সংবিধান থেকে ইহজাগতিকতা বাদ পড়ছে কেন
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী [প্রকাশ: সমকাল, ২৯ নভেম্বর ২০২৫]

রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের ফর্দ হিসেবে যে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে, তাতে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম রাখা হয়নি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের যে সংবিধান গৃহীত হয়, তাতে অন্য তিনটি মূলনীতির (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র) সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতাও ছিল। এখনও ওই চার মূলনীতি আছে। তবে জুলাই সনদ হুবহু কার্যকর হলে ওই তিন মূলনীতির সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতাকেও বিদায় নিতে হবে। তার জায়গায় বসবে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটা সুস্থির ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য। তবে তা কোনো যুক্তিতেই ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজমের বিকল্প হতে পারে না।
সেক্যুলারিজমের প্রকৃত অর্থ ইহজাগতিকতা। সেক্যুলারিজমের ধারণাটি আমরা আধুনিক ইউরোপ থেকে পেয়েছি। যদিও সেক্যুলারিজম ব্যাপারটা আমাদের এ অঞ্চলে আগেও ছিল; অনেক আগে। ইহজাগতিকতা নাস্তিকতা নয়। নাস্তিক বলা হয় সাধারণত ইহজাগতিকদের ঘায়েল করার জন্য। বস্তুত নাস্তিক না হয়ে তো বটেই, এমনকি ধর্মবিশ্বাসী হয়েও ইহজাগতিক হওয়া যায়। আধুনিক ইউরোপে ওই প্রত্যয় প্রতিষ্ঠার পেছনে যার ভূমিকা বেশি উল্লেখযোগ্য, তিনি হচ্ছেন ফ্রান্সিস বেকন। বেকন মোটেই নাস্তিক ছিলেন না। নাস্তিকতার তিনি বরং বিরোধিতাও করেছেন তাঁর লেখাতে। কিন্তু তিনি অত্যন্ত ইহজাগতিক ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল– ঈশ্বর আছেন, তিনি থাকবেনও। কিন্তু ঈশ্বরকে থাকতে দিতে হবে তাঁর নিজের জায়গায়। তাঁকে জাগতিক কাজকর্মের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা চলবে না। ওই মিশিয়ে ফেলাটা ভুল এবং ক্ষতিকর। ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাসের ব্যাপার, আর জগৎ চলে প্রাকৃতিক নিয়মে। জগতের চালিকাশক্তি ধর্মবিশ্বাস নয়; চালিকাশক্তি নানা ধরনের দ্বন্দ্ব। বিশ্বাসের দরকার আছে, যুক্তিবুদ্ধিরও দরকার আছে, কিন্তু তাদেরকে সংমিশ্রিত করে ভেজাল উৎপাদন খুবই অন্যায়।
আমাদের সংবিধানে সেক্যুলারিজমকে বলা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। এর মূল ব্যাপারও ওইটাই– রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মকে মিলিয়ে না-ফেলা। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা নাগরিকদের এই পরামর্শ দেয় না– তোমাদের ধর্মহীন হতে হবে। আবার এমন কথাও বলে না– রাষ্ট্র কোনো ধর্মচর্চাকে উৎসাহিত করবে। রাষ্ট্র নিজে একটি ধর্মহীন প্রতিষ্ঠান। ধর্মবিশ্বাস নাগরিকদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। রাষ্ট্রের ওই ধর্মহীনতাকেই কিছুটা নম্র করে বলা হয় ধর্মনিরপেক্ষতা।
ইহজাগতিকতা হুবহু বস্তুতান্ত্রিকতা নয়। কিন্তু বস্তুতান্ত্রিকতা থেকে খুব যে দূরে, তাও নয়। জগৎ সত্য। সে অত্যন্ত বাস্তবিক। কিন্তু এই বাস্তবিক সত্যকে খাটো করে দিতে চায় ইহজাগতিকতার শত্রুপক্ষ। তারা ধর্মকে টেনে নিয়ে আসে সামনে। ধর্মবিশ্বাসের পেছনে একটা ভয় থাকে– পরকালের ভয়; অজানাকে ভয়। ইহজাগতিকতার বিরুদ্ধ পক্ষ ওই ভয়কে কাজে লাগায়। তারা নিজেরাও অবশ্য ভীতু। তাদের সবচেয়ে বড় ভয় স্বার্থহানির। প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সঙ্গে যাদের জাগতিক স্বার্থ জড়িত তারা ধর্মকে ব্যবহার করে থাকে নিজেদের শাসন-শোষণ নিপীড়ন তথা কায়েমি স্বার্থ রক্ষার যে চেষ্টা তারা করে, তার আচ্ছাদন হিসেবে। ঈশ্বরই এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছেন– কেউ বড় হবে কেউ ছোট। এটাই ধর্মের বিধান বলে তারা প্রচার করে। ইহজাগতিকতা যদি ধর্মের এ আচ্ছাদন সরিয়ে দেয় তাহলে কায়েমি স্বার্থওয়ালাদের কদর্য কাজ উন্মোচিত হয়ে পড়বে– এই ভয়ে তারা ইহজাগতিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। দরকার হলে যারা ইহজাগতিক তাদের তারা জব্দ করে। হত্যাও করেছে, ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে।
