কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সনদকে সংবিধানের অংশ করার প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক [সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫]

সনদকে সংবিধানের অংশ করার প্রস্তাব

রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে প্রস্তাবিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এ বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সর্বশেষ গতকাল সোমবার কমিশনের বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার জুলাই সনদ ও সনদ বাস্তবায়নে কমিশনের প্রস্তাবের কপি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে। সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামী প্রস্তাবিত সাংবিধানিক আদেশের বিষয়ে বেশির ভাগ আইন বিশেষজ্ঞ একমত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

 


সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় এবং বিতর্ক এড়াতে সনদে অঙ্গীকারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাস্তবায়ন পদ্ধতি মূল সনদে না রেখে আলাদাভাবে সরকারকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে লিখিত মতামত জানতে চাওয়া হয়। ২৮টি দলের দেওয়া লিখিত মতামতে সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে তীব্র মতবিরোধ উঠে আসে।

 


এ বিষয়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ গতকাল লিখিত মতামত দিয়েছেন। এ ছাড়া গত রবিবার আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠকে ওই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন কমিশনের সদস্যরা। ওই বৈঠকে গণভোটকে সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য বলে আলোচনা হলেও বিদ্যমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক আদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন বেশির ভাগ আইনজ্ঞ; যে প্রস্তাবটি ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামীর।
কমিশনকে দেওয়া লিখিত মতামতে জামায়াতের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের প্রস্তাব করা হয়।

 

 

সেটা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রপতির অস্থায়ী সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিকল্প প্রস্তাব করে দলটি। লিখিত প্রস্তাবে এসংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়কালের তিনটি নজিরের কথা উল্লেখ করা হয়। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক আদেশ জারি করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সময়কালে সাংবিধানিক ফরমান জারি করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, অস্থায়ী সংবিধান আদেশ হচ্ছে একটি জরুরি ও সংবিধানবহির্ভূত আদেশ, যা একটি দেশের সংবিধানকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে।

 


এই আদেশটি জরুরি পরিস্থিতিতে জারি করা হয়, যখন সংবিধান কার্যকর থাকা সম্ভব হয় না এবং এটি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।
১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধান আদেশ, ১৯৭২’ জারি করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের চূড়ান্ত সংবিধান প্রণয়নের পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি অস্থায়ী আইন হিসেবে কাজ করে। এই আদেশের মাধ্যমে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত গণপরিষদের দায়িত্ব নির্ধারিত হয় এবং এর মাধ্যমে একটি সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

 

 

গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের কমিশন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে জুলাই সনদ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনার পাশাপাশি ছোটখাটো ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে আজ মঙ্গলবার সনদের চূড়ান্ত কপি রাজনৈতিক দলগুলোকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য কমিশন) মনির হায়দারের সঞ্চালনায় ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, সফর রাজ হোসেন ও ড. মো. আইয়ুব মিয়া।

 

 

বৈঠক শেষে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কে প্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনায় বৈঠক করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মতামতগুলোও বিশ্লেষণ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

 

 

সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত ২০ মার্চ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত দুই দফায় ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে। সেসব আলোচনা থেকে প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে ১৬ আগস্ট জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর খসড়া উপস্থাপন করা হয়েছিল। খসড়ায় ভূমিকা, ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের তালিকা এবং একটি অঙ্গীকারনামা ছিল। অঙ্গীকারনামায় জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, সনদের বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না এবং সনদের ব্যাখ্যার ভার সুপ্রিম কোর্টের ওপর দেওয়াসহ মোট আটটি বিষয়ে অঙ্গীকার করার কথা উল্লেখ ছিল। তবে এই তিনটি বিষয়ে বিএনপিসহ বেশির ভাগ দলের জোরালো আপত্তি ছিল। সনদের চূড়ান্ত খসড়ায় এই তিনটি ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। জুলাই সনদকে সংবিধানের তফসিল হিসেবে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

 

 

সূত্র জানায়, জুলাই সনদের যেসব সংস্কার প্রস্তাব অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো কোনো কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে নির্বাহী আদেশ ও অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। সংবিধানসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো যথোপযুক্ত প্রক্রিয়ায় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক আদেশের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের পদ্ধতি জুলাই সনদের অংশ হবে না। এটি সরকারকে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ বা পরামর্শ হিসেবে দেবে কমিশন। যেসব সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (আপত্তি বা ভিন্নমত) আছে, সেগুলোও সনদে উল্লেখ থাকবে।

 

 

ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানান, সনদের খসড়ায় রাজনৈতিক দলগুলো ও বিশেষজ্ঞরা যে মতামত দিয়েছেন, তা সমন্বয় করা হয়েছে। এখন সনদের কপি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হবে। সনদ বাস্তবায়নে রূপরেখা আলাদাভাবে দেওয়া হবে। এ নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে সনদ স্বাক্ষরের কাজ সম্পন্ন করা হবে।

 

 

উল্লেখ্য, জুলাই সনদ প্রণয়নে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গত ১২ ফেব্রুয়ারি গঠিত সাত সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু করে। ছয় মাস মেয়াদ শেষে কমিশনের মেয়াদ আরো এক মাস বাড়ানো হয়।