সুদানে গৃহযুদ্ধ ॥ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির দায়
ড. মো. মোরশেদুল আলম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ১৪ নভেম্বর ২০২৫]

২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও আরএসএফ প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালো তথা হেমেদতির মধ্যে ক্ষমতা ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ, আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা সুদান রাষ্ট্রকে ছিন্নভিন্ন করে আফ্রিকার মানচিত্র পুনরায় নতুন করে আঁকার হুমকি প্রদান করছে। কয়েক দশকের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশ যে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক সংঘাত দেখেছে, তার মধ্যে সুদানের এই গৃহযুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই গৃহযুদ্ধে কমপক্ষে ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয় ২০১৯ সালে। সে সময় ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে গণবিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনী সরিয়ে দেয়।
এরপর সেনা ও বেসামরিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলেও ২০২১ সালে আরেকটি অভ্যুত্থানে তা ভেঙে পড়ে। এই অভ্যুত্থানের মূল নায়ক ছিল বর্তমান পরস্পরের দুই শত্রু সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আরএসএফ প্রধান জেনারেল মোম্মদ হামদান দাগালো। প্রথমে যদিও তারা আল বশিরকে একসঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং বেসামরিক শাসনে ফেরার প্রশ্নে পরস্পর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। পরিশেষে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সংঘর্ষের সত্রপাত হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরএসএফ রাজধানী খার্তুমের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়। দুই বছর পর ২০২৫ সালের মে মাসে খার্তুম পুনরায় দখল করে সুদান সেনাবাহিনী। আরএসএফ গঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালে। এর শিকড় হচ্ছে কুখ্যাত জানজাওয়িদ মিলিশিয়া, যারা বিদ্রোহীদের দমন করতে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়।
যদিও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির এই বাহিনীকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিলেন। আরএসএফ বর্তমানে দারফুর ও কোর্দোফান অঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা দখলে নিয়ে স্বাধীন প্রশাসন দাবি করছে। এতে করে সুদান আবারও বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তুরস্ক আরএসএফের বিরুদ্ধে সুদানের সেনাবাহিনীকে সমর্থন জানিয়ে আসছে। তুরস্কের ইস্তানবুুলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ওআইসি’র অর্থনৈতিক সম্মেলনে এরদোয়ান বলেন, সুদানে দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মুসলিম বিশে^র ওপর বার্তায়। সুদানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা আমাদের রক্ষা করতে হবে।
সুদান উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একটি দেশ। রাষ্ট্রটির সমৃদ্ধ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং একইসঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। নুবিয়ান সভ্যতা থেকে বর্তমান সময়েও গৃহযুদ্ধ ও শান্তিচুক্তি, রাষ্ট্রটির ভূ-কৌশলগত অবস্থান এবং জটিল ভূরাজনীতি বিশ^বাসীর নিকট আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাত, জাতিগত দ্বন্দ্ব এবং সামরিক শাসন বিদ্যমান। নীল নদের তীরবর্তী সুদান প্রাকৃতিক সম্পদে যদিও ভরপুর, তবুও দেশটিতে অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট বিরাজমান। সুদানের আয়তন প্রায় ১৯ লাখ বর্গকিলোমিটার। এর সঙ্গে ৭টি দেশের সীমান্ত রয়েছে।
এর উত্তরে মিসর, উত্তর-পূর্বে লোহিত সাগর, পূর্বে ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়া, দক্ষিণে দক্ষিণ সুদান, দক্ষিণ-পূর্বে কেনিয়া ও উগান্ডা, দক্ষিণ-পশ্চিমে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, পশ্চিমে চাদ এবং উত্তর-পশ্চিমে লিবিয়া অবস্থিত। লোহিত সাগরের সাথে দেশটির ৮৬৩ কিলোমিটার উপকূল রয়েছে। নীল নদের একটি অংশ সুদানের রাজধানী খার্তুমের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। ভূকৌশলগত অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর জন্য সুদান একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ।
