কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার

ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার

দক্ষ জনগোষ্ঠী ও শিক্ষা-উন্নয়ন এবং সুশাসনের রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নতুন সরকারের জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পরে বিএনপি ঘোষিত ‘ন্যায্য, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নই প্রধান লক্ষ্য। সেই আলোকে তারা প্রকাশ করেছে রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কারের ৩১ দফা রূপরেখা। এটিই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার, যার মূলমন্ত্র হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

 
 

 

শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের প্রাধান্য বিএনপির ইশতেহারের কেন্দ্রবিন্দু।

 
 
 
 

 

 

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জ অনেক।

 

 

দক্ষ জনগোষ্ঠী ও শিক্ষা-উন্নয়নের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হতে পারে অনলাইন ও দূরশিক্ষণবিষয়ক প্রতিষ্ঠান। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) দেশের একমাত্র দূরশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়, যা ‘আজীবন শিক্ষা’ এবং ঘরে ঘরে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করে। বাউবি মাধ্যমিক স্তর থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অফলাইন ও অনলাইনের মিশ্র পদ্ধতিতে নানা প্রোগ্রাম পরিচালনা করে—বয়স, অবস্থান বা পেশাগত বাধা থাকা সত্ত্বেও অগ্রসর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা দেয়।

 

 

বিএনপির শিক্ষা ও দক্ষতাসংশ্লিষ্ট ইশতেহার বাস্তবায়ন আর এই প্রতিষ্ঠানের মিশন সম্পূর্ণ পরিপূরক, যেমন—‘একদিকে বাউবি শিক্ষার বাধাগুলো দূর করে আজীবন শিক্ষা নিশ্চিত করে’। সেই সঙ্গে দেশে থাকা জনসাধারণের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও শেখার সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে বাউবি, ব্লেন্ডেড লার্নিং (সেলফ স্টাডি, ব্যক্তিগত ক্লাস, ই-লার্নিং সেন্টার, মাল্টিমিডিয়া, অনলাইন প্রভৃতি) পদ্ধতি ব্যবহার করে জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়। ফলে কর্মরত পেশাজীবী, গৃহিণী এবং দক্ষতা বাড়াতে ইচ্ছুক যে কেউ নিজের সুবিধামতো সময়ে বাউবির কোর্স করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির এই ফ্লেক্সিবিলিটি ও প্রযুক্তিনির্ভর আকার জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা থেকে কর্মজীবনে রূপান্তর সহজ করেছে।

 

 

নতুন সরকার শিক্ষা আধুনিকীকরণে বাউবিকে ব্যবহার করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় শিক্ষানীতির অধীনে বাউবিসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সংযুক্ত করে দূরশিক্ষায় দক্ষতা প্রশিক্ষণের কেন্দ্র তৈরি করা যায়। বাউবির দেশের সর্বস্তরের (জেলা-উপজেলা) একাডেমিক নেটওয়ার্ক ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বর্ধিত শিক্ষার্থী-জনগোষ্ঠীকে আনা সম্ভব। এখানে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষাও সমন্বয় করা যেতে পারে, যেমন বিশ্বের বড় বড় ওপেন ইউনিভার্সিটিগুলো করে থাকে।

 

 

এ ধরনের মডেল বর্তমানে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে এরই মধ্যে সফলতা পেয়েছে। যেমন—ব্রিটেনে দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি (’৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত) বর্তমানে প্রায় দুই লক্ষ ছাত্রছাত্রী নিয়ে ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এটির লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষাকে সর্বজনীন করে তোলা। জনসমাজের প্রতিটি অংশের জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত করা। গৃহীত ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিভিত্তিক পাঠ্যক্রমের ফলে ইউকের অর্থনীতিতে যোগ্য মানবসম্পদ জোগাতে সহায়তা করছে এবং শিক্ষার মানসম্মত প্রসারণ ঘটিয়েছে। পিপলস ইউনিভার্সিটি খ্যাত ও IGNOU (Indira Gandhi National Open University) সম্ভবত বিশ্বের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮৫ সালে গঠিত), বর্তমানে তিন মিলিয়নের ওপরে শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করে।

 

 

