সংবিধান না নির্বাচন কমিশনার সংস্কার
বিশ্ববাসী দুটি যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছে। একটি ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে- এ যুদ্ধে ন্যাটোসহ পরাশক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকাও জড়িয়ে আছে। অপর যুদ্ধটি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে হলেও মূলত ইরান-ইসরায়েল এবং আমেরিকা ও ন্যাটো জড়িয়ে আছে। এখন নতুন করে আক্রান্ত লেবানন ইসরায়েলের হাতে। অভিযোগ হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি রয়েছে লেবাননে। ওই ঘাঁটি থেকে ইসরায়েলের ওপর বারেবারে হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে হিজবুল্লাহপ্রধান সাঈদ হাসান নাসারুল্লাহ সপরিবার নিহত হন। ইরানে হামলা চালিয়ে হামাসপ্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা করা হয়। গত সোমবার গাজায় হামলার এক বছর পূর্তি হয়। এ যুদ্ধে ইসরায়েল তার শক্তিমত্তা প্রকাশ করে। এবং তাদের নৃশংসতায় এমন ছিল যে, হামাসের ৪ হাজার নিশানা, ৪ হাজার ৭০০ সুড়ঙ্গ, ১ হাজার রকেট উৎক্ষেপণ স্থল খুঁজে ধ্বংস করে। এছাড়া হামাসের ৮টি ব্রিগেড ও ৩০টি ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে হত্যা করে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরো একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করারও অভিযোগ আছে। সর্বশেষ গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ওখানে গাজাবাসীদের মাথা গোঁজাবার কোনো অবশিষ্ট স্থান অক্ষত নেই, তারা এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞও চালায়। এ পর্যন্ত ৬০ শতাংশ নিরীহ ও নিরস্ত্র গাজাবাসীর বাড়ি-ঘর, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রাণ হারিয়েছে নারী-শিশুসহ ৭০ হাজারও অধিক ফিলিস্তিনি নাগরিক। এছাড়া ইরানের প্রধানমন্ত্রীসহ সাবেক এক বিল্পবী সেনাপ্রধান ও কয়েকজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী প্রাণ হারান। এ অবস্থায় নতুন করে পারমাণবিক হামলারও আশঙ্কা করছে ইরান। সব মিলে বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। এমতাবস্থায় অভ্যন্তরীণ অবস্থা চরম পর্যায়ে ঠেকেছে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। বর্তমান সরকারপ্রধান হিসেবে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। তার সমর্থনে রয়েছে ছাত্র আন্দোলনের একঝাঁক তরুণ সেনানি এবং ডান-বামসহ বেশ কয়েকটি সাইনবোর্ড সর্বস্ব রাজনৈতিক দল। তবে আপাতদৃষ্টিতে সেনা-জোয়ানরা নিয়ামক শক্তি হিসেবে অগ্রভাগে আছেন। এমনকি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্র্যাসি ক্ষমতা নিয়ে যৌথ অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাস দমনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন সেনারা। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুই মাস অতিক্রম হয়। তারা রাজনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আনতে ব্যাপক তৎপর রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও ঔদ্ধত্যপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল চায় জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ, আবার কিছু রাজনৈতিক দল চায় নির্বাচনের আগে সংস্কার। এ সংস্কার নিয়ে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা ইসলামি দলগুলো মাঠে সোচ্চার রয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি চায় নির্বাচনের রোডম্যাপ। অনেকটা গ্যাঁড়াকলে রয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উর-জামান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ১৮ মাসের মধ্যে সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। এর পাল্টা জবাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাতীয় নির্বাচন কবে হবে না হবে, তা জানান দেয়ার একমাত্র এখতিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের।
দ্বিতীয় পদ্ধতি অবরোহ : আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারপর নির্বাচিত সরকার ধাপে ধাপে উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন করার সাংবিধানিক এখতিয়ার জন্মায় তাদের। তবে এসব কর্মযজ্ঞের আগেই নির্বাচন কমিশনারকে ঢেলে সাজানো উচিত। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনারকে একচ্ছত্র ক্ষমতায়ন করা এবং দৃঢ়চেতা ও নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান হওয়া।
অবশ্য বিএনপিসহ অন্য সমমনা দলগুলো এ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়ে আসছে। ক্ষমতাসীনরা বরাবরই তা উপেক্ষা করে। যার ফলে উদ্ভব হয় এ পরিস্থিতি। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনেকটা কাছাকাছি-অর্থবহ বলা যায়, যা কিনা মুদ্রার এপিট আর ওপিট। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পরপর দুটি কলাম প্রকাশিত হয়, ২০২৩ সালের ২০ ও ২৬ জুলাই ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায়। ওই কলামে দু-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের কথা বলা হয়। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ওই পার্লামেন্টের আসন সংখ্যা হ্রাস দেখানো হয়। মূলত নির্বাচনের ব্যয় কমাতে এ আসন সংখ্যা কম দেখানো হয়। এছাড়া এর আরেকটি কারণ হলো- জনমত উপেক্ষিত হওয়ায় বা জনপ্রতিনিধিত্বতা হ্রাস পাওয়ায় এ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। অবশ্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ব্যবস্থায় সরাসরি গণভোটে নির্বাচন দেখানো হয়েছে জাতীয় সংসদের সভ্যদের। মূলত রাজস্ব ব্যয় কমাতে গিয়ে এ লাগাম টানা। অন্যদিকে অপর দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের স্বরূপ হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠদের জবাবদিহিতা ও তৃণমূলে ক্ষমতায়ন। তারা অনুপাত হারে প্রতিনিধি বা আসন বণ্টন করার সুযোগ পাবে। এ গঠনপ্রণালি বা কার্যকারিতা বিস্তারিতভাবে ওই কলাম দুটিতে তুলে ধরার চেষ্টার কমতি ছিল না। তবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট সম্পর্কে আরো অপরাপর রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ অভিমত বা রূপরেখা দিয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত অভিমত ও রূপরেখা সম্পূর্ণভাবে স্বতন্ত্র বা ভিন্ন অর্থে উঠে এসেছে। প্রাণপণ চেষ্টা করা হয়েছে যেন জনমত উপেক্ষিত না হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় যে বিষয়টি জোরালোভাবে এসেছে, সংবিধান পুনর্লিখন বা সংশোধন করা। এ দুটির কোনোটিও সহজসাধ্য ব্যাপার নয়- যাতে কিনা রাতারাতি সংবিধানে আঁচড় বসাবে; প্রথমত, এ জন্য লাগবে প্রেক্ষাপট, অর্থাৎ কোন প্রেক্ষাপটে কী কী পরিবর্তন-পরিবন্ধ করা যেতে পারে।
১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে দেশের সংবিধান লেখার উদ্যোগ নেয়া হয়। বলতে গেলে, ৫৬ হাজার বর্গকিলোমিটার ভৌগোলিক এলাকাকে নিয়ে- দেশের জলবায়ু, প্রকৃতি-পরিবেশ এবং আবহাওয়া, নদ-নদী, সাগর, মহাসাগর, বন-জঙ্গল, পাহাড়-সমতল, মৃত্তিকা এবং এর ধরন-গঠন-পঠনসহ সর্বোপরি জীবজন্তু, জনবসতি এবং জাত-পাত-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়, ধর্ম-বর্ণ ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনধারাসহ স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্তি থাকাটা আবশ্যিকতা রয়েছে। আয়-রোজগারের দিকটাও দেখতে হবে। তাছাড়া সীমান্তবর্তী দেশ, উপ-মহাদেশে, মহাদেশ, ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশকেও ভাবনা-চিন্তায় আনতে হবে। এভাবে হাজারো বিষয়ে চিন্তা করেই কলমের কালি লেপ্টানো বা বিন্দু-হরফ বসানো। অবশ্য অধিকতর চিন্তা করতে হবে, তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের অবস্থানও। রুটি-রুজির জন্য একদেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া-আসার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। যা কিনা রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। এসব বিষয় কোনোভাবেই হেরফের হওয়ার সুযোগ নেই, তা হলে মহাবিপদ বা গলার কাঁটা হয়ে যাবে সংস্কার বা সংবিধান পরিবর্তন করার এ মানস। সঙ্গে মনে রাখতে হবে, মৌসুমি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য- এ অঞ্চলের মানুষ সহজাত সহজ-সরল ও একরোখা। এই দেখা যাচ্ছে চরম উত্তপ্ত পরিবেশ, আবার ক্ষণিকে শীতল। অর্থাৎ ফিরতে গোল্লা মারতে ঢাং; নারী-পুরুষ একই স্বভাবের। খুব বেশি রক্ষণশীল তা-ও না, আবার খুব বেশি যে উদার তা-ও না। এসব মনমেজাজ খেয়াল রেখেই এগিয়ে যাওয়া, নয়তো চরম নিষ্ঠুর পরিণতি ঝুলে আছে কপালে! বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকারীদের একজন ড. কামাল হোসেন। তিনি এখনো জীবিত আছেন। অবশ্য সংবিধান রচয়িতার মধ্যে দ্বিতীয় অন্য কেউ বেঁচে আছেন কিনা জানি না। আমার ক্ষুদ্র নলেজে তা জানা নেই, বেঁচে থাকলে তাদেরও পরামর্শ নিতে পারেন। বাংলাদেশের সংবিধান যে ভিত্তির ওপর রচিত হয়েছে- ১. গণতন্ত্র, ২. সমাজতন্ত্র, ৩. বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ৪. ধর্মনিরপেক্ষতা। এ চারটি মূলনীতি ছিল প্রতিপাদ্য বিষয়। এরপর বহুবার সংবিধান কাটছাঁট, কর্তন-সংশোধন-সংযোজন করা হয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম সংশোধনীও আনা হয়েছে! সঙ্গে বিসমিল্লাহসহ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযোজন করা হয়েছে। তবে এসব সংশোধনীতে পার্লামেন্টের এক-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ কণ্ঠভোট বা হাত তোলাতুলিতে পাস হয়। অন্যথায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায়ও এ ধরনের সংবিধান পরিবর্তন বা বিল পাস করার বিধিবিধান নেই। তবে হালনাগাদ রেজিঃপ্রাপ্ত দল ব্যতীত সব দলই বর্তমান সংবিধানের অধীনে সব কার্যাদি সম্পাদনা করাসহ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। কই কখনো সংবিধান বাতিলের কথা বা দাবি আসেনিতো।
মিঞা জামশেদ উদ্দীন : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক (কবি ও সাংবাদিক)।