স্নায়ুযুদ্ধের কবলে বাংলাদেশ
মেজর (অব.) মনজুর কাদের [প্রকাশ : যুগান্তর, ১১ জানুয়ারি ২০২৬]

ফ্ল্যাশ ব্যাকে প্রথম স্নায়ুযুদ্ধের লোমহর্ষক এবং ভয়াবহ দৃশ্যগুলো সামনে আনলে বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে দেখতে পারবেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী শক্তিগুলো কী করেছিল। ১৯৪২ সালের ১১ জুন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী সামরিক চুক্তি সই হওয়ার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে দেশ দুটি মিত্র হিসাবে একে অপরের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে। ১৯৪৫ সালে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের পতন হয়।
কেক কাটার মতো ভাগাভাগি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পরপরই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে ‘কেক কাটার মতো ভাগাভাগি’ করে। তারা ইউরোপকে দুটি প্রধান প্রভাববলয়ে বিভক্ত করে, যাকে চিহ্নিত করা হয় পশ্চিম (মার্কিন প্রভাবাধীন) ও পূর্ব (সোভিয়েত প্রভাবাধীন) ইউরোপ হিসাবে যা ‘ঠান্ডা যুদ্ধে’র (স্নায়ুযুদ্ধ) সূচনা করে। জার্মানিকে চারটি অংশে এবং বার্লিন শহরকেও দুভাগে ভাগ করা হয়। এ বিভাজন মূলত সামরিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক আধিপত্যের ভিত্তিতে হয়েছিল, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপে তার প্রভাব বিস্তার করে, পশ্চিম ইউরোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মাধ্যমে তার প্রভাব ধরে রাখে।
বিভাজনের মূল কারণ ও প্রক্রিয়া
জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিভাজন হয়। জার্মানি এবং এর রাজধানী বার্লিনকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন চারটি করে দখলদার অঞ্চল হিসাবে ভাগ করে নেয়, যা বিভাজনের একটি সুস্পষ্ট প্রতীক হিসাবে গণ্য হয়। এরপর শুরু হয় আদর্শিক সংঘাত। পশ্চিমা গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে (যেমন পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া) কমিউনিস্ট পার্টিশাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা করে, যা এ অঞ্চলকে সোভিয়েত প্রভাববলয়ে নিয়ে আসে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানের পর দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন গোটা পৃথিবীকে তাদের প্রভাবিত এলাকা হিসাবে ভাগ করে নেয়।
ন্যাটো ও ওয়ারশ চুক্তি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোকে নিয়ে ন্যাটো গঠিত হয় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্ররা ওয়ারশ চুক্তি গঠন করে, যা ইউরোপকে দুটি সামরিক ব্লকে বিভক্ত করে।
ট্রুম্যান ডকট্রিন
১৯৪৭ সালে ট্রুম্যান ডকট্রিন ঘোষণার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সাম্যবাদের বিস্তার রোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নামে, যা ঠান্ডা যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায় এবং ইউরোপের বিভাজনকে আরও সুদৃঢ় করে। কেক কাটার মতো একটি সরল ভাগাভাগি করে কেক উপভোগের বদলে ইউরোপ এবং বিভিন্ন দেশে দুটি পরাশক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যা ‘লোহার পর্দা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
সামরিক অভ্যুত্থান পালটা অভ্যুত্থান
প্রথম স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যুত্থান, পালটা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। গণতন্ত্রের বদলে পরাশক্তিগুলোর কাছে সামরিক শাসন প্রিয় হয়ে ওঠে। এসময় অনেক দেশের মানচিত্র বদলে যায়, ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে অনেক দেশ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বিভক্তি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন হয় এ সময়।
কিসিঞ্জার ডকট্রিন
কিসিঞ্জার ডকট্রিনের মাধ্যমে বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে ১৯৭১ সালে পুঁজিবাদের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কমিউনিস্ট পার্টিশাসিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ঐক্য হয়। এর ফলে আফগান যুদ্ধে পাকিস্তানের সহায়তায় সোভিয়েতের বিশাল সামরিক বাহিনীর পরাজয় ঘটে, ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে, সোভিয়েত অঞ্চলে ১৫টি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় এবং একইসঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। বিশ্ব এককেন্দ্রিক হয়ে ওঠে-যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়।
আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য
