কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশল

জিয়াউদ্দিন সাইমুম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬]

ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশল

গত ৮ ডিসেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএস) প্রকাশ করে, যা আগের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা। এনএসএস সাধারণত প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার, কৌশলগত অভিপ্রায় এবং নীতিগত উদ্দেশ্যের রূপরেখা দেয়। ট্রাম্পও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে তাঁর প্রশাসনের বৈদেশিক নীতি এবং অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেছেন, যা তাঁর পূর্বসূরি এবং তাঁর নিজস্ব ২০১৭ সালের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

নতুন প্রকাশিত এনএসএস ট্রাম্পের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করে, যার মূল বৈশিষ্ট্য বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং অভিবাসনবিরোধী প্রবণতা।

 

 

 


এনএসএসের টেক্সটে তাঁর নাম ২৬ বার উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের ২০১৭ সালের এনএসএসে তাঁর নামটি ছিল একবার। ২০২২ সালের এনএসএসে একবারই বাইডেনের নাম এসেছে। তবে ট্রাম্প এবার তাঁর এনএসএস-কে দেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং অগ্রাধিকারগুলোর রূপরেখা দেওয়ার নথি হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন।

 

 

 

অধিকন্তু এই নথিটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত এবং লেনদেনমূলক বৈদেশিক নীতির দৃষ্টিভঙ্গিকে পুনরায় নিশ্চিত করেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরি এবং নেতৃত্ব দিয়েছে তা থেকে মার্কিন পশ্চাদপসরণকে দৃষ্টিকটুভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। ট্রাম্পের এনএসএস গণ-অভিবাসন থেকে মার্কিন সীমান্ত সুরক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার মূল উপাদান বানিয়ে ছেড়েছেন। এটি পূর্ববর্তী দুটি প্রশাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ আগে চীন ও রাশিয়াকে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

 

 


ট্রাম্পের এনএসএস যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য পুনরুদ্ধারের জন্য ‘মনরো মতবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োগ’ করার আহবান জানায়। ১৮২৩ সালে ঘোষিত মনরো মতবাদের লক্ষ্য ছিল পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় উপস্থিতির বিরোধিতা করা। একইভাবে নতুন এনএসএস পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রাধান্য পুনরুদ্ধার ও বজায় রাখার জন্য ‘মনরো মতবাদ’-এর ‘ট্রাম্পের নীতিমালা’ প্রয়োগ ও জোরদার করার চেষ্টা করছে। এই পদক্ষেপের  পেছনে প্রাথমিক যুক্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রে গণ-অভিবাসনকে নিরুৎসাহ করা, মাদক-সন্ত্রাসী, কার্টেল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধী সংগঠনগুলোকে ধ্বংস করা, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলকে সমর্থন করা এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলোতে অব্যাহত অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা। তা ছাড়া ট্রাম্পের এনএসএস-এ রাশিয়ার চেয়ে বেশি খুশি আর কোনো দেশ হতে পারে না।

 

 


এনএসএস-এর প্রতি রাশিয়ার উচ্ছ্বাসের কারণ হলো ইউরোপের অসন্তোষ।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার সমালোচনা না থাকাই ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত স্থিতিশীলতা অর্জন করতে চাইছে এবং ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইউরোপের আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, ইউরোপীয় দেশগুলো ‘যুদ্ধের জন্য অবাস্তব প্রত্যাশা পোষণ করে’ এবং শান্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছে। কারণ তারা ‘রাশিয়াকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখে।’ অধিকন্তু এনএসএস দাবি করে, বেশির ভাগ ইউরোপীয় শান্তি চায়, কিন্তু তাদের সরকার তাদের কণ্ঠস্বর দমন করছে।

 

 

ইউক্রেন যুদ্ধে ইউরোপের অবস্থানের সমালোচনার পাশাপাশি এনএসএস ইউরোপীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্যও ইউরোপের সমালোচনা করেছে। ইউরোপ ‘সভ্যতামূলক বিলুপ্তির’ সম্ভাবনার মুখোমুখি হচ্ছে বলে দাবি করার সময় এনএসএস ইউরোপকে অভিবাসনবিরোধী নীতি গ্রহণের জন্য পরামর্শ দেয়। নথি অনুসারে ইউরোপীয় অভিবাসন নীতিগুলো ‘সংঘাত সৃষ্টি করছে, বাকস্বাধীনতার ওপর সেন্সরশিপ দিচ্ছে, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করছে, জন্মহার কমাচ্ছে এবং জাতীয় পরিচয় ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে।’ এটি এই বছরের শুরুতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তৃতাকে প্রতিফলিত করে, যেখানে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের বাকস্বাধীনতা দমন এবং অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।

 

 

ট্রাম্পের এনএসএস মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় গণতন্ত্র এবং উদার মূল্যবোধ প্রচারে মার্কিন হস্তক্ষেপবাদী বৈদেশিক নীতির নিন্দা করেছে। কিন্তু ‘দেশপ্রেমিক ইউরোপীয় দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব’ সমর্থন করে ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে এটি হস্তক্ষেপ করেছে।

 

 

এনএসএস চীনের প্রতি মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতেও আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। যদিও এটি সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখে তাইওয়ান প্রণালীতে সংঘাত রোধ করার ওপর জোর দিয়েছে। এটা করা হয়েছে তাইওয়ানের তাৎপর্যপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে মার্কিন আধিপত্য এবং তাইওয়ান দ্বীপ শৃঙ্খলে সরাসরি প্রবেশাধিকার প্রদানের বিনিময়ে। অথবা বলা যেত পারে, কর্তৃত্ববাদী চীনের আগ্রাসন প্রতিরোধকারী একটি সহযোগী গণতন্ত্র হিসেবে তাইওয়ানের অবস্থানের কারণে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার গণতন্ত্র সংরক্ষণের জন্য নয়। ইতিহাস বলছে, ১৯৮৮ সালের এনএসএসের পর এই প্রথমবার মার্কিন নেতৃত্বাধীন উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে চীনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার নিন্দা করা হয়নি।

 

 

অধিকন্তু ট্রাম্পের এনএসএস চীনকে একটি পদ্ধতিগত প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে বরং একটি অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখছে। ‘বেইজিংয়ের সঙ্গে পারস্পরিকভাবে লাভজনক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার’ ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মনোনিবেশ এবং ‘চীনের সঙ্গে আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় ব্যালেন্স করার’ মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতএব এটি ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতির দৃষ্টিভঙ্গিকে পুনর্ব্যক্ত করে, যা জাতীয় নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয় কৌশলের প্রিজমের মাধ্যমে দেখে।

 

 

সামগ্রিকভাবে ট্রাম্পের এনএসএস মার্কিন মূল জাতীয় স্বার্থকে সীমান্ত নিরাপত্তার (গোলার্ধীয় প্রতিরক্ষা) মধ্যে সংকুচিত করেছে এবং চীনা ও রাশিয়ান হুমকিকে উপেক্ষা করেছে। যার ফলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন অস্বীকার করা হয়, যা অতীত থেকে আমূল প্রস্থানের বৈশ্বিক চিহ্ন।

 

 

লেখক : সাংবাদিক, বিশ্লেষক