কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ট্রাম্পের শুল্কনীতি সত্ত্বেও কেন ভেঙে পড়েনি মার্কিন অর্থনীতি?

জেফ্রি ফ্রাংকেল [প্রকাশ: বণিকবার্তা, ৩ জানুয়ারি ২০২৬]

ট্রাম্পের শুল্কনীতি সত্ত্বেও কেন ভেঙে পড়েনি মার্কিন অর্থনীতি?

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই তার সম্ভাব্য শুল্কনীতির পরিণাম নিয়ে আশঙ্কায় ভুগতে থাকেন অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ। ধারণা করা হয়েছিল, নতুন শুল্ক আরোপের ফলে ভোগ্যপণ্য ও উৎপাদন উপকরণের দাম বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে ও জনসাধারণের প্রকৃত আয় কমে যাবে। সরবরাহ ব্যবস্থায় যে অভিঘাত তৈরি হবে, তা মোকাবেলায় খুব বেশি কিছু করতে পারবে না মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)।

 

 

 

পরে আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন এবং মুক্তবাণিজ্যের প্রতি রিপাবলিকান পার্টির দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারকে ভেঙে দিয়ে শুল্কহারকে ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়ে তোলেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের ২০২৫ সালের শুল্কনীতি তীব্রতা ও অর্থনীতিতে বিঘ্ন সৃষ্টির দিক থেকে তার প্রথম মেয়াদের শুল্ক ব্যবস্থাকেও বহুদূর ছাড়িয়ে যায়। এমনকি ১৯৩০ সালের কুখ্যাত স্মুট হলি আইনের চেয়েও তা ছিল বেশি কঠোর। ইয়েল বাজেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ওপর গড় শুল্কহার ২ থেকে বেড়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিগত শতকের ত্রিশের দশকের পর সর্বোচ্চ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাখ্যাহীন নীতিগত পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা। ফলে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও প্রকৃত আয়ের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়া প্রায় অবশ্যম্ভাবী বলেই মনে হচ্ছিল।

 

 

কিন্তু যেভাবে আশঙ্কা করা হচ্ছিল বাস্তবে পরিস্থিতি তেমনটা হয়নি। এমনও হতে পারে যে মূল্যস্ফীতি আদৌ বাড়েনি। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত টানা ১২ মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের শেষ দিকের হারেরই সমান। (যদিও ট্রাম্পের দাবির বিপরীতে সামগ্রিক মূল্যস্তর বেড়েছে, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই।) বেকারত্বের হারও বেড়েছে খুব সামান্য। ২০২৪ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের নভেম্বরে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে। প্রাথমিকভাবে বিগত বছরের শেষভাগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের শাটডাউনের কারণে তথ্য সংগ্রহ বিলম্বিত হওয়ায় প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

 

 

 

সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্পের প্রথম বছরে যে মাত্রায় অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা পূর্বাভাসের তুলনায় অনেকটাই কম হয়েছে। অন্তত এটুকু বলা যায়, ক্ষতির মাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে কমই ছিল। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের শুল্কনীতির সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলো সীমিত বা বাস্তবায়নে বিলম্বিত হওয়ার পেছনে চারটি প্রধান কারণ কাজ করেছে।

 

 

প্রথমত, ১ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সরকারি শাটডাউনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অস্বাভাবিকভাবে পরিমাপজনিত সমস্যার মুখে পড়েছে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে অক্টোবরে শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকস) স্বাভাবিক নিয়মে তথ্য সংগ্রহ করতে না পারায় মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত কিছু তথ্য ঘাটতি রয়েছে। এমনকি নভেম্বরেও আবাসন ব্যয়ের মূল্যস্ফীতি শূন্য ছিল, যা সরকারি প্রতিবেদনের ওপর সন্দেহ সৃষ্টি করে।

 

 

যদি বাস্তবে আবাসন ব্যয়ের মূল্যস্ফীতি শূন্য না হয়ে থাকে, তবে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হিসাব নিম্নমুখীভাবে বিকৃত হয়েছে বলেই ধরে নিতে হয়। আবার ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালিসিসের জিডিপির তথ্য প্রকাশও নির্ধারিত সময়সূচি থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকের জিডিপি তথ্য প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়েছে।

 

 

দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের শুল্কনীতির ফলে প্রত্যাশার তুলনায় কম ক্ষতি দেখা যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো সবচেয়ে উচ্চ হারের অনেক শুল্ক এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ট্রাম্প একাধিকবার কিছু শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন। আবার কিছু শুল্ক তিনি ১৪ নভেম্বর প্রত্যাহারও করে নেন। কারণ সেগুলোর প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছিল। পাশাপাশি ট্রাম্প কয়েকটি দেশের জন্য বড় ধরনের শুল্ক ছাড়ের ব্যবস্থাও করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উত্তর আমেরিকার সমন্বিত অটোমোবাইল শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো, যদি তিনি ৬ মার্চ মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানীকৃত পণ্যকে ২৫ শতাংশ শুল্কের আওতার বাইরে না রাখতেন। এ শুল্ক দুইদিন আগেই কার্যকর হয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তির আওতায় আমদানি হওয়া এসব দেশের পণ্যের ওপর আর কোনো শুল্ক জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে না।

 

 

 

