স্থানীয় সরকার নির্বাচন : সুষ্ঠু ও অবাধ, ব্যয় ও সময়সাশ্রয়ী নির্বাচন অপরিহার্য
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম [সূত্র : বণিক বার্তা, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

একটি দেশ ও সমাজে কার্যকর স্থানীয় সরকার তৃণমূল থেকে গণতন্ত্রকে সুসংহত করে। সাধারণ মানুষ সুশাসনের অংশীদার হয়। উন্নয়ন ও সেবা ব্যয়সাশ্রয়ী এবং গুণ ও মানসম্পন্ন হয়। স্থানীয় সরকার স্থানীয় মানুষজনের জন্য গণতন্ত্রচর্চার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠশালা। এখানে গণতন্ত্রচর্চা জাতীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করে। সবকিছু মিলিয়ে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারের উপব্যবস্থা হিসেবে স্থানীয় সরকারের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। সংবিধানের ১১৯ (১)-এর অধীনে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন শুধু জাতীয় নির্বাচন নির্বাহের জন্য গঠিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত। ১১৯ (২) অনুসারে নির্বাচন কমিশন সরকার কর্তৃক আদিষ্ট বা অনুরুদ্ধ হয়ে ‘নির্ধারিত দায়িত্বের অতিরিক্ত’ হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে। সাতটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তথা সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ তিনটি জেলা পরিষদ ও তিন জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদগুলো সাতটি ভিন্ন ভিন্ন মৌলিক আইন দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত হয়। আবার ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনও পৃথকভাবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নানা কারণে সব নির্বাচন সময়মতো অনুষ্ঠিত হযনি।
সংবিধানের ৫৯ (২)-এর সুযোগে ‘সংসদ যেরূপ নির্ধারণ করিবেন’ সেভাবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ও কার্যক্রম নির্ধারণ হবে—এ বিধিবিধানের সুযোগে বা অপব্যবহারের কারণে স্থানীয় সরকারের কাঠামো-কার্য নির্ধারণে পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গঠনকাল, গঠনকাঠামো, নির্বাচন ও কার্যক্রম ভিন্ন। তাতে প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন কাজ করতে সমস্যায় পড়ে, তেমনি নির্বাচনও হয়ে পড়ে দীর্ঘ একটি প্রলম্বিত প্রক্রিয়া, ব্যয়বহুল ও সন্ত্রাসপ্রবণ। এজন্য স্থানীয় সরকারবিষয়ক সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অংশ ৫৯ ও ৬০ এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিধানের ১১৮ ও ১১৯ অনুচ্ছেদের সংশোধনী প্রয়োজন। সংবিধানের স্থানীয় সরকার ও নির্বাচনসংক্রান্ত বিধানগুলোর পুনঃপর্যালোচনা দরকার। সংবিধানের তৃতীয় পরিচ্ছেদের সব ‘স্থানীয় শাসন’ শব্দাবলির স্থলে ‘স্থানীয় সরকার’ প্রতিস্থাপিত হবে। স্থানীয় সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শব্দ বা প্রত্যয়। অনুবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় সরকারে মূল ধারণা বিকৃত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সরকার গঠনসংক্রান্ত সাংবিধানিক অঙ্গীকার প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সরকারগুলো ১৯৭৩ থেকে ধারাবাহিকভাবে অবজ্ঞা, অবহেলা ও উদাসীনতাই শুধু দেখায়নি, দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সংবিধানের অঙ্গীকার অনুযায়ী সব প্রশাসনিক এককে একসঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যার ফলে দেশে বিভিন্ন স্তরে কতগুলো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু ‘সত্যিকারের একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম’ হিসেবে গড়ে ওঠেনি।
যেমন ১৯৭৩ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বিভাগ, জেলা, থানা ও ইউনিয়ন প্রশাসনের চারটি এককের মধ্যে শুধু একটি এককে স্থানীয় সরকার ছিল। সেটি হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। পৌরসভা কার্যকর থাকলেও কার্যগতভাবে পৌর এলাকা কোনো প্রশাসনিক একক ছিল না। পরে সংবিধান ও আইন বাঁচানোর জন্য পৌর এলাকাকে প্রশাসনিক একক ঘোষণা করা হয়। ১৯৮১-৮২ সালে থানা পর্যায়ের প্রশাসনিক এককে উপজেলা পরিষদ গঠনের মাধ্যমে ইউনিয়ন ও থানা দুটি এককে স্থানীয় সরকার গঠিত হয়।