র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) গত ২৬ অক্টোবর সুদানের উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশের শহরটি দখলের পর ভয়াবহতা তীব্র রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেখানে গণহত্যা, নির্যাতন, লুটপাট, ধর্ষণ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে। এল-ফাশেরে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে অকল্পনীয় নৃশংসতা চালানো হচ্ছে বলে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে। জাতিসংঘ প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, শহরের মোট ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত ৮২ হাজার মানুষ পালিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, আরএসএফ এল-ফাশের শহর থেকে সেনাবাহিনীকে তাড়িয়ে দেয়ার মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষ পালিয়ে গেছে। দীর্ঘ ১৮ মাসের অবরোধের পর এল-ফাশের শহরটি ছিল দারফুরে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি; যা দুর্ভিক্ষ ও বোমাবর্ষণের দ্বারা চিহ্নিত।
জাতিসংঘ আরও জানিয়েছে, সুদানের গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে; যা বিশে^র বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষুধার সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সুদানে ঘটে যাওয়া নৃশংসতা মহাকাশ থেকেও দেখা গেছে। ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের হিউম্যানিটেরিয়ান রিচার্স ল্যাবের বিশ্লেষকরা বলছেন, আরএসএফ এল-ফাশেরে অনারব জাতিগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালাচ্ছে। স্যাটেলাইট ছবিতে রক্তের দাগ দেখা যাওয়ায় ইয়েল বিশ^বিদ্যালয়ের মানবিক গবেষণা ল্যাবের নাথানিয়েল রেমন্ড একে ‘রুয়ান্ডাস্তরের গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই গণহত্যা হলো আরএসএফ এবং দেশটির সেনাবাহিনী, সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) মধ্যে গৃহযুদ্ধের নৃশংসতা। গণহত্রার এই দৃশ্য ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার প্রথম দিকের দিনগুলোকেই শুধু মনে করিয়ে দেয় না; বরং ২০ বছর আগের দারফুরের সেই ভয়ংকর গণহত্যাকেও পুনরায় জীবন্ত করে তুলে।
তবে এবার তা আরও ভয়াবহ ও ঘনীভূত হয়ে ফিরে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, আরএসএফ মাসালিত ও অন্যান্য অ-আরব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে। এটিকে তারা ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলেও আখ্যা দিয়েছে। বিশ^ খাদ্য কর্মসূচি-এর মতে, সুদানের দুই কোটি চল্লিশ লাখের বেশি মানুষ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি। সুদানের বিষয়ে বৈশি^ক প্রতিক্রিয়া একেবারেই কম বলে মন্তব্য করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস জানিয়েছেন, বিশে^র অন্যান্য সংকটের তুলনায় সুদানের এই সংঘাতের প্রতি বৈশি^ক আগ্রহ কম। এতে করে সুদানের সংঘাত ‘বিস্মৃত যুদ্ধ’ হিসিবে বিশ^বাসীর নিকট পরিচয় পেয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, দারফুরের শেষ প্রধান শহর এল-ফাশের এখন আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে।
ইতোমধ্যেই এলাকাটি এক বিপর্যস্ত মানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি ছিল, এখন তা অন্ধকার নরকে পরিণত হয়েছে। সুদান মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে বলে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুল মন্তব্য করেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুদানের পরিস্থিতিকে ভয়ংকর বলে উল্লেখ করেন। সুদানের দারফুরের স্বর্ণের খনির দিকি নজর পড়েছে আরব আমিরাতের। তাই সুদানের মানচিত্র পাল্টে দিতে চাচ্ছে আরব আমিরাত। একই কাজটি তারা লিবিয়ায়ও করে যাচ্ছে। সুদান সরকার ২০২৫ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগ এনেছিল তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমিরাতের দাপটের নিকট দুর্বল সুদান ঠিকতে পারেনি।
মিসর হচ্ছে সুদানের সেনাবাহিনীর প্রধান সমর্থক রাষ্ট্র।
