কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ট্রাম্প কি ব্রিকসের চর হয়ে কাজ করছেন

জিম ও’নিল [সূত্র : প্রথম আলো, ২২ আগস্ট ২০২৫]

ট্রাম্প কি ব্রিকসের চর হয়ে কাজ করছেন

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে কাজ করছেন, তখন তাঁর অনেক কাজকর্ম অদ্ভুত ও বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিকস‍+ নামে যে বড় উদীয়মান অর্থনীতির জোট (যেখানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আরও কয়েকটি দেশ আছে), সেটির ব্যাপারে তাঁর আচরণ খুবই অস্বাভাবিক।

 

 

ট্রাম্প মুখে বলেন, তিনি চান না এই ব্রিকস‍+ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলা বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করুক। কিন্তু বাস্তবে তাঁর যেসব কাজকর্ম দেখা যাচ্ছে, তাতে অনেক সময় মনে হয় তিনি যেন উল্টো এই ব্রিকস+ গোষ্ঠীকেই সাহায্য করছেন, যাতে তারা আরও
শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং তাদের বৈশ্বিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারে।

 

 

এখন যদি ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায়, তিনি চীন আর রাশিয়ার ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে নরম আচরণ করেছেন। অথচ এই দুই দেশই গণতন্ত্রবিহীন রাষ্ট্র এবং তাদের ‘শক্তিশালী’ নেতাদের প্রতি ট্রাম্পের প্রশংসা উপচে পড়ছে।

 

 

সত্যি বলতে, তাঁর এ নরম আচরণের কারণ হয়তো অর্থনৈতিকভাবে ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া এড়ানো। যেমন তিনি যখন ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তখন চীনও পাল্টা শুল্ক দিয়েছিল এবং বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে মার্কিন শেয়ারবাজার ও ডলারের মান পড়ে গিয়েছিল। এমনকি মার্কিন সরকারি ঋণের সুদহারও বেড়ে গিয়েছিল।

 

আজকের বিশ্বে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে একটি উন্নত জি-২০, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি ও নতুন উদীয়মান শক্তিগুলোকে জায়গা দেওয়া হবে। ঘটনাচক্রে, যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালে জি–২০ আয়োজন করবে। সেটি হবে ট্রাম্পের জন্য বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেখানোর এক অসাধারণ সুযোগ। তবে তিনি আদৌ তা করতে পারবেন কি না, সেটি অন্য প্রশ্ন।

 


কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে ট্রাম্প এতটা সহনশীল নন, ফলে অদ্ভুত কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি সুইজারল্যান্ডের মতো ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুসুলভ দেশের প্রতি অত্যন্ত কঠোর হয়েছেন। অথচ ছোট অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্যঘাটতিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। এ ধরনের অযৌক্তিক আচরণ শেষ পর্যন্ত অনেক দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে উৎসাহিত করবে।

 

 

তারপর আসে রাশিয়ার কথা। ট্রাম্প মাঝেমধ্যে ভ্লাদিমির পুতিনকে হুমকি দেন বা সমালোচনা করেন। কিন্তু বেশির ভাগ সময় তিনি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চান, এমনকি ক্রেমলিনের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করার চেষ্টা করেন।

 

 

এর বিপরীতে তিনি ব্রাজিলকে আক্রমণ করেছেন, বিশেষ করে ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় ব্রাজিল সরকারকে এক অর্থে হুমকি দিয়েছেন।

 

 

বলসোনারোর বিচার করার জন্য লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশ ব্রাজিলের রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তবে ব্রাজিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর ততটা নির্ভরশীল নয়। আর যে বাণিজ্যের ওপর তারা নির্ভরশীল, তার বড় অংশই চীনের সঙ্গে। আর চীন তাদের ব্রিকস অংশীদার।

 

 


ভারতও ট্রাম্পের কঠিন ব্যবহারের শিকার হয়েছে। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। অথচ ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই ভেবেছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় ভারত খুব দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করবে। কিন্তু ভারত সব সময় কূটনীতিতে স্বাধীন অবস্থান নিয়েছে। তার ওপর ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনছে। এটি ট্রাম্পকে হতাশ করেছে। কারণ, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চাইছিলেন।

 

 

কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতকে দূরে ঠেলে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই চীনকে ঠেকাতে চায়, তবে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা দরকার। সম্প্রতি ট্রাম্প একজন শীর্ষ পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ করেছেন। এতে ভারত হয়তো চীনের প্রস্তাবগুলোর প্রতি আরও ইতিবাচক হতে পারে। এ মাসেই মোদি সাত বছর পর প্রথমবারের মতো চীন সফর করছেন।

 

 

আগেও আমি যুক্তি দিয়েছি, যদি চীন ও ভারত তাদের পার্থক্য ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে পারে এবং আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে তা ব্রিকস‍+ এর জন্য বিশাল পরিবর্তন বয়ে আনবে। শুধু তা–ই নয়, এটি এশিয়া, এমনকি বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাবে। আরও বেশি দেশ এশিয়ার দুই মহাশক্তি চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

 

 


এখানে সাম্প্রতিক কানাডার জি–৭ সম্মেলনের কথা মনে করা দরকার। সেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন, ২০১৪ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়াকে এই গ্রুপ থেকে বাদ দেওয়া একটা ভুল ছিল এবং এসব বৈঠকে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

 

 

ওই সময় আমি বলেছিলাম, ট্রাম্পের এ মন্তব্য যথেষ্ট যৌক্তিক। আমার ২০০১ সালের মূল ব্রিক (বিআরআইসি) প্রবন্ধেও আমি একই কথা বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, তখনকার জি-৮-এ (যেখানে রাশিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল) চীন, ব্রাজিল ও ভারতকেও নেওয়া উচিত ছিল। আর ইউরোপীয় অংশকে একীভূত করে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নকে রাখা উচিত ছিল (ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিকে আলাদা না রেখে)।

 

 

আজও আমি এ পরিবর্তনকে স্বাগত জানাব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ট্রাম্প এখন উল্টোটা করছেন। তিনি চীন ও রাশিয়ার প্রতি নরম মনোভাব দেখাচ্ছেন, অথচ ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জি-৭ মিত্রদেরও দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। এতে ব্রিকস‍+ ও অন্যদের মধ্যে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজে বের করার তাগিদ তৈরি হচ্ছে।

 

 


আজকের বিশ্বে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে একটি উন্নত জি-২০, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি ও নতুন উদীয়মান শক্তিগুলোকে জায়গা দেওয়া হবে। ঘটনাচক্রে, যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালে জি–২০ আয়োজন করবে। সেটি হবে ট্রাম্পের জন্য বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেখানোর এক অসাধারণ সুযোগ। তবে তিনি আদৌ তা করতে পারবেন কি না, সেটি অন্য প্রশ্ন।

 

 

জিম ও’নিল যুক্তরাজ্যের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও গোল্ডম্যান স্যাক্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট নামের বড় একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক চেয়ারম্যান

 

 

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