কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সংকটাপন্ন দেশগুলো কী পেল

[আপডেট : কালবেলা, ২৩ নভেম্বর ২০২৫]

সংকটাপন্ন দেশগুলো কী পেল

বিশ্বের বৃহত্তম বন আমাজনের ব্রাজিল অংশের বেলেম শহরে শেষ হয়েছে জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০। ‘বিশ্ব রঙ্গমঞ্চের’ সবচেয়ে বড় ‘জলবায়ু নাটকের’ ৩০তম আসর চলে ১৩ দিন। এটি ২১ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও একটি ভেন্যুতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে চুক্তির আলোচনার জন্য এক দিন বাড়ানো হয়। পুরোনো ব্যর্থতা শুধরে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ সম্মেলন শুরু হলেও কার্যত এবার দৃশ্যমান অগ্রগতি আসেনি। যদিও জাতিসংঘপ্রধান বিশ্বকে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে তাগাদা দিয়েছেন। তবে আয়োজক দেশ ব্রাজিলের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত চুক্তির খসড়ায় এর কোনো রোডম্যাপ নেই। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন ২০২৫ সালের চেয়ে তিন গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন—জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো কি সেই অর্থ পাবে, না কি আগের মতো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ আর সময়ক্ষেপণের টালবাহানা হবে? এসব নিয়ে লিখেছেন হুমায়ূন কবির

 

 

নানা আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক, ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে গতকাল শেষ হয়েছে কপ-৩০। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল কপ-৩০; কিন্তু আমাজনের প্রবেশমুখে উষ্ণ, ক্রান্তীয় তাপমাত্রার শহর বেলেমে যখন হাজার হাজার কূটনীতিক, পরিবেশকর্মী, সাংবাদিক ও লবিস্টরা সমবেত হন, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন—আলোচনার এ মহামঞ্চ কি কেবলই একটি ‘ভঙ্গুর’ প্রতিশ্রুতির কারখানা?

 

 

তিন বছর আগে যখন ব্রাজিলকে এ জলবায়ু আলোচনা আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন থেকেই প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। যে দেশটিতে ধরিত্রী সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল, সেই আমাজন-তীরবর্তী ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ সত্যিই জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি মোড় ঘুরিয়ে দেবে বলে আশা করা হয়েছিল; কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনার এই ৩০তম সংস্করণটি পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতোই হতাশাজনক পরিণতির পুনরাবৃত্তি করতে চলেছে। কারণ কপ-৩০-এর মধ্যে অর্জন যতটা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু সংকটাপন্ন দেশগুলোর অপ্রাপ্তির বোঝাটা তার চেয়ে বেশি ভারী। কারণ, সম্মেলন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থ প্রাপ্তির কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। অধিক মাত্রায় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ দেখবে, মর্মে প্রতিশ্রুতি দিলেও গত কয়েক বছরে প্রতিশ্রুতি পূরণে আন্তরিকতা দেখা যায়নি।

 

 

দ্য গার্ডিয়ানকে প্যারিস চুক্তির একজন স্থপতি বলেছেন, শুক্রবারও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। আলোচনা শনিবার গড়িয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দূরে সরে আসার জন্য রোডম্যাপ তৈরির যে কোনো চুক্তি থেকে অনেক দূরে দেশগুলো। অথচ জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে দেশগুলোর ভয় পাওয়া উচিত নয়। তারা তাদের নিজস্ব জাতীয় পরিস্থিতি অনুসারে নিজস্ব পথ নির্ধারণ করতে সক্ষম হবে।

 

 
 

এখন কপ-৩০ কি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমিয়ে আনতে পারবে, না কি বিশ্বের সবচেয়ে বাজে ‘টক শো’তে পরিণত হবে—সে প্রশ্ন তুলেছে গার্ডিয়ান।

 

 

এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সরবরাহে সম্মিলিত ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে সম্মেলনে।

 

 

এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রতিশ্রুতি পূরণে কপ নানা মাত্রায় ব্যর্থ হয়েছে। কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের জন্য যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটি বৈশ্বিক লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় তহবিল জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

 

এবারের কপ-৩০-তে বহু বিষয় প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। এর মধ্যে জলবায়ু-সংক্রান্ত দুর্যোগ, সংঘাত ও দারিদ্র্যের কারণে গত এক দশকে অন্তত ২৫ কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি, বৈশ্বিক মানবিক সংকট গভীরতর হয়েছে। ফলে ইউএনএইচসিআর দ্রুত ও ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়নের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো। এদিকে, এবারের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০-তে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রশাসনের অনুপস্থিতি, চীনের কৌশলগত ভূমিকা, ভারতের কঠোর অবস্থান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ চাপ কপ-৩০-এর আলোচনা আরও জটিলতর করে তুলেছিল। অন্যদিকে, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা, শক্তিশালী এনডিসি, ঋণমুক্ত জলবায়ু অর্থায়ন এবং বাকু-টু-বেলেম রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য জোরালো দাবি ওঠে। সব মিলিয়ে জলবায়ু রাজনীতিতে টানাপোড়েন ও নতুন পথ খুঁজছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

 

উন্নত দেশগুলোর অবস্থানে হতাশ: কপ-৩০-এর আলোচনায় শিল্পোন্নত দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার ও সহজতর অর্থায়ন প্রক্রিয়াসহ বেশ কিছু প্রয়োজনীয়তার বিষয় ফুটে ওঠে। সম্মেলনে ইএমডিসি দেশগুলোর প্রতি বছর ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা ২০৩৫ সালে ৩ দশমিক ২ ট্রিলিয়নে পৌঁছাবে। অথচ ২০২৩ সালে সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১৯৬ বিলিয়ন ডলার।

 

 

ব্রাজিলের ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ) ১২৫ বিলিয়ন ডলারের বন সংরক্ষণ প্রস্তাব তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কপ-৩০ কি জীবাশ্ম জ্বালানি রূপান্তরের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ দিতে সক্ষম?

 

 

এবার কপ নেতারা অভিযোজন ব্যয় তিনগুণ বাড়িয়ে ১২০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছেন। এর আগে কপ-২৯ এ উন্নত দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে জলবায়ু অর্থায়নে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিষয়ে সম্মত হয়েছিল, তবে এটি একেবারে সবকিছু মিলিয়ে। অথচ এর থেকে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য অনেক বেশি তহবিল প্রয়োজন। এটিই সবচেয়ে হতাশাজনক দৃশ্য।

 

 

জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে তীব্র মতবিরোধ : শুরুর প্রথম দিনগুলোয় জলবায়ু অর্থায়ন রোডম্যাপ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আগের ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া, ২০২৫ সালের পর নতুন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, ঋণের পরিবর্তে গ্রান্টভিত্তিক (অনুদান) সহায়তার দাবি জোরালোভাবে সামনে আসে। এ ছাড়া লস অ্যান্ড ডেমেজ ফান্ড কীভাবে পরিচালিত হবে, কোন দেশ কত অবদান রাখবে, কয়টি দেশ এ সুবিধা পাবে, এসব প্রশ্ন তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো জরুরি সহায়তা তহবিল দ্রুত অনুমোদনের দাবি জানায়। কারণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও উপকূল ভাঙনের কারণে তাদের জীবিকা চরম সংকটে।