মিসর জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানকে বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে। মিসর সুদানের সেনাবাহিনীকে সামরিক সহযোগিতা দিচ্ছে বলে আরএসএফ বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে আসছে। যদিও মিসর এই অভিযোগ অস্বীকার করছে। সুদানের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা কিন্তু সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মিসর সুদানের সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করছে। কারণ মিসরের সঙ্গে সুদানের নীলনদভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর। জেনারেল বুরহান লোহিত সাগর উপকূলের পোর্ট সুদান শহরকে অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ষোষণা করেছেন। অন্যদিকে সুদানের সেনাবাহিনীর অভিযোগ হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে অস্ত্র ও ভাড়াটে তথা কলম্বিয়ান সৈন্য দিয়ে সহযোগিতা করছে।
সুদানের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশে আরএসএফ আরব আমিরাতের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি আরব আমিরাতের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আবার আরব আমিরাত আরএসএফর প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০২৫ সালের মে মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দাবি করে, আরব আমিরাত দারফুরে উন্নত চীনা অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাচ্ছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও জানিয়েছে, আরব আমিরাত চীনা ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্র সরবরাহ বাড়িয়েছে আরএসএফকে। এমনকি আরব আমিরাতের দুটি ঘাঁটিও সুদানে রয়েছে। চাদ, লিবিয়া, কেনিয়া ও সোমালিয়া হয়ে স্থল বা আকাশপথে সুদানে প্রবেশ করছে। সুদান সরকার এ অভিযোগে কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসে আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন করেছিল। যদিও আরব আমিরাত এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তবুও জাতিসংঘের প্রতিবেদনসহ স্বাধীনভাবে হওয়া কিছু তদন্তে এমন অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। সুদান সরকারের অভিযোগ, লিবিয়ার নেতা খলিফা হাফতার আরএসএফকে সহযোগিতা করছেন। লিবিয়ার সমর্থনের ফলেই সীমান্তবর্তী এলাকায় এই সশস্ত্র সংগঠনটি একটি অভিযান সফল করতে সক্ষম হয়েছে। হাফতার আরব আমিরাতের নিকট থেকে অস্ত্র ও জ¦ালানি নিয়ে আরএসএফকে সরবরাহ করছেন। যদিও এমন অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। চাদের প্রেসিডেন্ট মাহামাত ইদ্রিস দেব ও তাঁর সরকার আমিরাতের পক্ষ হয়ে আরএসএফের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ রুট হিসেবে কাজ করছে। তবে তুরস্ক কিন্তু সুদানের সেনাবাহিনীর পক্ষ হয়ে কাজ করছে। আরএসএফের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলার জন্য তুরস্ক সুদান সেনাবাহিনীকে ড্রোনও সরবরাহ করেছে। কেনিয়ার বিরুদ্ধে আরএসএফকে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
সুদানের সেনাবাহিনীর দাবি, সুদানের রাজধানী খার্তুমে আরএসএফের অস্ত্রগারে মেড ইন কেনিয়া লেখা অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাওয়া গেছে। সুদান সরকার আরও অভিযোগ করেছে, চাদ হয়ে আরব আমিরাতের সরবরাহ করা সামরিক সরঞ্জামের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে কেনিয়া। এদিকে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে সুদান ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপিত হয়েছিল। এরপর আরএসফের অভিযোগ হচ্ছে, সুদানের সেনাবাহিনীকে ইরান ড্রোন সরবরাহ করছে। সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের তিন দশকের শাসনামলের শেষের দিকে সুদানে ব্যাপক বিনিয়োগ করে আরব আমিরাত। ইয়েমেনে ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব-আরব আমিরাত জোটে হাজার হাজার সুদানি যুদ্ধ করছে।
