স্থানীয় সরকার : নগর স্থানীয় সরকারের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম [প্রকাশ : বণিকবার্তা, ২২ নভেম্বর ২০২৫]

দুর্ভাগ্যজনক বাংলাদেশের নগর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা একটি কার্যকর জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সেবাদানকারী ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এ প্রতিষ্ঠানগুলো নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা তাদের কার্যকারিতা ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। এ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিকতার অভাব, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় মেয়রের একচ্ছত্র আধিপত্য, আর্থিক অসংগতি, মানবসম্পদের ঘাটতি, সরকারের হস্তক্ষেপ, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, স্বচ্ছতার অভাব, নাগরিক অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা ও নির্বাচনী জটিলতা উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর বলা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নগর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান—সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম হিসেবে কাউন্সিল বা পরিষদ কাজ করার কথা, যেখানে সংশ্লিষ্ট করপোরেশন বা পৌরসভার অন্তর্গত নির্বাচিত কাউন্সিলররা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে কাউন্সিলর ও মেয়রের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতার নিরিখে বিশাল পার্থক্য বিরাজ করে।
একই সঙ্গে বর্তমান আইন অনুযায়ী মেয়র করপোরেশন বা পৌরসভার সব প্রশাসনিক উন্নয়ন কার্যক্রম একচ্ছত্রভাবে পরিচালনা ও বাজেট নিয়ন্ত্রণ করার সুবাদে কাউন্সিলের ওপর মেয়রের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। কাউন্সিল একটি মিনি সংসদ হওয়ার কথা ছিল। কাউন্সিলরদের একটি বড় অংশ নানা অপরাধী চক্রের হোতা ও তারা তাদের ওয়ার্ডের নানা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতে যুক্ত থাকে। এখানে রাজনৈতিক নেতা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুর্বৃত্ত গ্যাং, ঠিকাদার, কর্মকর্তাদের একটি দুষ্টচক্র কাজ করে। সাধারণ ও নিরীহ নাগরিক এর ধারে কাছে যেতে পারে না, যার দরুন কাউন্সিলের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনা-বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। ফলে কাউন্সিলের মধ্যে বিভিন্ন ওয়ার্ডের জনস্বার্থবিষয়ক বিষয়াবলি উপস্থাপিত হওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাউন্সিল তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়।
বাংলাদেশের নগর স্থানীয় সরকারে মেয়রদের একচ্ছত্র ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার একটি বড় দুর্বলতা। যদিও স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ এ একচ্ছত্র আধিপত্যকে আইনগতভাবেই সমর্থন করে। তবে বিষয়টা যতটা না আইনগত তার চেয়ে অনেক বেশি চর্চাগত ও ব্যবহারিক। মেয়রদের রাজনৈতিক পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য বিবেচনায় কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে এতটাই পার্থক্য থাকে যে রাজনৈতিক প্রভাব ও শক্তিমত্তার প্রভাবে কাউন্সিলে মেয়রের একাধিপত্য সৃষ্টি হয়। ভিন্নমত দিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়ররা কাউন্সিলর ও অন্য স্টেকহোল্ডারদের মতামত উপেক্ষা করে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন, যা প্রকারান্তরে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে এক ধরনের ‘স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন পদ্ধতি’ সৃষ্টি করে।
পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে ওয়ার্ড হলো জনপ্রনিধিত্বের নির্বাচনী একক ও নির্বাহী এলাকা এবং নাগরিক সেবা প্রদানের প্রধান ইউনিট। কিন্তু বাস্তবে বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ ইউনিটটি একটি স্বতন্ত্র কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। প্রধানত সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা না থাকা ও সম্পদ বরাদ্দের ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় ওয়ার্ড পর্যায়ের নাগরিকদের চাহিদামতো সেবা প্রদান বা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
বড় শহরগুলোয় সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে আর এক ধরনের সংকট দেখা যায়। বিভিন্ন কারণে প্রতিদিন গ্রাম থেকে মানুষ শহরে আসছে। শহরমুখী মানুষের অন্যতম গন্তব্য হলো ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহর। এ বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রয়োজনীয় পরিষেবা দেয়া সিটি করপোরেশনগুলোর জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে একটি তীব্র জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান, যেমনটি ঢাকা সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এখানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মধ্যে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশনে মোট ১২৯টি ওয়ার্ড রয়েছে, যার মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭৫ ও উত্তর সিটির ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে।
সিটি করপোরেশনগুলোর প্রতিটি ওয়ার্ডে জনসংখ্যার পরিমাণ সমান নয়। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোয় জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এবং সেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। এছাড়া নিয়মিতভাবে নতুন অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ফলে এলাকাগুলোয় অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ নাগরিকের জন্য মাত্র একজন কাউন্সিলর রয়েছেন, যাকে সাহায্য করার জন্য একজন সচিব থাকেন। বাস্তবতা হলো বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশনের একটা ওয়ার্ডে গড় জনসংখ্যা ৮০-৯০ হাজার। গত ১০ বছরে জনসংখ্যার বিপুল উল্লম্ফন হলেও ওয়ার্ডগুলোর সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে করপোরেশনের পরিষেবাগুলো অপ্রতুল হয়ে পড়ছে ও সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা দুর্নীতি এবং বিভিন্ন রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে কম জনবহুল এলাকাগুলোয় করপোরেশনের পরিষেবাগুলো তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও কার্যকর।
