ট্রাম্প-শি বৈঠক ও ট্রাম্পের এশিয়া সফরের তাৎপর্য
ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০২ নভেম্বর, ২০২৫]

দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ট্রাম্প-শি বৈঠকের দিকে আগ্রহ ছিল সবার। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের শুল্কঝড়কে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতিতে যে নয়া মেরুকরণের আভাস দেখা যাচ্ছিল, এর নেপথ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে চীনের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে নিম্নগামিতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, যা থেকে উত্তরণে সারা বিশ্বের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে মার্কিন বাণিজ্যকে আরো সম্প্রসারণ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রমুখী বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর এই শুল্ক পুনর্বিন্যাস করেন। এই অবস্থায় এত দিন ধরে সুসম্পর্ক থাকা কিছু রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি হলে ভারত, চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে এক নয়া মেরুকরণের আভাস দেখা যায়।
কিছুদিন আগে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের বৈঠকে শি, পুতিন ও নরেন্দ্র মোদির একত্র হওয়া, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকেও পরোক্ষভাবে সেদিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা ট্রাম্পের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পরিস্থিতি উত্তরণে নতুন কর্মপন্থা নির্ধারণে ট্রাম্প তাঁর দেশের বিরুদ্ধে এক হওয়া রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কে চিড় ধরাতে নতুন নীতি গ্রহণ করেছেন, যার অংশ হিসেবে তিনি প্রাথমিকভাবে চীনকে আস্থায় নিয়ে অপরাপর দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্কের দূরত্ব সৃষ্টি করতে চাইছেন। আর এটিই ছিল এবার তাঁর এশিয়া সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ট্রাম্প-শি বৈঠক ও ট্রাম্পের এশিয়া সফরের তাৎপর্যঅ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ এসিয়ান নেশনস (আসিয়ান) সম্মেলনে অংশ নিতে ট্রাম্প প্রথমে মালয়েশিয়া দিয়ে তাঁর এশিয়া সফর শুরু করেন, যার ধারাবাহিকতায় সফর করেন জাপানে এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত ২১টি দেশের অংশগ্রহণে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশনের (এপেক) বৈঠকে যোগদানের মধ্য দিয়ে এর শেষ হয়, যেখানে বহু কাঙ্ক্ষিত ট্রাম্প-শি বৈঠকটি হয়।
দুই নেতার মধ্যে এই নাতিদীর্ঘ সাক্ষাতে কী হতে যাচ্ছে, সেটি অনেকটা আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল, বাস্তবে ঘটলও তাই। তবে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, এক ধরনের সমঝোতা হয়েছে, যার আলোকে চীনের পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ছাড় পেয়েছে আরো অতিরিক্ত ১০ শতাংশ। এর বিনিময়ে মার্কিন বাজারে চীনের বিরল খনিজ রপ্তানির বিষয়ের বাধা অপসারণ করতে সম্মত হয়েছে চীন। মার্কিন সয়াবিন আমদানি বৃদ্ধি, ফ্যান্টানিলের উৎপাদন বন্ধ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি ক্রয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো বিষয়গুলোতেও সম্মত হয়েছে চীন।
এক ঘণ্টা ৪০ মিনিটের এই বৈঠকটিকে দুই নেতাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে একটি মাইলফলকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর মধ্য দিয়ে চীন কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিকে প্রাধান্য দিতে চাইছে, অপরাপর মিত্র দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে অধিক মূল্যায়ন করতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে একটি বিকল্প জোটকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে বা করছে, নাকি কার্যত একটি ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থার স্বার্থে সব দিকই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চাইছে—এই বিষয়গুলো নিয়ে নতুন বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে।
ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরের পেছনে কেবল চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা হ্রাসই যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সন্নিবেশিত করাও একটি উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে তিনি চীনকে ব্যবহার করার একটি কৌশল নিয়ে থাকতে পারেন। সেই সঙ্গে এশিয়ায় চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততাকে আরো দৃঢ় করা নিয়ে দুই দেশ যেভাবে কিছুদিন ধরে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল, সেখানটাতেও কিছুটা জল ঢেলে দেওয়া তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করা যেতে পারে।
