কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি ॥ বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব

ড. মো. মোরশেদুল আলম [প্রকাশিত : জনকণ্ঠ, ২৯ আগস্ট ২০২৫]

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি ॥ বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব

গত ২ এপ্রিলকে ‘লিবারেশন ডে’ নামে অভিহিত করে বিভিন্ন দেশের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই বেশ কয়েকবার পাল্টিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি গত ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর করা হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে বাণিজ্য ঘাটতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়ায় নতুন এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। একসঙ্গে কয়েকটি লক্ষ্য পূরণের জন্য ট্রাম্প এই শুল্ক ব্যবহার করেছেন।

 

যেমন: সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি করা, অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রেই পণ্য উৎপাদনে বাধ্য করা। বর্তমান সময়ে বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয় নয়, এটি ক্রমেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত এই শুল্কনীতি কোনো বৈশ্বিক নিয়ম বা ন্যায্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তৈরি। এর মধ্য দিয়ে বিশে^র ৯০টিরও বেশি রাষ্ট্রের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে অসম বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে কিছু দেশের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক বসিয়েছেন ট্রাম্প। যেসকল রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করতে সম্মত হয়েছে, তাদের জন্য কিছু ছাড় রয়েছে। তবে তারা চুক্তি সম্পাদন না করা পর্যন্ত পূর্ববর্তী শুল্কই কার্যকর থাকবে। এই নীতির আওতায় ভারতকে ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে; যা আগামী ২৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। শর্ত হলো, ভারতকে অবশ্যই রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করতে হবে। তবে ভারত এমন পদক্ষেপকে অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অনুচিত বলে মন্তব্য করেছে। 

 

 


রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়ের জন্য ভারতকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে; যা অন্যান্য দেশের জন্য একটি বার্তা বহন করছে। বিদেশে তৈরি কম্পিউটার চিপের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রযুক্তি সংস্থাগুলো যাতে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। এই হুমকির পর অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের এই শুল্ক নীতির মূল লক্ষ্য হলো বৈশি^ক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো; যা তার মতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এতদিন অন্যায্য ছিল। সিরিযার ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ৪১ শতাংশ। কানাডার ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। মেক্সিকোর সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকার কারণে তাদের শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। নতুন এই শুল্কনীতির আওতায় বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা পণ্যে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক প্রদান করতে হবে। নতুন এই শুল্কনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর রাষ্ট্রগুলো। লাওস ও মিয়ানমারের ওপর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত এশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যে সকল রাষ্ট্র পূর্ব থেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। যুক্তরাজ্য, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে কম শুল্কের সুবিধা পেয়েছে। সুইজারল্যান্ড থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ৩৯ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক ও ইউরোপের সার্বিয়ার ওপরও ৩৫ শতাংশ হারে শুল্ক বসানো হয়েছে। আলজিরিয়া, বসনিয়া ও হার্জগোভিনা, লিবিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর ৩০ শতাংশ হারে শুল্কারোপ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এতে তাদের পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক মেনে নেওয়া হয়েছে। 

 


ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির কারণে ভারত ও চীন রাষ্ট্র দুটি এক ধরনের কৌশলগত বোঝাপড়ার দিকে এগোচ্ছে। ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পণ্যের ওপর প্রথমে ২৫ শতাংশ এবং পরে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য তা আরও ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৫০ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। রাশিয়ার নিকট থেকে অস্ত্র ও জ্বালানি ক্রয়ের জন্য ভারতকে দন্ড প্রদান করা হয়েছে বলে ট্রাম্প জানান। ট্রাম্প এ প্রসঙ্গে বলেন, ভারত যদিও আমাদের বন্ধু, তবে বিগত বছরগুলোতে তাদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে আমরা কম ব্যবসা করেছি। কারণ তাদের শুল্ক অনেক বেশি, যা বিশে^ সর্বোচ্চ। ভারত বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে কঠোর ও বিরক্তিকর অশুল্ক বাধা ব্যবহার করে। ট্রাম্প আরও বলেন, ভারত সবসময় সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশ রাশিয়ার নিকট থেকে ক্রয় করে থাকে। সবাই যেখানে চায়, রাশিয়া যেন ইউক্রেনে হত্যা বন্ধ করে, ঠিক সে সময় চীনের মতো ভারতও রাশিয়ার জ্বালানির সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এসব ভালো লক্ষণ নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। কয়েক মাস ধরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করে আসছে। যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। ভারতের বাজারে বেশি পরিমাণে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার দাবি করে আসছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের শাস্তিমূলক হুমকি সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।

