্ত দিয়ে চলে যাবে মিয়ানমারে। রুট-১-এর আরেকটি সাবরুট আখাউড়া থেকে কুলাউড়ার শাহবাজপুর হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। দ্বিতীয় রুটটির শুরু ভারতের সিঙ্গাবাদ থেকে। সেখান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। রাজশাহী-আব্দুলপুর-ঈশ্বরদী হয়ে সেটি মিশেছে রুট-১-এর সঙ্গে। রুট-৩-এর শুরুটাও ভারতের রাধিকাপুরে। এ রুট বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে দিনাজপুরের বিরল সীমান্ত দিয়ে। সেখান থেকে পার্বতীপুর-আব্দুলপুর-ঈশ্বরদী হয়ে রুট-১-এর সঙ্গে গিয়ে মিলেছে।

 

 

 

এ তিনটি রুটের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে আরো একটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে রুট প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত রুটটির শুরু ভারতের পেট্রাপোলে। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর যশোর-ভাঙ্গা-মাওয়া-ঢাকা-টঙ্গী হয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় রুটের মতোই রুট-১-এর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়েছে। ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের চার রুটের প্রতিটিই কক্সবাজারের রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তের গুনধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার অংশের ওপর দিয়ে গেছে। যদিও এ অংশে এখন পর্যন্ত কোনো রেলপথই নির্মিত হয়নি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের মাধ্যমে রামু থেকে গুনধুম পর্যন্ত একটি রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েও বাংলাদেশ পরে সরে আসে। মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি এবং সম্ভাব্য রেলপথে থাকা রোহিঙ্গা শিবির প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন রেলের কর্মকর্তারা।

 

 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা ঠিক, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপড়েনসহ সার্বিকভাবে ভূরাজনৈতিক যে বাস্তবতা, সেখানে বাংলাদেশের ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি কিছুটা গতি হারাবে বা গতি কমবে। এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে যেহেতু অনেকগুলো দেশ যুক্ত, সেহেতু এখন পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন দেশগুলো এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং সেটাই স্বাভাবিক।’

 

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক কোনো একক দেশের প্রকল্প নয়, এটি বহুপক্ষীয় কাঠামোয় গড়ে ওঠা নীতিনির্ধারণী ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি সংযোগ ধারণা। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় এ উদ্যোগের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। একদিকে চীনের নেতৃত্বে পৃথক করিডোর ও কানেক্টিভিটি নেটওয়ার্ক দ্রুত এগোচ্ছে, অন্যদিকে ঐতিহ্যগত বহুপক্ষীয় উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন ও আস্থার ঘাটতিতে পড়ছে। ফলে প্রকল্পটি সরাসরি বিরোধিতার মুখে না পড়লেও কার্যকর বাস্তবায়নের গতি কমেছে এবং প্রাসঙ্গিকতা হ্রাস পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রেল করিডোরটি প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবায়নযোগ্য ও বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রাজনৈতিক। বিশেষ করে আঞ্চলিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট।

 

 

জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌এ উদ্যোগ অনেকটাই থমকে আছে বলা যায়। তবে এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ চাহিদা ও প্রত্যাশার কথা বিবেচনা করলে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের প্রয়োজন ছিল এবং এখনো আছে। অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে যোগাযোগ অপরিহার্য—আর সেই যোগাযোগ শুধু দেশের ভেতরে সীমিত থাকলে চলবে না।’

 

 

তিনি আরো বলেন, ‘‌বর্তমানে যে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে কারো জন্যই ভালো হবে না। এটিই এক অর্থে আশার জায়গা—কারণ যোগাযোগ ছাড়া দেশগুলো যে উন্নয়নের লক্ষ্য ধরেছে তা সফল করা কঠিন। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। আপাতদৃষ্টিতে চ্যালেঞ্জ থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনই উদ্যোগটিকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

 

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারত। কারণ ভৌগোলিক কারণে দিল্লিকে বাদ দিয়ে কোনো ধারাবাহিক স্থল করিডোর সম্ভব নয়। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান—সব রেল সংযোগ শেষ পর্যন্ত ভারতের ট্র্যাকের ওপর নির্ভরশীল। কাগজের মানচিত্রে পশ্চিমমুখী রুট ধরা হয় বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকে গেদে-কলকাতা-দিল্লি-আততারি হয়ে পাকিস্তানের ওয়াঘা পেরিয়ে ইরান ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত। পূর্বমুখী সংযোগে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে ‘ল্যান্ডব্রিজ’ ধারণা রাখা হয়, আর উত্তরে আফগানিস্তানকে গেটওয়ে ধরে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে আফগানিস্তানের ধারাবাহিক রেল করিডোর এখনো বাস্তব হয়নি।

 

 

কিন্তু বাস্তবে এ মানচিত্রের প্রায় প্রতিটি দেশেই রাজনৈতিক টানাপড়েন চলছে। সবচেয়ে স্পষ্ট সংকটটি ভারত-পাকিস্তান অক্ষে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে ঢাকা-দিল্লি-লাহোর-তেহরান-ইস্তানবুল করিডোরে অবকাঠামোগত ঘাটতি প্রায় নেই বললেই চলে। ট্র্যাক আছে, গেজ পরিবর্তনের জায়গা চিহ্নিত, পরীক্ষামূলকভাবে দীর্ঘ রুটে পণ্যবাহী ট্রেনও চলেছে। তবুও এ করিডোর কার্যকর নয়। কারণ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার ফলে রেল সংযোগ বিষয়টি এখন আর শুধু বাণিজ্য বা ট্রানজিট ইস্যু নয়; এটি সরাসরি নিরাপত্তা ও কৌশলগত হিসাবনিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ, কাশ্মীর ইস্যু, সীমান্তে সংঘর্ষ, কূটনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে এ অংশে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক ভিশন কার্যত অসম্ভব বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

 

ভারত-মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে স্থল সংযোগের যে পরিকল্পনা ছিল, তাও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে স্থবির। গৃহযুদ্ধ, সামরিক জান্তা ও বিদ্রোহী শক্তির সংঘর্ষ, সীমান্তে নিরাপত্তাহীনতা—এসবের ফলে মিয়ানমার এখন কার্যকর ল্যান্ডব্রিজ নয়, বরং ভূরাজনীতিক বাফার জোন। নেপাল ও ভুটানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো সূক্ষ্ম। ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এ দেশ দুটি সিদ্ধান্ত নেয় ধীরগতিতে। এছাড়া ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কার্যত একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার অনেক দেশ দ্রুত অর্থায়ন, দৃশ্যমান অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক সমর্থনের আশায় চীনা করিডোরের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে দীর্ঘ আলোচনাভিত্তিক, সম্মতিনির্ভর ট্রান্স-এশিয়ান রেল নেটওয়ার্ক উদ্যোগের গুরুত্ব তাদের কাছে অনেকাংশেই কমে গেছে।