মিডল ইস্ট আই-এর মতে, সুদান বর্তমানে আরব আমিরাতকে লোহিত সাগর এবং পূর্ব আফ্রিকাজুড়ে তার শক্তি প্রদর্শনের জন্য একটি ক্ষেত্র প্রদান করেছে। প্রেসিডেন্ট বশিরের শাসনামলে দেশটি রাশিয়ার ওপরও সামরিকভাবে নির্ভরশীল ছিল। লোহিত সাগরে একটি রুশ নৌঘাঁটি স্থাপনের চুক্তি নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল। সম্প্রতি চুক্তিটি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা ও চলছে রাষ্ট্র দুটির মধ্যে। রাশিয়া ও সুদানের মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে। সুদান ইস্যুতে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর দ্বিমুখী নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আরএসএফ ও তার সহযোগী মিলিশিয়ারা জাতিগতভাবে মিশ্র জনগােষ্ঠীর অঞ্চলটিকে আরব শাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করার লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করছে। সৌদি আরব ও বাহরাইনে কয়েক দফা শান্তি আলোচনা হলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি। উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে অনীহা দেখিয়েছে। আরএসএফ ঘোষণা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও মিসর প্রস্তাবিত মানবিক একটি যুদ্ধবিরতিতে তারা সম্মত হয়েছে। রাষ্ট্রগুলো সেপ্টেম্বর মাসে পরিকল্পিনাটি পেশ করে বলেছিল, এরপর একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং বেসামরিক শাসনে রূপান্তর ঘটতে হবে। সুদান সরকার সেসময় বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছিল। বিদেশি ভাড়াটে সৈন্যের ওপর নির্ভরশীল বর্ণবাদী সন্ত্রাসী মিলিশিয়ার সঙ্গে আরএসএফকে তারা তুলনা করেছিল।
আরএসএফ কর্তৃক এল-ফাশের এবং তার মাধ্যমে দারফুরের বিস্তৃত পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার পর ভবিষ্যতের যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা করছে বিশেষজ্ঞরা। তবে আশার বাণী হচ্ছে গত ৬ নভেম্বর এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের কথা উল্লেখ করে আরএসএফ বলেছে, সুদানের জনগণের আকাক্সক্ষা ও স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আরএসএফ কোয়াড দেশগুলোর প্রস্তাবিত মানবিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে সুদানের সামরিক জোটবদ্ধ সরকার আরএসএফের এমন ঘোষণার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সুদানের রাজধানী খার্তুমে ৭ নভেম্বরও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। এ বিষয়ে আরএসএফ কোনো মন্তব্য না করেনি। তবে সুদান সরকার জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সতর্ক থাকবে। কারণ আরএসএফ যুদ্ধবিরতি মানে না।
অনেকে সুদানের যুদ্ধকে ভুলে যাওয়া যুদ্ধ হিসেবে মনে করলেও বাস্তবে তা নয়। এটি হচ্ছে বিশ^শক্তিগুলোর চুপ থাকা এবং অবহেলার ফসল। এর কারণ হচ্ছে, সুদানের এই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া মানে হচ্ছে আঞ্চলিক ও বৈশি^ক রাজনীতির ভণ্ডামির মুখোমুখি হওয়া। তবে সম্প্রতি সুদানের এমন বিপর্যয়কর যুদ্ধের অবসানের জন্য একটি সমন্বিত রোডম্যাপ উন্মোচন করা হয়েছে। গত মাসে ঘোষিত কোয়াডের শান্তি প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল লক্ষণীয়। রোডম্যাপটির রূপরেখা হচ্ছে দ্রুত সাহায্য সরবরাহের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩ মাসের মানবিক যুদ্ধবিরতি, এরপর একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ৯ মাসের একটি ক্রান্তিকালীন যুদ্ধবিরতির সঙ্গে বিরোধ শেষ হবে।
এর ফলে একটি স্বাধীন, বেসামরিক নেতৃত্বাধীন যার বিস্তৃতভিত্তিক বৈধতা এবং জবাবদিহি থাকবে। গত মার্চ মাসে সুদানের সেনাবাহিনী খার্তুম পুনরুদ্ধারের পর যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা উন্নত হয়েছে, যা যুদ্ধবিরতির পথে একটি বড় বাধা দূর করেছে। তাছাড়া যুদ্ধ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্য একটি ক্ষতিকারক অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মিডল ইস্ট আই-এর মতে, মিসর ও সৌদি আরব তাদের ভৌগোলিক নৈকট্রের কারণে এটিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। এই সংঘাতে আরব আমিরাত যুক্ত হওয়ার কারণে তাদেরও মূল্য দিতে হচ্ছে। আবার সুদানকে কেন্দ্র করে আরব-আন্তঃআরব উত্তেজনা আরব লীগের মতো অন্যান্য সংগঠনেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। চলতি বছর সুদান ইস্যুতে লন্ডন সম্মেলনও ভেস্তে গেছে। এছাড়া অন্য গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলোতে আঞ্চলিক কূটনীতিকে দুর্বল করার হুমকি প্রদান করছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সুদান পুনরায় ভেঙে পড়তে পারে। এতে করে আফ্রিকার একটি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়তে পারে।
লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়