 

 

 
শুল্ক হচ্ছে একটি সরকারি ফি বা কর; যা বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বসানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এই শুল্ক পরিশোধ করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। অর্থাৎ বিদেশি কোম্পানি নয়। যারা পণ্য আমদানি করছে, তারাই এই অতিরিক্ত খরচ বহন করে। আর এ অর্থ জমা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এই ট্যারিফ বা শুল্ককে ট্রাম্প বলেছিলেন ‘অভিধানের সবচেয়ে সুন্দর শব্দ’। তিনি তাঁর প্রথম মেয়াদে বড় পরিসরে শুল্ক আরোপ করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদেও তিনি আরও ব্যাপক শুল্ক বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র আমদানিতে এমন শুল্ক বসাচ্ছেন যেন তা বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপনে বাধ্য হবে।

 

 

এতে দেশে কর্মসংস্থান ও মজুরি বৃদ্ধি পাবে। নতুন শুল্কনীতির বাস্তবায়ন খুব ভালোভাবে এবং খুব মসৃণভাবে চলছে বলে ট্রাম্প অভিমত দিয়েছেন। যেসব রাষ্ট্র এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেনি, তাদের জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ভারত ও চীনের একটি এক ও অভিন্ন স্বার্থ তৈরি হচ্ছে। ভারত ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক সবসময়ই সীমান্ত বিরোধ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার জন্য তিক্ত ছিল। কিন্তু এমন আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত নীতির কারণে রাষ্ট্র দুটিই নিজেদের এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে দেখতে পাচ্ছে। ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ রাষ্ট্রে দুটির মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। বিশ্ববাণিজ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এটি পণ্য, সেবা ও সম্পদের বাণিজ্য সহজতর করে। ফলে দেশগুলো তাদের তুলনামূলক সুবিধা অনুসারে উৎপাদনের ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ কম হয়। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার হয়।

 

 

যুগে যুগে বৈশ্বিক বাণিজ্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেনি; বরং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককেও শক্তিশালী রূপ দিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, শুল্কারোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে না। তবে মার্কিন অর্থনীতিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, এতদিন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকা মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই উচ্চ শুল্কই হচ্ছে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ। ইয়েল বাজেল ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের ঘোষিত শুল্ক যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর হয়, তাহলে স্বল্পমেয়াদে কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম ১৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র পোশাকের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে ক্রয় করে। চীন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া হচ্ছে প্রধান সরবরাহকারী রাষ্ট্র। এসব রাষ্ট্রের ওপর যে শুল্কারোপ করা হয়েছে, তা পোশাকের দামে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ইয়েল বাজেট ল্যাবের অনুমান অনুযায়ী, পোশাকের দাম স্বল্পমেয়াদে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা শুল্কের পুরো খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেননি।

 

 

তাছাড়া উচ্চ আমদানি করের আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী পণ্য মজুত করে রেখেছেন। গোল্ডম্যান সাক্সের অর্থনীতিবিদরা অনুমান করছেন, আমদানি করা ভোক্তাপণ্যের খরচের প্রভাব ভোক্তাদামে পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে প্রায় ৮ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে। তাই উচ্চ শুল্কের প্রভাব পণ্যের দামে এখনই পড়ছে না। নতুন শুল্কনীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশকে উচ্চ শুল্কের আওতায় আনার বিষয়টি কেউ কেউ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কৌশলের একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত নতুন শুল্কনীতির ফলে বাংলাদেশ কেবল দ্বিপক্ষীয় চাপ নয়, বরং বৈশি^ক বাণিজ্য নিয়েও রাজনীতির অনিশ্চয়তা ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে। এমন নীতি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নেতৃত্বাধীন নিয়মমাফিক বাণিজ্য কাঠামোকেই দুর্বল করেছে। আর বিশ^বাণিজ্য ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের সুযোগ হ্রাস পাবে। 