জেলায় ঐতিহাসিকভাবে জেলা পরিষদের ভৌত অবকাঠামো একটি ভবন, কিছু কর্মচারী এবং আয়-ব্যয়ের সংস্থান থাকলেও কোনো নির্বাচিত পরিষদ ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত ছিল না। পার্বত্য অঞ্চলে দেশের সমতলের মতো ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার সঙ্গে ১৯৮৮-এর পর পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ যুক্ত করা হয়। দেশের সমতল ও পার্বত্য এলাকা মিলে মোট বিধিবদ্ধ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার ৪৭৯। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত-অনির্বাচিত নেতার সংখ্যা প্রায় ৬০-৬২ হাজার। নির্বাচিত বিধিবদ্ধ স্থানীয় সরকার ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় রয়েছে সনাতনী রাজা-হেডম্যান-কারবারি ব্যবস্থা এবং দেশের সেনানিবাসগুলোয় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ‘ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড’।
জাতীয় নির্বাচন পাঁচ বছরে একবার একটি তফসিলের মাধ্যমে আয়োজন করা যায়। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচন একটি সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদকালে অন্তত সাতটি বা ততোধিক ভিন্ন ভিন্ন তফসিলে আয়োজিত হয়। আবার ১২টি সিটি করপোরেশন ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদ শেষে তাদের নির্বাচন আয়োজন করে। অন্যদিকে মামলা-মোকাদ্দমার কারণে স্থগিত নির্বাচনগুলো অনির্ধারিত সময়ে তফসিল ঘোষণা দিয়ে আয়োজন করতে হয়। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা এ তিন নির্বাচন আয়োজনের বহর ও বিস্তৃতি তিনটি জাতীয় নির্বাচনকেও হার মানায়। অতীতে এ তিন নির্বাচনে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার মানুষ আহত হয়েছে ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। এভাবে পৃথক সাতটি নির্বাচন ও নানা সময়ে পৃথকভাবে সিটি নির্বাচন ও স্থগিত নির্বাচন আয়োজন অনেক ব্যয়বহুল, সময়ক্ষেপণকারী এবং প্রশাসনিকভাবে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। একটি সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের প্রতি বছরই এক বা একাধিক নির্বাচন হতে থাকে। তাতে প্রচুর কর্মদিবস নষ্ট হয়। সারা দেশ নির্বাচনী ডামাডোলে অস্থির ও প্রকম্পিত হয়।
স্থানীয় সরকার গঠনসংক্রান্ত সাংবিধানিক অঙ্গীকার প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সরকারগুলো ১৯৭৩ থেকে ধারাবাহিকভাবে অবজ্ঞা, অবহেলা ও উদাসীনতাই শুধু দেখায়নি, দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সংবিধানের অঙ্গীকার অনুযায়ী সব প্রশাসনিক এককে একসঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে দেশে বিভিন্ন স্তরে কতগুলো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে কিস্তু ‘সত্যিকারের একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম’ হিসেবে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আয়োজনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার একমাত্র প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে পরিষ্কারভাবে সে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়নি। নানা সময়ে সরকারে আসা রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংগঠন, অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা প্রভৃতিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত একটি ব্যবস্থার পরিবর্তে পরস্পরবিরোধী ও বিচ্ছিন্ন একটি অন্তর্ঘাতমূলক ‘দুর্বৃত্ত ডেন’-এ রূপান্তরিত করেছে। তাই স্থানীয় সরকারে অন্তর্ভুক্তিমূলক, শুদ্ধ, স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন আয়োজন একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচটি স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে ২ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং ১৯ লাখ ৬২ হাজার লোকবল নিয়োজিত ছিল। অনায়াসে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের এ ব্যয় ৬০০-৭০০ কেটি টাকায় নামিয়ে এনে ১৯ লাখের বদলে ৯ লাখ জনবল নিয়োগ করে স্থানীয় নির্বাচন নির্বাহ করা যায়। নির্বাচন আয়োজনের সময়কাল পাঁচটি নির্বাচনের তফসিল বিবেচনায় ২২৫ দিন থেকে ৪৫ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব। ৩৬৫ দিনের একটি বছরে আমরা ২২৫ দিন শুধু অর্থহীন নির্বাচনে ব্যয় করে থাকি। নির্বাচন কমিশনকে বিভিন্ন সময়ের স্থানীয় নির্বাচনের জন্য ১৫ থেকে ২১টি বিধি ও আচরণবিধি তৈরি করতে হয়। এখানে যথাযথ সংস্কার হলে এক বা দুটি বিধিমালার মাধ্যমে সব স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে। এতে সরকারের অনেক সময় সাশ্রয় হতে পারে।
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং প্রফেসর, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ড ও সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৪