করপোরেশনগুলোয় কাউন্সিল সভা অনিয়মিত। সভাগুলোয় ইস্যুভিত্তিক কোনো নীতি হয় না। কাউন্সিলররা শুধু প্রকল্পের পেছনে ছোটেন। একই কাউন্সিলর আবার নামে-বেনামে ঠিকাদার ও সরবরাহকারী, যা সরাসরি বেআইনি ও স্বার্থের পর্যায়ে পড়ে। কাউন্সিল সভা বা অধিবেশন হওয়ার কথা সিটি করপোরেশনের সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সে কাউন্সিল ও কাউন্সিলর ব্যবস্থাটি এমন একটি পর্যায়ে অবনমিত হয়েছে, স্থানীয় কাউন্সিল গণতন্ত্রের লেশমাত্র ধারণ করে না।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ অনুযায়ী প্রতিটি করপোরেশনে কমপক্ষে ১৪টি স্থায়ী কমিটি ও স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন-২০০৯ অনুযায়ী কমপক্ষে পাঁচটি স্থায়ী কমিটি (যেমন অর্থ কমিটি, নগর পরিকল্পনা, আইন-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা কমিটি) গঠন করার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এ কমিটিগুলো প্রায়ই অকার্যকর থাকে। কমিটিগুলোকে কার্যকর করার জন্য কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। কমিটিগুলোর কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে করার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিকসেরও অভাব রয়েছে। এছাড়া করপোরেশনের ভেতরকার সংস্কৃতিতে এ কমিটিগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় না। ফলে এ কমিটিগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেহায়েত কাগুজে ব্যাপারে পরিণত হয়।
পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নগর স্থানীয় সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস হলো স্থানীয় কর, ফি ও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান। তবে কর আদায়ের অদক্ষতা, সীমিত কর আদায়ের ক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা, কর ফাঁকি ও কর নির্ধারণে সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির কারণে পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনে কর থেকে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ অনেক কম। এছাড়া কর-বহির্ভূত আয়ের উৎসও সীমিত। এসব কারণে পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনগুলোয় বাজেট ঘাটতি একটা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পৌরসভার ক্ষেত্রে এ নির্ভরশীলতা আরো অনেক বেশি। পৌরসভার আয়ের উৎস আরো অনেক বেশি সংকুচিত। যদিও শ্রেণীভেদে পৌরসভার রাজস্ব আয়ের পরিমাণের তারতম্য আছে, রাজস্ব আয়ের পরিমাণ উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা একবারেই অপ্রতুল।
বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোয় দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি কার্যকর নগর প্রশাসন ও জনসেবা প্রদানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা (২০২০) অনুযায়ী অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত ভূমিকায় দক্ষ কর্মীর অভাবে জর্জরিত, যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের মতো জটিল নাগরিক সমস্যা সমাধানে তাদের সক্ষমতাকে ব্যাহত করছে। উদাহরণস্বরূপ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তার প্রয়োজনীয় কর্মীবাহিনীর মাত্র ৬০ শতাংশ নিয়ে কাজ করছে, ফলে সেবা প্রদানে অদক্ষতা দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ নগর স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসনকে সীমিত করে। বিশেষ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ, তহবিল নিয়ন্ত্রণ করাসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, যা প্রক্রিয়াকে জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলে। এছাড়া অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় সরকারের নেতৃত্ব নিজস্ব বিচার-বিবেচনার মতো কাজ করতে পারে না।
বাংলাদেশের নগর শাসন ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলো সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে দুর্বল সমন্বয়। উদাহরণস্বরূপ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ওয়াসা (ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়ারেজ অথরিটি) এবং রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)-এর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এ সংস্থাগুলো প্রায়ই একে অন্যের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই কাজ করে। ফলে নগর পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়। যেমন ২০২১ সালে ঢাকার গুলশান এলাকায় জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে ডিএনসিসি ও ওয়াসার মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পায়, যা সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। একইভাবে পুলিশ, বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব যানজট ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে নগরবাসীর সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিলম্ব ও অসুবিধার সৃষ্টি হয়।
এ সমন্বয়হীনতা বড় শহরের পরিপ্রেক্ষিতে বেশি হলেও ছোট শহর বা পৌরসভাগুলোয়ও কিছু কম দেখা যায় না। উদহারণস্বরূপ ২০২১ সালে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত একটি সংবাদের দিকে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। ওই সংবাদে দেখা যায় তড়িঘড়ি করে ফুটপাত নির্মাণ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতার কারণে থমকে যায় রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভার শত কোটি টাকার উন্নয়নকাজ।
বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভাগুলোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির উল্লেখযোগ্য ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে একটি আলোচিত সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের মৌলিক সেবা প্রদানের জন্য দায়বদ্ধ হলেও প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্নীতি ও তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব এ সেবার মানকে প্রভাবিত করছে। বস্তুত নাগরিকদের কাছে তথ্য প্রকাশ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর ওপর জনগণের আস্থা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০২১ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ খানা বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
বলা হয়ে থাকে, স্থানীয় সরকার হলো জনগণের দোরগোড়ার সরকার। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হলো মেয়াদান্তে নির্বাচনে ভোট দেয়া ছাড়া সাধারণ নাগরিকদের স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ বা চর্চা স্বাধীনতার এত বছর পর এসেও তৈরি হয়নি। যেখানে গত ১৫ বছরে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন পদ্ধতি প্রায় ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল, সেখানে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণের ন্যূনতম ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নগর কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের মতামত ও চাহিদা উপেক্ষা করে দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করে। ফলে নগর কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে, যা প্রকারান্তরে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে এক ধরনের জনবিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এছাড়া নাগরিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নেই বললেই চলে, যা স্থানীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও চর্চাকে দুর্বলতম স্থানে ঠেলে দিয়েছে।
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং প্রফেসর, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ড ও সদস্য, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ২০২৪