এশিয়া বিশ্বরাজনীতিতে আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে ২০ দেশ বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির দুই-তৃতীয়াংশই এই অঞ্চলে এবং বৈশ্বিক জিডিপিতে এই অঞ্চলের অবদান ৪০ শতাংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এবং পরে মিলিয়ে প্রায় ৫০ বছর সময় ধরে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ইউরোপ প্রভাব বিস্তার করে চললেও সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার ক্রম উত্থান সব হিসাব-নিকাশকে পাল্টে দিচ্ছে। বিশ্ব জনসংখ্যার বিচারেও ৬০ শতাংশ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই অঞ্চলটি এখন মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা উন্নয়ন সম্পর্কিত ধারণায় এশিয়াকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে চীন ও ভারতের পরিবর্তিত নীতি যেন সেখানে এত দিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসা মার্কিন স্বার্থের প্রতিকূলে না যায়, সেটিও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই অঞ্চলের মধ্যে শুধু নয়, বৈশ্বিক পরিসরেও চীন যেভাবে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলছে, সে বিবেচনায় তার এই প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তাকে আস্থায় নিয়েই তা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে এশিয়ার অপরাপর বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সুসংহত করতে হলে চীনকে এড়িয়ে গিয়ে সম্ভব নয়। এশিয়ায় অপর রাষ্ট্র ভারতের অর্থনীতিও বর্ধনশীল হওয়া সত্ত্বেও চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের তুলনায় এবং বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের সঙ্গে, বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) কর্মসূচির কারণে বিশ্বব্যাপী চীন এক বড় শক্তি হিসেবে নিজের সামর্থ্যের প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের ওপর মার্কিন চাপ বৃদ্ধি হলেও এর ফলে ভারতের পক্ষে মার্কিন প্রভাব মোকাবেলায় চীনের মতো করে পাল্টা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করা দুরূহ। সে বিবেচনায় ভারতের পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্কবৃদ্ধির হার অপরিবর্তিত রেখে চীনের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্কহার পুনর্বিবেচনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মূলত নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিতকে আরো শক্তিশালী করার পথকেই শ্রেয় মনে করছে। তা ছাড়া একবার চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে স্থিতিশীল করে আনতে পারলে ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাদা সমঝোতার পথটিও অনেক সহজ হয়ে যাবে।
এই মুহূর্তে চীনের সঙ্গে যে বিষয়গুলোকে যুক্তরাষ্ট্র তার আলোচ্যসূচিতে প্রাধান্য দিয়েছে বা তালিকার শীর্ষে রেখেছে, তা হলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, এ ক্ষেত্রে চীনের কী ভূমিকা থাকতে পারে? এর একমাত্র জবাব হচ্ছে রাশিয়ার তেল ও বাণিজ্য, যা এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন এবং দ্বিতীয় হচ্ছে ভারত। এমনকি ইউরোপের দেশগুলো এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অংশীজন হলেও তারা পর্যন্ত এখনো রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভর করছে, বিকল্পের অভাবে এখান থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না, যদিও তারা এখান থেকে দ্রুত বের হওয়ার পরিকল্পনা করেছে। রাশিয়ার সস্তা তেল বিক্রির প্রস্তাব লুফে নিয়েছে চীন ও ভারত, যা রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে না পারার অন্যতম কারণ—এমন ধারণা থেকেই চীনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা রাশিয়ার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ট্রাম্প-শি আলোচনায় চীন রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল ক্রয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, যা ভারতকেও প্রকারান্তরে এমন পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহ দিতে পারে। সুতরাং এদিক থেকে বলা যায়, ট্রাম্প এশিয়া সফরে সওদা করতে এসে ভালোই করে গেলেন।
আগামী বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প সরকারি সফরে চীন যাবেন বলে জানিয়েছেন। এই সময়ের ভেতরে দুই নেতার মধ্যে হওয়া বোঝাপড়াগুলো যদি সঠিকভাবে এগিয়ে চলে, তাহলে বুঝতে হবে তিনি সত্যি জিতেছেন, তবে চীন অর্থনৈতিকভাবে লোকসান দিয়ে এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবে কি না, সেটিও ভাবার বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য যদি বর্তমান লাভের ধারাকে অব্যাহত রাখে, সে ক্ষেত্রে চীনের আপত্তি না-ও থাকতে পারে; যেমন—এবারের সফরে তিনি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন কিছু চুক্তি করে গেছেন, যা চীনের দিক থেকে এক সবুজ সংকেতের ফল। এ ক্ষেত্রে দুই নেতার মধ্যে আগামী বছরের বৈঠকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়