এ ধরনের শিথিলতা আসলে আগেই অনুমান করা গিয়েছিল। ট্রাম্প যদি ঘোষিত বা হুমকি অনুযায়ী সব শুল্ক পুরোপুরি কার্যকর করতেন, তাহলে মার্কিন ব্যবসা-বাণিজ্য খাত ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ত। ফলে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপগুলোর ক্ষেত্রে তার শেষ পর্যন্ত অনড় থাকার সম্ভাবনা বরাবরই কম ছিল। ট্রাম্প প্রায়ই আলোচনার শুরুতে চরম অবস্থান নেন, কিন্তু চাপ বাড়লে সেখান থেকে সরে আসেন—অন্য পক্ষের কাছ থেকে নিজের দাবি পূরণ না হলেও। বাস্তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘‌ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পিছু হটেন’—এ ধারণা, যা ‘ট্যাকো’ নামে পরিচিত, এক ধরনের বিদ্রূপে পরিণত হয়েছে। তবে কেউ যখন চরম পরিণতির হুমকি দেন, তখন তাকে সেই পথে এগিয়ে যেতে উসকানি দেয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্প যেসব শুল্ক বাস্তবে কার্যকর করেছেন, সেগুলো এখনো যথেষ্ট উচ্চ পর্যায়েরই রয়ে গেছে। এর অর্থ এই নয় যে অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস পুরোপুরি ভুল ছিল। বরং মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে ট্রাম্পের শুল্কনীতির অনেক নেতিবাচক প্রভাব কেবল বিলম্বিত হয়েছে, বিলুপ্ত হয়নি। এসব বিরূপ প্রভাব ২০২৬ সালে গিয়ে আরো স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাবে—এমনটাই আমাদের ধরে নেয়া উচিত।

 

 

 

তৃতীয় দিকটি এভাবে বোঝা যায়—২০২৪ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিগুলো আমদানি ত্বরান্বিত করতে শুরু করে। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড থেকে স্বর্ণ এবং আয়ারল্যান্ড থেকে ওজন কমানোর ওষুধের আমদানি ও মজুদ বাড়িয়ে তোলা হয়, যাতে সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের আগে পর্যাপ্ত মালামাল সংগ্রহ করা যায়। পেন হোয়ার্টন বাজেট মডেলের হিসাব অনুযায়ী, কৌশলটি গত বছরের মে মাস পর্যন্ত মার্কিন আমদানিকারকদের প্রায় ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করেছে, যা নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় মোট খরচের ১৩ দশমিক ১ শতাংশের সমান।

 

 

শুল্ক কার্যকর হওয়ার পরও বেশির ভাগ খুচরা বিক্রেতা পণ্যের দাম বাড়াননি। কারণ তারা তাদের শুল্ক আরোপের আগে জমাকৃত স্টক শেষ করেননি। খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে এটি একটি সাধারণ প্রথা। যদিও কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলবেন, এটি সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার নীতির পরিপন্থী। এমনকি বর্তমানেও অনেক আমদানিকারক তাদের অতিরিক্ত ব্যয় গ্রাহকের কাছ থেকে পুরোপুরি আদায় করতে পারছেন না।

 

 

বাস্তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমদানিকারকরা তাদের শুল্কের আগে জমাকৃত স্টক শেষ করার পরে ব্যয় বাড়িয়েছে। বড় মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের রিয়েল টাইম তথ্য ব্যবহার করে আলবার্তো কাভাল্লো ও তার সহলেখকরা দেখিয়েছেন যে নতুন শুল্কের আওতায় থাকা পণ্যগুলোর দাম গত বছরের এপ্রিল থেকে বেড়েছে, হোক সেটি আমদানীকৃত বা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করা বিকল্প। খুচরা পর্যায়ে এ বৃদ্ধির হার প্রায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সার্বিক সিপিআই বাস্কেটে মূল্যস্ফীতির হার বাড়িয়েছে দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়েছে। তবে বর্তমান শুল্ক স্তরে এটি সম্ভাব্য অতিরিক্ত খরচের ক্ষুদ্রাংশ মাত্র।

 

 

এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে আমদানিকারকরা যে দাম দিচ্ছেন তা শুল্কের সঙ্গে আনুপাতিক হারে বেড়েছে। বিষয়টি ট্রাম্পের এমন দাবির সঙ্গে মেলে না যে বিদেশী রফতানিকারকরা শুল্কের অভিঘাত কমাতে নিজেদের পণ্যের দাম কমাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে খরচ সমন্বয় করছে মার্কিন কোম্পানিগুলো, যেমনটি তারা সাধারণত ডলারের অবমূল্যায়নের সময় করে থাকে। এর একটি কারণ হলো, তারা জানে না এ শুল্ক কতদিন চলবে। ট্রাম্প হয়তো মন পরিবর্তন করবেন অথবা সুপ্রিম কোর্ট আইন মেনে শুল্ক বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ অনিশ্চয়তাই ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কোম্পানিকে এখন পর্যন্ত কর্মী ছাঁটাই থেকে বিরত রাখছে।

 

 

কিন্তু কোম্পানিগুলো সবসময় শুল্কের কারণে তাদের মুনাফার হার কমতে দিতে পারবে না। শুল্ক যদি স্থায়ী থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আরো মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণের প্রকৃত আয় কমে আসার চাপ দেখা দেবে।

 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-২০২৫]

জেফ্রি ফ্রাংকেল: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপিটাল ফর্মেশন এবং গ্রোথ বিভাগের অধ্যাপক, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণা সহযোগী এবং প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন