শুল্কযুদ্ধ কি ব্রিকসকে গতিশীল করছে
ড. সুজিত কুমার দত্ত [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৪ আগস্ট ২০২৫]

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কোনো দেশের গৃহীত নীতি তার ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফল দিতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্যনীতি এমনই একটি উদাহরণ। তিনি যে আগ্রাসী শুল্কনীতি গ্রহণ করেন, তার অন্যতম অপ্রত্যাশিত ফল হলো ব্রিকস জোটের দেশগুলোকে আরো ঐক্যবদ্ধ করা। বিকসের সদস্য ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প কার্যত দেশগুলোকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে আরো নিবিড় সমন্বয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি ছিল একতরফা এবং শাস্তিমূলক। বিদেশি পণ্যের ওপর উচ্চশুল্ক আরোপ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এবং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন বাড়াতে চেয়েছিলেন। চীনের ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনা হয়, যা পরবর্তী সময়ে শত শত বিলিয়ন ডলার মূল্যের চীনা পণ্যে বিস্তৃত হয়। কিন্তু তাঁর শুল্কের খড়্গ কেবল চীনের ওপরই থামেনি।
ভারতের ওপর সম্প্রতি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি, বিশেষত রুশ তেল কেনার ‘অপরাধে’ এবং ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর অনুরূপ চাপ প্রয়োগ ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফলে দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে উচ্চস্তরের সমন্বয় বজায় রাখলেও ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা সাধারণত অর্থনৈতিক বিষয় এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ওপর বেশি মনোযোগ দিত। ভারত দীর্ঘকাল ধরে একটি ‘বহুমুখী ভারসাম্যপূর্ণ’ নীতি অনুসরণ করে এসেছে, বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে।
এই দেশগুলোর নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ এবং পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের ভিন্নতার কারণে ব্রিকসের মধ্যে কৌশলগত ঐক্যের অভাব পরিলক্ষিত হতো। তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা এবং গভীরতর সমন্বয়ের জন্য একটি শক্তিশালী অনুঘটকের অভাব ছিল। ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ সেই অনুপস্থিত অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে।
ভারতের উদাহরণ এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বছরের পর বছর ধরে নয়াদিল্লি ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতি অনুসরণ করে এসেছে।
এর অর্থ হলো, ভারত কোনো একক পরাশক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে তার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কাছাকাছি আসা, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ভূমিকা গ্রহণ করা, একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো বহুপক্ষীয় ফোরামে চীনের সঙ্গে যুক্ত থাকা। এই নমনীয় ভারসাম্য ভারতের জন্য একাধারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত করেছে, আবার চীন-রাশিয়া শিবির থেকে সম্পদ এবং কূটনৈতিক সমর্থনও এনে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।
এর ফলে ভারত চীন ও রাশিয়ার দিকে আরো বেশি ঝুঁকেছে। যেখানে একসময় চীন-ভারত সম্পর্ক সীমান্ত বিরোধ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্বারা জটিল ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আকস্মিক চীন সফর, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত একটি নতুন প্রবণতার জন্ম দিয়েছে। এটি ট্রাম্পের শুল্কনীতির সরাসরি প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ যখন যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যকে একটি অস্ত্রের মতো ব্যবহার করছে, তখন ভারতের মতো দেশগুলো নিজস্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈচিত্র্যপূর্ণ অংশীদারির গুরুত্ব উপলব্ধি করছে। চীনের বিশাল বাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ভারতের জন্য একটি অনিবার্য বাস্তবতা, যা ট্রাম্পের নীতির মুখে আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ পরোক্ষভাবে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ এবং একপক্ষীয় আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য ব্রিকসের ঐকমত্যকে আরো জোরদার করেছে। শুল্ক বাধা কেবল একটি বাণিজ্যগত ইস্যু নয়, এর মূলে রয়েছে ডলারের বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা। যখন যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন অন্যান্য দেশ তাদের অর্থনীতিকে এ ধরনের বাহ্যিক চাপ থেকে রক্ষা করার জন্য বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। ব্রিকসের মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য করার এবং একটি সাধারণ ব্রিকস পেমেন্ট সিস্টেম তৈরির আলোচনা তারই প্রতিফলন। এটি কেবল স্বল্পমেয়াদি ব্রিকস সহযোগিতা নয়, এর মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি উভয়কেই দীর্ঘমেয়াদি গতিশীলতা প্রদান করবে। চীন ও রাশিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় ব্রিকসকে একটি শক্তিশালী মেরু হিসেবে কাজ করতে উৎসাহিত করছে।
ব্রিকস দেশগুলো তাদের সম্মিলিত অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে পশ্চিমাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করতে সক্ষম। একতরফা পদক্ষেপ এবং শুল্ক আরোপের মাধ্যমে মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করা দীর্ঘ মেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রভাবকেই ক্ষুণ্ন করবে। ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি হয়তো ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিল, কিন্তু এর অনিচ্ছাকৃত ফল হলো ব্রিকসকে শক্তিশালী করা এবং একটি চীনা নেতৃত্বাধীন বহু মেরু বৈশ্বিক অর্থনীতির দিকে বিশ্বকে ঠেলে দেওয়া। ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পশ্চাদপসরণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়