 

 


এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব থেকে আফ্রিকাকে রক্ষা করার জন্য চীন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র চীনের জন্য এটি একটি সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকাকে বাণিজ্যিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া চীন এখন তাদের জন্য একটি রক্ষাকবচ হিসেবে এগিয়ে এসেছে। চীন গত জুনে জানিয়েছিল, তারা প্রায় সব আফ্রিকান অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করবে। দক্ষিণ আফ্রিকার গবেষক নেও লেটসওয়ালো বলেন, বিকাশমান দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বৃদ্ধি করার জন্য আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর নেই। আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোকে সম্পূর্ণভাবে চীনের দিকে ঝুঁকে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ প্রদান করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার বৈশি^ক নেতৃত্বের অবস্থান হারাচ্ছেন বলেও তিনি অভিহিত করেছেন। দেশগুলো যত বেশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাবে, চীন তত বেশি বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ পাবে। নাইজিরিয়ান অর্থনীতিবিদ বিসমার্ক রেওয়ানে বলেন, আফ্রিকা সরাসরি চীনের হাতেই চলে যাচ্ছে। এটি একটি দুর্ভগ্যজনক পরিণতি। গত কয়েক বছরে আফ্রিকার বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হওয়া চীনের দিকে মহাদেশটির আরও ঝুঁকির এই প্রবণতার কথা উল্লেখ করে এমন মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্পর নেতৃত্বে বর্তমানে বিশ^বাণিজ্যে যে ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, তা বাজার অর্থনীতির মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। তিনি বাজার অর্থনীতি ছুড়ে ফেলেছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ট্রাম্পর এসব উদ্দেশ্য একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া এগুলো অনেক সময় পরস্পেরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একদিকে শুল্ক বসিয়ে যদি দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করতে চায়, তাহলে আমদানির ওপর নির্ভরশীল অনেক মার্কিন কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। ফলে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়বে। 

 

 


বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ট্রাম্প যে ধরনের একতরফা শুল্কারোপ করেছেন তা ইতিহাসে বিরল। এমনকি বিশ^ায়ন ব্যবস্থাকে যারা তৈরি করেছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্রই এখন সেটি ভেঙে দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা অভিমত প্রকাশ করেছেন। অর্থনীতিবিদরা এ প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমানে আর ‘সারভাইবাল অব দ্য ফিটেস্ট’-এর যুগ নেই। যারা ভালো চুক্তি ও দরকষাকষি করতে পারবে তারাই টিকে থাকতে পারবে। এখন অস্ত্র হিসেবে অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনায় এটি পরিচালিত হচ্ছে, কোনো অর্থনৈতিক নিয়মে কিন্তু নয়। ট্রাম্প এসব শুল্ককে ব্যবহার করেছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে। তিনি আবার প্রায়ই এসব অসম্পূর্ণ ও চলমান চুক্তিগুলোকে বড় সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই নতুন শুল্ক নীতি কয়েক মাসের বিশৃঙ্খলা তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনতে পারে।

 

 

 

শুল্কনীতির কারণে কিন্তু কাঁচামালের দাম আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুল্ক যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তার প্রভাব বাস্তবে আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বিদেশি নয়, দেশি আমদানিকারকদেরই প্রদান করতে হয়। এতে করে খরচের চাপ সাধারণ গ্রাহকদের ওপর পড়ে। সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি পেলেও অর্থনীতির অন্যান্য খাতে এই শুল্কের বিরূপ প্রভাব পড়ে। এমন অনিশ্চিত ও আগ্রাসী কৌশলের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক রাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক বাজারও অস্থির হয়ে উঠেছে। শিল্পখাতও বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্যে এখন আবার একটি নতুন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এটা খারাপ সময়ের ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাষ্ট্রও এখন ব্যয়ের চেয়ে বেশি আমদানি করছে। বিশ^ বাণিজ্য ব্যবস্থার এমন অস্থিরতা থেকে উত্তরণের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ প্রয়োজন।

 

  
লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়