কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সৌদি-আমিরাত উত্তেজনা বদলে দিতে পারে ভূরাজনীতি

লেখা:রায়হান উদ্দিন ও শন ম্যাথিউস [প্রকাশ: প্রথম আলো, ০৩ জানুয়ারি ২০২৬]

সৌদি-আমিরাত উত্তেজনা বদলে দিতে পারে ভূরাজনীতি

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক নতুন বছরের শুরুতেই এক বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় মিত্র দুই দেশ এখন প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর পথে এগোচ্ছে। কিছুদিন ধরেই তেল উৎপাদন থেকে শুরু করে সুদান যুদ্ধ পর্যন্ত নানা ইস্যুতে এ দুই শক্তির মধ্যে মতবিরোধ ছিল। তবে এত দিন সেই বিরোধ খুব একটা প্রকাশ্যে আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে সেই চিত্র বদলাতে যাচ্ছে। 

 

 

মঙ্গলবার সৌদি আরব ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী আল মুকাল্লায় বোমা হামলা চালায়। রিয়াদের দাবি, সেখানে আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্ত একটি অস্ত্রের চালান ছিল, যা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের কাছে পাঠানো হচ্ছিল। এটি ছিল নজিরবিহীন এক প্রকাশ্য তিরস্কার। সৌদি আরব প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলে যে আমিরাতের আচরণ অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং তা সৌদি নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এর জবাবে আমিরাত জানায়, সৌদি আরব ভিত্তিহীন ও ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। 

 প্রায় এক দশক আগে কাতারের ওপর অবরোধের সময় উপসাগরীয় অঞ্চলে চরম উত্তেজনা তৈরি হলেও সৌদি আরব তখন কখনোই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যুক্ত কোনো শক্তির ওপর সরাসরি বোমা হামলা চালায়নি। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক চিত্র অনেকটাই নির্ধারিত হবে আবুধাবি ও রিয়াদ কীভাবে এই ক্রমবর্ধমান এবং এখন প্রকাশ্য হয়ে ওঠা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামলায় তার ওপর। 

 

 

 

বেকার ইনস্টিটিউটের গবেষক ও উপসাগর–বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান উলরিখসেন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, বহু বছর ধরেই দুই দেশের কৌশলগত পার্থক্য ছিল, কিন্তু সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা আর কাজ করছে না। ইয়েমেন ও সুদানের মতো ক্ষেত্রে সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরব ও মিসরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা হারানোর এক সংকটময় পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। 

 

 

গত মাসে মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে আসে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সুদানের র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস নামের আধা সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে আরব আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে লবিং করার পরিকল্পনা করেছিলেন। যেখানে আমিরাত ওই আধা সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে, সেখানে সৌদি আরব স্পষ্টভাবে সুদানের সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়েছে। 

 

 

ইয়েমেনের ক্ষেত্রে দুই দেশই হুতিদের বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিলেও বহু বছর ধরে আরব আমিরাত সেখানে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেয়। এরপরই এ সপ্তাহে সৌদি আরব হামলা চালায়।

 

 

 

 বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন দ্বন্দ্বের রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত অঞ্চলজুড়ে আধা সামরিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্য ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে রাষ্ট্রগুলোর বিদ্যমান সীমান্ত ও কাঠামো টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক জোট গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে।

 

 

আমিরাত বড় আকারের প্রক্সি বাহিনী মোতায়েন করতে পারলেও সৌদি আরবের বর্তমান শক্তি অন্য জায়গায়। আন্তর্জাতিক বৈধতা, কৌশলগত গভীরতা, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শেখা শিক্ষা সৌদি আরবকে এগিয়ে রাখছে। রিয়াদ বড় পরিসরের সামরিক অভিযানের পথ থেকে সরে
এসে এখন প্রতিরোধ, সীমিত চাপ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক ফল অর্জনের ওপর ভিত্তি করে কৌশল সাজাচ্ছে। 

 

 

দুই দেশের মধ্যে বিভাজনের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন। ২০২০ সালে আবুধাবি ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। 

 

 

উপসাগরীয় শক্তিগুলোর মধ্যে শেষ বড় ধরনের বিভেদের সময় সৌদি আরব ও আমিরাত একই শিবিরে ছিল। তবে সেই বাস্তবতা এখন বদলে গেছে। মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই সংঘাত কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে! 

 

 

 রায়হান উদ্দিন ও শন ম্যাথিউস, সাংবাদিক, মিডল ইস্ট আই