কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পরও তিন বছর শুল্ক সুবিধা দেবে জাপান

স্বস্তিতে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা নিজস্ব প্রতিবেদক [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ১১ নভেম্বর ২০২৫]

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পরও তিন বছর শুল্ক সুবিধা দেবে জাপান

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আরো তিন বছর জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ব্যবস্থার আওতায় শুল্ক সুবিধা দেবে জাপান। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কমিটি অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে দাখিল করা সাম্প্রতিক একটি নোটিফিকেশনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও জাপানের এ ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

 
 

গত ৫ নভেম্বর গ্রহণ করা এবং জাপানের অনুরোধে প্রচার করা হচ্ছে উল্লেখ করে ডব্লিউটিও গত ৭ নভেম্বর নোটিফিকেশনটি প্রকাশ করেছে। এলডিসিগুলোর অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কিত জাতীয় আইনের সংস্কার বিষয়টি উল্লেখ করে নোটিফিকেশনে বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে এলডিসি শ্রেণী থেকে উত্তরণের পরও সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা দিতে জাপান তার শুল্ক ব্যবস্থা সংস্কার করেছে।

 
 
 
 
 

জাপানের জিএসপির উদ্দেশ্য সম্পর্কে নোটিফিকেশনে বলা হয়েছে, জিএসপি উন্নয়নশীল দেশ বা অঞ্চল থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাসের সুবিধা হিসেবে প্রযোজ্য। এর উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রফতানি আয় বৃদ্ধি করা। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে সহায়তা করা। জাপান উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার দৃষ্টিকোণ থেকে জিএসপি ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে পরিচালনা করছে।

 

 

রফতানিকারক মহল জানিয়েছে, এলডিসি-উত্তর নতুন প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য এ সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাপান শুল্ক সুবিধা বজায় রাখায় বাংলাদেশ ট্রানজিশনে ধাক্কা খাবে না, বরং বাজার ধরে রাখার সুযোগ আরো জোরদার হবে জানিয়ে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিকারকদের প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য প্রতিনিধিরা বলছেন, এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ মানে সাধারণত অনেক বাজারে শুল্ক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি থাকে। ফলে উত্তরণ-পরবর্তী সময় কী হবে তা নিয়ে রফতানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন ছিলেন। বাড়তি শুল্ক চাপ রফতানিকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেবে এমনটাই দাবি করে আসছিলেন তারা। তবে জাপানের ঘোষণা সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর করেছে বলে জানিয়েছেন তারা।

 

 

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘জাপানের ঘোষণাটি বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী প্রভাব নিয়ে রফতানিকারকরা উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। জাপানের ঘোষণার মাধ্যমে সেই উদ্বেগ অনেকটাই কমে আসবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির অন্যতম সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে জাপানের এ সিদ্ধান্ত পোশাক রফতানির বাজারে বৈচিত্র্য আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।’

 

 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের উল্লেখযোগ্য গন্তব্য হলো জাপান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে ১৪১ কোটি ১৬ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করেছে। যা বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ২ দশমিক ৯২ শতাংশ। জাপানে রফতানি করা বাংলাদেশের প্রধান পণ্য হলো তৈরি পোশাক। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে নিটওয়্যার পোশাক রফতানি হয়েছে ৬০ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার ডলারের। ওভেন পোশাক রফতানি হয়েছে ৫৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের। এ হিসেবে জাপানে মোট পণ্য রফতানির প্রায় ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক। এছাড়া উল্লেখযোগ্য অন্যান্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে হোম টেক্সটাইল, চামড়া-চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা ও ক্রাস্টেসিয়ানস।

 

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় পাঠানো নোটিফিকেশনটি রফতানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত শক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। তারা বলছেন, এলডিসি-উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি মাইলফলক হলেও রফতানিমুখী অর্থনীতিকে বৈশ্বিক পর্যায়ে ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে জাপানের এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

 

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেছেন, ‘জাপানের ঘোষণাটি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সুখবর। আমরা এ তথ্য অচিরেই সংশ্লিষ্টদের জন্য প্রচার করব।’

 

 

সব মিলিয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জন্য জাপানের শুল্ক সুবিধা অব্যাহত রাখার এ ঘোষণা বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সংগঠন প্রতিনিধিরা বলছেন, এটি শুধু একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের রফতানি সম্ভাবনাকে আরো সুসংহত করার একটি বাস্তব সুযোগ। কারণ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো নিবিড় করতে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে। খুব দ্রুতই চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার আগে জাপানের ঘোষণাটি চুক্তির বিষয়টিকে আরো ত্বরান্বিত করবে।

 

 

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সহসভাপতি আনোয়ার শহীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানতে পেরেছি খুব দ্রুতই জাপান-বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) হবে। এর মধ্যেই তিন বছর সুবিধা অব্যাহত রাখার ঘোষণাটিতে অনেক সুবিধা হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সংস্কারগুলো এতদিন শুধু কথার মধ্যেই ছিল। এগুলো করতে যে আরো সময় লাগবে তা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এখন খুব ভালোভাবে অনুধাবন করছে। জাপান তিন বছরের জন্য সুবিধা বাড়ানোয় আমরা এখন সেই সময় পাব। আর তিন বছরের সময়সীমা বৃদ্ধির বিষয়টিতে রফতানির প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আগেই সম্মতি প্রকাশ করেছিল, বাকি ছিল জাপান। দেশটির ঘোষণা তাই খুবই ইতিবাচক।’

 

 

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন আসন্ন বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে। নতুন এ সুবিধা বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশাধিকারকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশটিকে একটি আকর্ষণীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করবে। একই সঙ্গে জাপানের এ উদ্যোগ অন্যান্য উন্নত দেশকেও এলডিসি উত্তীর্ণ দেশগুলোর জন্য অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা বাড়াতে উৎসাহিত করবে।

 

 

জাপানের সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক উল্লেখ করে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (আরএপিআইডি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ সিদ্ধান্তের ফলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশ আরো তিন বছর জাপানি বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে পারবে। জাপানের দেয়া এ নতুন সুবিধার ফলে তাদের বাজারে আমাদের প্রবেশাধিকার নিরবচ্ছিন্ন থাকবে। সিদ্ধান্তটি জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে একটি অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের গন্তব্য হিসেবে বার্তা দেবে, যা তাদের নিজ দেশ ও চীনে অবস্থিত উৎপাদন কার্যক্রমের একটি অংশ বাংলাদেশে স্থানান্তর করতে উৎসাহিত করবে। জাপানের তিন বছরের এ মেয়াদ বৃদ্ধি অন্যান্য উন্নত দেশকেও একইভাবে এলডিসি উত্তীর্ণ দেশগুলোর জন্য অগ্রাধিকার সুবিধা সম্প্রসারণে উদ্বুদ্ধ করবে।’