IGNOU প্রায় ৩৫০টির বেশি বিভিন্ন একাডেমিক প্রোগ্রাম অফার করে এবং ভারতের প্রতিটি প্রান্তে এর রিজিওনাল সেন্টার ছড়িয়ে রয়েছে। IGNOU দক্ষতা ও শিক্ষাকে একীভূত করে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে ভারতের স্কিল ডেভেলপমেন্ট মন্ত্রকের সঙ্গে IGNOU চুক্তি অনুযায়ী ৭০টি রিজিওনাল সেন্টারে স্কিল সেন্টার গড়ে তোলা হবে, যেখানে যুবকরা উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি শিল্পনির্ভর প্রশিক্ষণ (PMKVY কোর্স) পাবে। এতে শিক্ষার্থীরা স্বল্পযোগ্য দক্ষতা অর্জন করবে। IGNOU-র উপাচার্য উমা কানজিলালের মতে, এই উদ্যোগ শিক্ষাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে এবং শিক্ষার্থীকে কর্মজীবনের জন্য তৈরি করবে। IGNOU দেশের দূরবর্তী অঞ্চলে শিক্ষা পৌঁছে দিয়ে হাজার হাজার নতুন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি এই উদ্ভাবনী মডেল দেশে উদ্ভাবনী কর্মসংস্থান তৈরিতেও অবদান রাখছে।

 

 

 

ইন্দোনেশিয়ায় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (Universitas Terbuka)-এর কৃতিত্বও উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৪ সালে গঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ভর্তি ১০৪৫,৬৬৫ জন (২০১৯/২০), যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষার শক্তিশালী উদাহরণ। এটি আঞ্চলিক অফিস ও এলএনএমসহ একাধিক অংশীদারির মাধ্যমে শিক্ষাসুবিধা ছড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ ইন্দোনেশিয়ার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে : স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকার সঙ্গ দিয়ে টিউটরিয়াল ও পরীক্ষার আয়োজন, টেলিভিশন ও রেডিওতে ক্লাস প্রচার, ব্যাংক এবং ডাক বিভাগের মাধ্যমে শিক্ষার আদান-প্রদান, UNESCO ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় কোর্স সঞ্চালন করে। এ ধরনের বহুপক্ষীয় অংশীদারি দেখানো ওপেন ইউনিভার্সিটি মডেল শুধু শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে না; বরং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

 

 

 

ইন্দোনেশিয়ার UT-এর ব্যাপক সহযোগী নেটওয়ার্কও চমক দেয়। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, ব্যাংক, ডাক বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থা পর্যন্ত নানা কর্তৃপক্ষ UT-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিক্ষাসেবা পৌঁছে দেয়। এ নিয়ে বলা যেতে পারে : জাতীয় উন্নয়নে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্ষমতা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় খাতে বাজেট বরাদ্দ করে তাদের স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া উচিত। সরকারের সঙ্গেও সমন্বিত নীতি গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। ব্যক্তিগত খাত ও শিক্ষামহলের সহযোগিতায় বাউবি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান লক্ষ্যভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সুষ্ঠু ও টেকসই উন্নয়ন সাধিত হবে সন্দেহ নেই।

 

 

 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ১০০ দিনের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে নতুন সরকার একটি ইতিবাচক কর্মসংস্কৃতি এবং সরাসরি উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেখাতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, শাসনতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, নীতি সমন্বয় এবং জনমত গ্রহণযোগ্যতায় প্রথম পর্যায়ের সফলতা পরবর্তী রূপান্তরকে সুসংহত করে। এ সময়ে শিক্ষা-দক্ষতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফার রূপরেখা এবং ইশতেহারকে বাস্তবায়িত করার জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা দরকার। বাউবির মতো শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় শিক্ষাস্তম্ভকে যদি আমরা আন্তরিকতা ও দূরদৃষ্টির সঙ্গে কাজে লাগাতে পারি, তবে ই-লার্নিং ব্যবস্থাকে আরো মানবিক, প্রাণবন্ত ও সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

 

সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনই হবে সূর্যের হাসির মতো উজ্জ্বল। সুনির্দিষ্ট দক্ষতা, শিক্ষা ও সুশাসন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার প্রতিফলনে-জাতীয় অগ্রগতির নতুন পথ প্রশস্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার জনগণের আস্থা অর্জন করবে। সরকার উন্মুক্ত শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করবে আর এর মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালী কাঠামোনির্ভর সমৃদ্ধির চাকা চলমান থাকবে। তাই বর্তমান এই সময়কে সংবেদনশীলতা, জবাবদিহি ও দূরদর্শিতার মাপকাঠিতে সফল করতেই হবে। রাষ্ট্রের সব স্তরে সর্বোচ্চ সততা ও দায়িত্বশীলতা হবে প্রাথমিক প্রতিশ্রুতির সফলতা। যার বাস্তবায়নই হবে নতুন সরকারের ভবিষ্যতের দিগদর্শন।

 

 

লেখক : অধ্যাপক, গবেষক ও ট্রেজারার

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়