কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সুপার পাওয়ারদের ব্লক পলিটিকস: চায়না ইন, আমেরিকা আউট!

সূত্র . শেয়ার বিজ, ১১ অক্টোবর ২০২৫

সুপার পাওয়ারদের ব্লক পলিটিকস: চায়না ইন, আমেরিকা আউট!

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি এমন এক সময়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে একক ক্ষমতার আধিপত্য ক্রমে ভেঙে পড়ছে, আর বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠছে নতুনভাবে। ১৯৮৯ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি—একটি একমেরু বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। তখন বিশ্বের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল সর্বব্যাপী। ইউরোপ থেকে এশিয়া, আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকা—সবখানেই মার্কিন প্রভাব ছিল রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। সময়ের পরিক্রমায় এখন সেই একমেরু বিশ্ব ক্রমে ভেঙে গিয়ে গড়ে উঠছে নতুন এক বহুমেরু বিশ্বে। আজ বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে দেখা যাচ্ছে এক নতুন বাস্তবতা—অনেকটা ‘চায়না ইন, আমেরিকা আউট।’

 

 

চীনের উত্থান কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি কৌশলগত, রাজনৈতিক, এমনকি সাংস্কৃতিকও। গত দুই দশকে চীন বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জাতীয় স্বার্থনির্ভর কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ঐক্যবদ্ধতার অদ্বিতীয় উদাহরণ। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)’ প্রকল্পের মাধ্যমে চীন এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সংযোগ স্থাপন করেছে। ৬০টিরও বেশি দেশে অবকাঠামো, বন্দর, রেলপথ ও জ্বালানি প্রকল্পের বিনিয়োগ করে চীন তার প্রভাব বিস্তার করেছে, যা কার্যত একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্লক গঠন করেছে। একটি চীনা ব্লক, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসছে ক্রমান্বয়ে।

 

 

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য আজ স্পষ্টতই চ্যালেঞ্জের মুখে। আফগানিস্তান থেকে ব্যর্থ প্রত্যাহার, মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক ও সিরিয়ার অস্থিতিশীলতা, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রতি আক্রমণ—সবকিছু মিলিয়ে আমেরিকা আজ আগের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। তার পররাষ্ট্রনীতি অনেক ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ডের শিকার। ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত ইসরাইল-সমর্থন বিশ্বব্যাপী মানবিক বিবেককে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বরং চীন ও রাশিয়া এখন নিজেদের ‘শান্তি ও ভারসাম্যের’ কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরছে। এই বাস্তবতাই আজকের ভূ-রাজনীতিকে এক নতুন দিকনির্দেশনায় নিয়ে যাচ্ছে।

 

 

চীনের উত্থান যেমন একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, তেমনি আমেরিকার পতন একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বহিঃপ্রতিক্রিয়ার ফল। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভাজন, অস্ত্র ব্যবসানির্ভর অর্থনীতি এবং কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট যুদ্ধের নীতি—এসবই তার প্রভাবকে ক্ষয় করেছে। একসময়কার ‘গ্লোবাল লিডার’ এখন বারবার প্রমাণ দিচ্ছে যে, সে আর বিশ্বকে একক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম নয়। তার গণতন্ত্র প্রচারের নামে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বিশ্বে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া—প্রতিটি উদাহরণই মার্কিন হস্তক্ষেপের করুণ ফলাফলের সাক্ষী। এই বাস্তবতা থেকেই অনেক দেশ এখন বিকল্প শক্তির আশ্রয় খুঁজছে, আর সেই বিকল্প নাম চীন।

 

 

চীনের পাশাপাশি রাশিয়াও বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়া জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমা আধিপত্য আর নিঃশর্ত নয়। মস্কো ও বেইজিং এখন কৌশলগত অংশীদার, যেখানে তাদের অভিন্ন স্বার্থ হলো মার্কিন একক বিশ্বব্যবস্থাকে প্রতিহত করা। তুরস্কও এই নতুন ভূরাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে; ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, ইরান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনৈতিক অবস্থানও পরিবর্তিত হচ্ছে, তারা আর আগের মতো মার্কিন ইচ্ছাধীন নয়। এই দেশগুলো নিজেদের সার্বভৌম নীতি পুনর্গঠন করছে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে।

 

 

বিশ্ব রাজনীতির এই পুনর্গঠনে ‘ব্লক পলিটিকস’-এর প্রাসঙ্গিকতা তাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। তবে এটি আগের মতো সামরিক জোটনির্ভর নয়, বরং অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। একদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ব্লক ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের সহযোগী রাষ্ট্রগুলো। অন্যদিকে রাশিয়া-চীনকেন্দ্রিক পূর্ব ব্লক, যেখানে যোগ দিচ্ছে ব্রিকস, সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) ও অন্য আঞ্চলিক সংস্থাগুলো। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো, যেমন ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি বাংলাদেশ পর্যন্ত এই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখতে সচেষ্ট।

 

 

একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি এখন কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না; বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহই হচ্ছে আসল অস্ত্র। চীন এই বাস্তবতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে। হুয়াওয়ে, টিকটক, জেডটিই বা আলিবাবা—এসব কেবল কোম্পানিই নয়, বরং চীনের ‘সফট পাওয়ার’-এর প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রসারে বাধা দিলেও বাস্তবে এগুলো এরই মধ্যে পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে নতুন এক ডিজিটাল দুনিয়া তৈরি করেছে। একসময় যেখানে ‘আমেরিকান ড্রিম’ ছিল বিশ্ব সংস্কৃতির প্রতীক, এখন সেখানে ‘চায়নিজ মডেল’ হয়ে উঠছে উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনা।

 

 

বিশ্ব রাজনীতির ভৌগোলিক অবস্থানও এখন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, লাতিন আমেরিকা—এসব অঞ্চল দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনৈতিক শোষণের শিকার ছিল। এখন চীন ও রাশিয়া সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে। আফ্রিকায় চীনা বিনিয়োগ, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু প্রকল্প, পাকিস্তানের সিপিইসি, মধ্য এশিয়ার গ্যাসপাইপলাইন—এসবই বিশ্বে নতুন জোটবদ্ধতার ইঙ্গিত। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শনও বটে—যা অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানকে গুরুত্ব দেয়।

 

 

কেউই এখন আর চায় না, কোনো সুপার পাওয়ার তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করুক। লাতিন আমেরিকায় বামপন্থি সরকারগুলোর প্রত্যাবর্তন, আফ্রিকায় সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানগুলো, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের ক্ষয়—সবই এক সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, ‘বিশ্ব আর আমেরিকার একক ইচ্ছাধীন নয়।’ সামপ্রতিক বছরে নাইজার, মালি, বুরকিনা ফাসো বা গ্যাবনের অভ্যুত্থানগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলো কেবল সামরিক পরিবর্তন নয়, বরং একধরনের প্রতিরোধ আন্দোলন পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে।

 

 

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে আছে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, যা কার্যত একটি বিকল্প বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। চীনের এই প্রকল্পে অংশ নিয়ে দেশগুলো তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করছে, নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত হচ্ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত একটি পদক্ষেপ, যেখানে চীন নিজেকে একপ্রকার শান্তিপূর্ণ উন্নয়নশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে। তার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সামরিক ঘাঁটি, নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধনীতির ওপর নির্ভর করছে, যা ক্রমেই অকার্যকর হয়ে উঠছে।

 

 

ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতা এই ভূরাজনৈতিক পালাবদলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের বুলি আওড়ানো সেই রাষ্ট্রই এখন ইসরাইলের বর্বরতার পাশে দাঁড়িয়ে নীরব থেকে নিজের অবস্থান হারাচ্ছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পক্ষ নিয়ে, শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি বিকল্প শক্তির প্রতীক হয়ে উঠছে। আজ বিশ্বের বহু তরুণ মনে করছে, শান্তির রাজনীতি পশ্চিম নয়, বরং পূর্ব থেকেই আসবে।

 

 

আগামী প্রজন্মের জন্য এই পরিবর্তন মানে এক নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। একদিকে আমেরিকার ঔদ্ধত্য ভেঙে পড়ছে, অন্যদিকে চীন ও তার মিত্ররা তৈরি করছে নতুন ভারসাম্য, যেখানে বৈশ্বিক শক্তি হবে ভাগাভাগি, নেতৃত্ব হবে সহযোগিতার ভিত্তিতে। রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ভারত, ব্রাজিল—এই দেশগুলো এখন একে অপরের স্বার্থে একত্র হচ্ছে; একে বলা যায় নতুন এক ‘মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড অর্ডার।’

 

 

এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা কেবল শক্তির ভারসাম্য নয়, এটি মানবতার পুনরুত্থানও হতে পারে, যদি দেশগুলো নিজেদের স্বার্থের পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেয়। পৃথিবী আজ অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সংঘাত, যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও পরিবেশ বিপর্যয়ে জর্জরিত। তাই প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে শক্তি মানে যুদ্ধ নয়, বরং উন্নয়ন; নেতৃত্ব মানে আধিপত্য নয়, বরং সহযোগিতা।

 

 

চীন এই বার্তা দিতে চাইছে—‘আমরা নেতৃত্ব চাই না, বরং অংশীদারত্ব।’ অন্যদিকে আমেরিকা এখনও ‘আমরাই নেতা’ ভাবনায় আবদ্ধ। ইতিহাস দেখিয়েছে, যে কোনো রাষ্ট্র যখন নিজেকে অপরিহার্য মনে করে, তখন তার পতন অনিবার্য হয়। রোমান সাম্রাজ্য থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য—সবাই সেই শিক্ষা দিয়েছে। আজ সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও।

 

 

অতএব একবিংশ শতাব্দীর এই ‘ব্লক পলিটিকস’-এর যুগে আমরা দেখছি এক নতুন বাস্তবতা—‘চায়না ইন, আমেরিকা আউট।’ চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তি এখন নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার একক প্রভাব। পৃথিবী এখন আর কোনো একক শক্তির নয়; এটি বহু শক্তির সম্মিলিত ভারসাম্যের মঞ্চ। আর এই ভারসাম্যের দিকেই যাচ্ছে আগামী পৃথিবী, যেখানে শক্তি নয়, শান্তি হবে মূল নীতি; প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, সহযোগিতা হবে মূল লক্ষ্য; আধিপত্য নয়, পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানই গড়ে দেবে আগামী বিশ্বের ভূরাজনীতি।

 

এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