কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সঠিক নীতি ও পদক্ষেপ নেয়া হলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব

ড. মোস্তফা কে মুজেরী [সূত্র : বণিকবার্তা, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

সঠিক নীতি ও পদক্ষেপ নেয়া হলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৮ সালে। চূড়ান্তভাবে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু কভিডের কারণে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায় দুই বছর। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বাংলাদেশের। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমরা কোটা ও শুল্কমুক্ত কিছু সুবিধা পেতাম। অন্যান্য ক্ষেত্রেও আরো কিছু বিশেষ সুবিধা পাওয়া যেত স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে। সেগুলো এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর পাওয়া যাবে না। তবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের তিনটি শর্ত রয়েছে। আমরা সেগুলো পূরণ করেছি ২০১৮ সালে। পরবর্তী সময়ে যেহেতু এসব শর্ত আমরা প্রতিপালন করতে সক্ষম হয়েছি তাই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মাধ্যমে আমাদের উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

 

 


যত দ্রুত আমরা এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট করব তত বেশি উন্নয়ন সক্ষমতা সৃস্টি করতে পারব। নিঃসন্দেহে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা বাড়বে। এর অর্থ হচ্ছে, আমাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে অর্থনীতি, সমাজনীতি, সৃজনশীলতা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সক্ষমতা বাড়ানো গেলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো একটা অবস্থান তৈরি হবে। আবার যদি গ্র্যাজুয়েশন দুই-তিন বছর পেছানো যায় তখন আমাদের তিন বছর পর সক্ষমতা কিন্তু বাড়াতে হবে। কাজেই যেক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, সেক্ষেত্রে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দিয়ে তেমন কোনো লাভ হবে না।

 

 


একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেয়ার দাবি তুলেছে। কিন্তু আমাদের মতো বেশ কয়েকটা দেশ গ্র্যাজুয়েশন করে যদি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, তখন আমরা কেন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না? প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আমাদের যে ধরনের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার, তার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা বর্তমানে পাই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর সেগুলো না পেলেও আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই যদি আমরা উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে চাই। কাজেই এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যত শিগগিরই আমরা প্রচেষ্টা নেব, তত তাড়াতাড়ি দেশের অর্থনৈতিক চেহারা পরিবর্তনে সক্ষম হব।

 

 

এসব বিবেচনায় রেখে করণীয়গুলো ঠিক করতে হবে। সে অনুযায়ী কার্যপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা দরকার। দেশী ও বিদেশী সহায়তায় কার্যপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে, যাতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে পারি। এখন আমাদের জন্য একটা সুযোগ আছে। কারণ বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্কের একটি অসম প্রতিযোগিতা ছিল। আমরা সে অবস্থান থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এ সুযোগে যদি দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায় তাহলে অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং আমরা যত দ্রুত এক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার চেষ্টা করব, তত দ্রুত এর সফলতা লাভ করতে পারব। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। তাই এসব মাথায় রেখেই কার্যপরিকল্পনা নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দিকে নজর দেয়া উচিত।

 

 

২০১৮ সাল থেকে আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা কেন প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারলাম না এ প্রশ্ন করা যেতে পারে। গত আট বছর আমরা কি কেবল সময় অপচয় করেছি। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অনুসারে এলডিসির শর্ত পূরণ করার পর কোনো দেশ ইচ্ছা করলেও এলডিসি হিসেবে থাকতে পারে না। আমরা হয়তো আবেদন করতে পারি, কিন্তু যৌক্তিক কারণ ছাড়া তা যে গৃহীত হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

 

 

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন না করে যদি আরো দুই-তিন বছর পিছিয়ে দেয়া হয় তাহলে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা নিতে কি আমরা তৎপর হব—অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু তা বলে না। সহায়তা ছাড়া টিকে থাকা যায় না। এ ধরনের মানসিকতা আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য এখনো আরো এক বছরের বেশি সময় আছে। এ সময়ের মধ্যে আমরা যদি সঠিক নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করি তাহলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হলেও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় যেসব চ্যালেঞ্জ আসবে, নিশ্চয়ই সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে আমরা সক্ষম হব।

 

 

সক্ষমতা আছে, সে ব্যাপারে আমাদের আত্মবিশ্বাস থাকা উচিত। এ আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো রকম অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর আমাদের আরো বেশি উন্মুক্ত হতে হবে। তখন অশুল্ক ও শুল্কবাধা যেগুলো আছে সেগুলো ধীরে ধীরে উঠিয়ে দিতে হবে। এখন বিশ্বায়নের যুগ। বিশ্বায়নের যুগে আমরা নিজেদের বিশ্ববাজার থেকে স্বতন্ত্র রাখতে পারব না। আমাদেরও উন্মুক্ত হতে হবে। কাজেই সবকিছুর ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর যখন আমাদের বিশেষ সুবিধাগুলো থাকবে না তখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হবে। গ্র্যাজুয়েশনের জন্য দ্রুততার সঙ্গে প্রস্তুতি নেয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

 

আমরা যদি সক্ষমতা অর্জন না করি তাহলে আমাদের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য থাকবে না। সক্ষমতা অর্জন করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা নিতে হবে। আমাদের মতো অন্য দেশগুলো যদি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না? তাছাড়া আমাদের অর্থনীতি প্রায় সব দিক থেকে অনেক বেশি অগ্রসর। কাজেই সেখানটায় আমাদের এ সক্ষমতা না থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ আছে বলে মনে হয় না। বরং আমাদের ইচ্ছাশক্তির অভাব রয়েছে এটাই প্রমাণ হয়।

 

 

আমরা দীর্ঘদিন ধরেই শুনছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হলে দেশের শিল্প, রফতানি ও সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়বে। এগুলো নতুন কিছু নয়, বিশ্ব পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তন চলমান। সবাই এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের চেয়ে ছোট দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে এবং সক্ষমতা অর্জন করছে। তাহলে আমরা কেন সক্ষমতা অর্জন করতে পারব না? এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো যদি যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে পারি, আসন্ন ধাক্কাও মোকাবেলা করা সম্ভব। আমাদের প্রস্তুতি থাকা উচিত এবং তাহলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন আমাদের উন্নয়নের জন্য অনেক বেশি সহায়ক হবে।

 

 

ড. মোস্তফা কে মুজেরী: ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