সাধারণ মানুষ ধর্মের কাছে যায় কেবল ভয়ে নয়, ভরসাতেও। এই জগতে বিচার নেই; পরজগতে তারা বিচার আশা করে। জগতে নির্ভর করা যায় এমন শক্তি নেই। মানুষ তাই পরজগতের দিকে তাকিয়ে থাকে। কায়েমি স্বার্থের সংরক্ষক ও তাদের চেলাচামুণ্ডারা মানুষের ওই ধর্মবাদিতাকেও ব্যবহার করে থাকে কায়েমি স্বার্থে। ইহজাগতিকতার শত্রুপক্ষ মুখে যা-ই বলুক না কেন, কার্যক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত ইহজাগতিক। বিষয়সচেতন। ইহজাগতিকতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠিত স্বার্থের রক্ষকদের দ্বন্দ্বটা খুবই স্বাভাবিক। বঞ্চনাকারীরা বঞ্চিতদের সঙ্গে শত্রুতা করবেই। কিন্তু পরিহাসের বিষয় এই, বঞ্চনাকারীরা বঞ্চিতদের তাদের পক্ষে নিয়ে নেয়। এই নেবার ক্ষেত্রে ধর্ম খুবই উপকারে আসে, তাদের জন্য। চেষ্টা করা হয় রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মকে মিলিয়ে ফেলবার।
ভারত একটি ইহজাগতিক রাষ্ট্র। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়ে সেখানে হিন্দু মৌলবাদীরা চেষ্টা করছে রাষ্ট্রকে ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করতে। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো কোনো দেশে ধর্ম ও রাষ্ট্র এক হয়ে গেছে। কেবল সৌদি আরবে নয়; ইসরায়েলেও। ইসরায়েলে বরঞ্চ বেশি সংখ্যায় ঘটেছে এই ব্যাপার। ওই রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ই ঘটেছে একটি ধর্মীয় মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের একনিষ্ঠ সমর্থক।
এ সত্য ভুলবার উপায় নেই যে, সভ্যতা একটি ইহজাগতিক ব্যাপার। এর অগ্রগতিতে অতীতে ধর্মের একটি প্রগতিশীল ভূমিকাও ছিল। কেননা, ধর্ম তখন বিদ্রোহ করেছে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। খ্রিষ্ট ও ইসলাম উভয় ধর্মই এসেছিল নিপীড়িত মানুষের অগ্রাভিযানের সাহায্য করবার অঙ্গীকার নিয়ে। কিন্তু পরে কায়েমি স্বার্থবাদীরা উভয় ধর্মকেই ব্যবহার করেছে নিজেদের নোংরা স্বার্থে এবং দুই ধর্মের মধ্যে লড়াই বাধাবার চেষ্টারত ধর্মের আধ্যাত্মিক স্বার্থে নয়, নিজেদের বস্তুগত স্বার্থে। ফলে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের সময় থেকে ইহজাগতিকতার যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল, এখন তা নতুন করে বিঘ্নিত হচ্ছে।
ইহজাগতিকতার আরও একটি শত্রু রয়েছে। সেটি হলো মানুষে মানুষে বৈষম্য। কায়েমি স্বার্থওয়ালারা নিজেদের ধনী করতে গিয়ে অধিকাংশ মানুষকে গরিব করে রাখে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পথ দুটি– একটি গেছে বামে, অন্যটি ডানে। বামপন্থিরা ইহজাগতিক, তারা গণতন্ত্রী: ডানপন্থিদের অধিকাংশই ধর্মীয় মৌলবাদী। বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র ইহজাগতিকদের ওপর পীড়ন চালায়। ফলে সুবিধা হয় ধর্মীয় মৌলবাদীদের। তারা প্রধান প্রতিবাদকারী হয়ে উঠতে চায়। বিশ্বজুড়ে আজ এ ঘটনাই ঘটছে।
সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ছিল ইহজাগতিক। পুঁজিবাদী বিশ্বও নিজেকে ইহজাগতিক বলে প্রচার করে। কিন্তু দুয়ের মধ্যে মৌলিক ব্যবধান রয়েছে। প্রথম কথা হলো এই, পুঁজিবাদীরা দারিদ্র্য সৃষ্টি করে, আর দরিদ্র মানুষ বাধ্য হয় ধর্মের কাছে ছুটতে। দ্বিতীয় সত্য এটা যে, পুঁজিবাদীরা ভোগবাদী; দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ নিজেদের ভোগ থেকে বঞ্চিত দেখে পরকালে স্বর্গ পাবে– এই আশার মধ্যে সান্ত্বনা খোঁজে। তৃতীয়ত, পুঁজিবাদীরা মৌলবাদীদের সরাসরি উৎসারিত করে ডানপন্থি হতে; আর ডান দিকে এগোলে মৌলবাদী হতে যে খুব একটা বিলম্ব ঘটে, তা তো নয়।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়