তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ড. মো. আইনুল ইসলাম [জনকণ্ঠ; ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। যখন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এবং নাটকীয় পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সদ্যগঠিত এই সরকারের সামনে যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো পর্বতপ্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা কেবল একটি শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ফল নয়, বরং বিগত কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত কাঠামোগত দুর্বলতার ফসল।
বাংলাদেশের অর্থনীতির এই পর্যায়কে বুঝতে হলে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদসহ বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন তত্ত্ব বা থিউরির আশ্রয় নেওয়া শ্রেয়তর হবে। কেননা, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশের কোনো একটি সরকার আসেনি, যে সরকার রাজনীতি তথা শাসনকাঠমোর ছন্দপতন ছাড়া নির্বিঘেœ ক্ষমতায় এসেছে। নোবেলজয়ী ডগলাস নর্থের ‘ইনস্টিটিউশনাল ইকোনমিক্স’ বা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি তত্ত্বে দেখা যায়, একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য তার প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং ‘রুলস অব দ্য গেম’ বা নিয়মনীতির ওপর নির্ভর করে, যার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের অন্যান্য অনুষঙ্গের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক এই যোগ্যতা নেই বলেই প্রতিটি সরকার এসেই অর্থনৈতিক কার্যাবলী নতুন করে শুরু করে শূন্য থেকে। বিশ্ব ইতিহাসে দেখা গেছে, কোনো রাষ্ট্রে পরের অর্থ আত্মসাৎকারী গোষ্ঠী যখন সরকারকে করায়ত্ত করে স্বজনতুষ্টি পুঁজিবাদ কায়েম করে, তখন কোনো প্রতিষ্ঠানই ঠিকঠাকভাবে গড়ে না ওঠায় বারবার সেই দেশকে শূন্য থেকে কিছুটা উঠে আবারও নেমে আসতে হয় শূন্যে।
এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাহীন বাংলাদেশে বিএনপির নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অকার্যকর ও ফাউখাওয়াদের করায়াত্তে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা। বর্তমানের প্রশ্নবিদ্ধ ৪.৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৮.৫৮ শতাংশের বেশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির যে পরিসংখ্যান সরকার দেখছে, তা আসলে একটি ‘লো-গ্রোথ ট্র্যাপ’ বা নি¤œœ-প্রবৃদ্ধির ফাঁদের ইঙ্গিত। এই পরিস্থিতিতে জনমনে যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দেওয়া এবং একইসঙ্গে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা অত্যন্ত কঠিন একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কাজ।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের পরিবর্তনের পর থেকে ২০২৬-এর এই অন্তর্বর্তীকালীন যাত্রায় বিনিয়োগে যে স্থবিরতা এসেছে, তা কাটিয়ে উঠতে জোসেফ স্টিগলিটজের ‘ইনফরমেশন অ্যাসিমেট্রি’ বা তথ্যের অসমতা তত্ত্বটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পরিসংখ্যানের জালিয়াতি না করে বাজার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে সঠিক সংকেত পৌঁছানো এবং অনিশ্চয়তা দূর করাই এখন এই সরকারের প্রধানতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার মান নিয়ন্ত্রণই বর্তমানে সবচেয়ে সংবেদনশীল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ‘এনটাইটেলমেন্ট থিওরি’ বা অধিকার তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্যের অভাব নেই। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের সেই খাদ্যের ওপর অধিকার নেই। কারণ, রেন্ট-সিকিং (ছত্রাক বা পরজীবী) গোষ্ঠীর সীমাহীন অর্থের লোভ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত সংকুচিত করছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করেছে, যা সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনের গত দুই দশকের অর্জনকে ফেলেছে হুমকির মুখে। সামাজিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি সামাজিক অস্থিরতার বীজ।
নতুন সরকারকে বুঝতে হবে, মুদ্রানীতি বা সংকোচনমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর যে ধ্রুপদী প্রচেষ্টা চলছে, তা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, নোবেলজয়ী আচরণগত অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কানেম্যানের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের ‘লস অ্যাভারশন’ বা ক্ষতি এড়ানোর প্রবণতা অনেক বেশি। অর্থাৎ, মানুষ প্রবৃদ্ধির চেয়ে দাম কমানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। সরবরাহ ব্যবস্থার সিন্ডিকেট ভাঙা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা না গেলে কেবল ব্যাংক রেট বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ বা পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটে সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি মূল অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছিল। তাই এই সরকারকে এমন একটি জনতুষ্টিবাদী কিন্তু বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পথ খুঁজতে হবে, যা একইসঙ্গে বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে এবং নি¤œœবিত্তের থালায় দেবে ন্যূনতম ডাল, আলু ভর্তা ও ভাতের নিশ্চয়তা।
আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের ক্ষতগুলো এখনো ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) ও ইউনূস সরকার টাকা ছাপিয়ে, রেমিট্যান্সে রিজার্ভ ভরে এবং ঋণ শোধ না করে বরং ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনে তারল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে যে কেমোথেরাপি দিয়েছে, তা নতুন সরকারের জন্য একটি বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পরিমাণ ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশের ওপরে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কঠোর মুদ্রা সংকোচন নীতি, তারল্যসহ নানা সুবিধা দেওয়ার পরও বিবি বলছে, এনপিএল ডিসেম্বরে ৩০ শতাংশে নামতে পারে (কোনো নিশ্চয়তা নেই)। নোবেলজয়ী জেমস বুকাননের ‘পাবলিক চয়েস থিওরি’ বা জনপছন্দ তত্ত্বের দৃষ্টিতে, বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক অলিগার্করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে যে ‘রেন্ট-সিকিং’ বা অন্যায় সুবিধা গ্রহণের অপসংস্কৃতি তৈরি করেছিল, তার চূড়ান্ত ফল হলো আজকের এই দেউলিয়া প্রায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
ব্যাংকগুলো এখনো তারল্য সংকটে ভুগছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ সহায়তা নিয়ে টিকে থাকছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অকার্যকর প্রমাণ হওয়া অ্যাডাম স্মিথের ‘ইনভিজিবল হ্যান্ড’ বা অদৃশ্য হাতের ওপর ভরসা না করে বরং রাষ্ট্রকে কঠোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডেরন আসেমোগ্লুর ‘এক্সট্রাক্টিভ ভার্সেস ইনক্লু¬সিভ ইনস্টিটিউশন’ তত্ত্বটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সরকার ব্যাংকিং খাতকে শোষণের হাতিয়ার হওয়া থেকে মুক্ত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ বা অবসায়ন এবং একটি শক্তিশালী সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। তবে এই সংস্কারের পথে রাজনৈতিক বাধাগুলো হবে অত্যন্ত প্রবল।
রাজস্ব আদায়ের শোচনীয় অবস্থা এবং সরকারের ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণের ওপর অত্যাধিক নির্ভরতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে একটি নতুন সংকট তৈরি করেছে। কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৮ শতাংশের নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনি¤œœ এবং বৈশ্বিক মানেও অত্যন্ত হতাশাজনক। এই রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকার দেশীয় ব্যাংক ও বিদেশি উৎস থেকে যে পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে, তার সুদ পরিশোধ করতেই বাজেটের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে একে ‘ফিসক্যাল ক্রাইসিস অব দ্য স্টেট’ বা রাষ্ট্রের আর্থিক সংকট বলা হয়।
নতুন সরকারকে এখন এমন এক কর সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে, যা একইসঙ্গে রাজস্ব বাড়াবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপাবে না। এখানে জোসেফ স্টিগলিটজের ‘ট্যাক্সেশন অন ইনইকুয়ালিটি’ বা বৈষম্যের ওপর কর আরোপের ধারণাটি কার্যকর হতে পারে। ধনীদের কর ফাঁকি রোধ এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিশাল অংশকে করের আওতায় আনা এখন আর পছন্দ নয়, বরং বাধ্যতামূলক। কিন্তু এটি করতে গেলে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তার পরীক্ষা দিতে হবে নতুন সরকারকে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারই রাজস্ব সংস্কারের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর চাপে পিছিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের নতুন বাস্তবতায় সেই পুরোনো পথে হাঁটার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। কারণ, জনগণ রাজনীতিবিদ-আমলা-ব্যববসায়ীদের আচরণে তিতিবিরক্ত।
বৈদেশিক মুদ্রা বা রিজার্ভের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ নতুন সরকারের জন্য আরেকটি জটিল সমীকরণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ৩৪ (২৯) বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও তা মূলত রেমিট্যান্সের ওপর অতি-নির্ভরশীল। পল ক্রুগম্যানের ‘নিউ ট্রেড থিওরি’ বা নতুন বাণিজ্য তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো দেশের প্রবৃদ্ধি কেবল একটি পণ্যের (পোশাক খাত) ওপর নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করা এই সরকারের চ্যালেঞ্জের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক এবং ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা যোগ্যতার সঙ্গে কাজের অমিলও প্রকট। নোবেলজয়ী গ্যারি বেকারের ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি’ বা মানব পুঁজি তত্ত্ব অনুসারে, কেবল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়; যদি-না মানুষের সক্ষমতায় বিনিয়োগ করা হয়।
প্রতিবছর যে লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে, তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ যে কোনো সময় ‘ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার’ হয়ে সরকারের গদি নাড়িয়ে দিতে পারে। এই সংকট নিরসনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করা অতি জরুরি। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি মাদকের বিস্তার, সামাজিক অপরাধ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতারও মূল কারণ। তাই নতুন সরকারের প্রতিটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দুতে কর্মসংস্থানকে রাখা অত্যাবশকীয়।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়