সোভিয়েত পতনের পর আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য যে শুধু বিশ্বে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিয়েছে তা নয়, বরং বলা চলে বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যটাও আর থাকেনি। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার এক দশক পর উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মাধ্যমে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখে (৯/১১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হেডকোয়ার্টারের অংশ এবং নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংস হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করে, হামলার জন্য মুসলিম দেশগুলোকে দায়ী করে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে মোকাবিলা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সমাজতন্ত্রবিরোধী ইসলাম ধর্ম ব্যবহার করে। সোভিয়েতের পতনের পর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, যুক্তরাষ্ট্র তখন বন্দুকের ব্যারেল ঘুরিয়ে দেয় মুসলিম দেশগুলোর দিকে। এ অবস্থা চলতে থাকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত।
নতুন স্নায়ুযুদ্ধ
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন ১৯৭১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় অবকাঠামো নির্মাণ এবং দ্রুত শিল্পায়নের দিকে নজর দেয়। বিশ্বের ১ নম্বর অর্থনৈতিক দেশ হিসাবে চীন যখন ২০১৭ সালে আবির্ভূত হতে যায়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশ ফেরে। দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ (নতুন স্নায়ুযুদ্ধ) শুরু করে। ১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধে পরাজিত রাশিয়া সাবেক কেজিবির চৌকশ অফিসার ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে সুযোগ খুঁজতে থাকে প্রতিশোধ নেওয়ার। ২০১৭ সালে বাণিজ্য যুদ্ধে রাশিয়া ঐক্যবদ্ধ হয় চীনের সঙ্গে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণকারী ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে প্রথম স্নায়ুযুদ্ধের বইয়ের মলাট পরিষ্কার করে গভীর ধ্যানে তা পড়তে থাকেন। গত স্নায়ুযুদ্ধের সময় যত ভয়াবহ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, সেগুলো রিপাবলিকান সরকারের আমলেই নেওয়া হয়েছে। অভাবনীয়ভাবে রিপাবলিকান ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পেছনের রহস্য এখন উন্মোচিত হতে চলেছে।
ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রমণ করায় স্নায়ুযুদ্ধ তীব্র হলো
যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরে দাবি করে আসছে, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অবৈধভাবে কারচুপি করে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেশজুড়ে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত আছেন। অন্যদিকে ভেনিজুয়েলা সরকার বলে আসছে যে, প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ এবং ভেনিজুয়েলার তেলের মজুত নিয়ন্ত্রণ করতেই যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে। ভেনিজুয়েলায় ৩ জানুয়ারি, ২০২৬-এর ভোরে ‘বড় পরিসরে’ যুদ্ধবিমান হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে গ্রেফতার করার বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
১৯৪৬-১৯৯১-এর প্রথম স্নায়ুযুদ্ধের সময় এ ধরনের অপারেশন বিভিন্ন দেশে অহরহ ঘটে। নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিমত্তা পৃথিবীকে এখন জানিয়ে দিল।
ওয়াশিংটন গোলার্ধীয় শক্তি পুনরায় দাবি করছে : রাশিয়া ও চীনের প্রতিক্রিয়া
ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়েছে। এটা উদ্বেগজনক এবং নিন্দনীয়। বিবৃতিতে বলা হয়, এ হামলাকে ন্যায্যতা দিতে যে অজুহাত দেখানো হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা ভেনিজুয়েলার জনগণের সঙ্গে আমাদের সংহতি পুনর্ব্যক্ত করছি।’
মাদুরোর গ্রেফতারের ফলে মার্কিন বলপ্রয়োগে তেলসমর্থিত ঋণের সীমা উন্মোচিত হওয়ার পর বেইজিং ভেনিজুয়েলার ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়ন করছে। চীনা কর্মকর্তারা এখন সম্পদ বিক্রয়, অংশীদারত্ব এবং ঝুঁকি পুনর্নির্ধারণের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, এ পর্বটিকে বিদেশি বিনিয়োগের দুর্বলতার সতর্কতা হিসাবে বিবেচনা করছে। কারণ ওয়াশিংটন গোলার্ধীয় শক্তি পুনরায় দাবি করছে।
উদ্বেগজনক বছর
বিশ্ব ২০২৫ সালে উদ্বেগজনক বছর দেখেছে। শুধু বেশ কয়েকটি বড় সংঘাতের কারণে নয়, বরং মুখ্য কারণটি হলো সেসব যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, তার দেশে বর্তমান সংঘাত বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ১৯৬২ সালে কিউবা মিসাইল সংকটের কারণে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধজনিত পরিস্থিতি ব্যাক চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি দিয়ে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কোনোভাবে সামাল দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যকার উত্তেজনা এখন আর শুধু ইউক্রেনে সীমাবদ্ধ নেই। পাশ্চাত্যের দেশগুলো আশঙ্কা করছে, রাশিয়া সমুদ্রতলের ডেটা শুধু কেটে দিয়ে পশ্চিমা যোগাযোগব্যবস্থা অচল করার চেষ্টা করতে পারে। সেক্ষেত্রে এক ভয়াবহ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে ইউরোপজুড়ে। তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়ানোর জন্য স্নায়ুযুদ্ধ আরও তীব্রতর হতে পারে, প্রক্সিযুদ্ধের ব্যাপকতা আরও বাড়তে পারে।
গ্রিনল্যান্ডের দিকে তাকিয়েছেন ট্রাম্প
ভেনিজুয়েলায় অভিযানের পর ট্রাম্পের নজর এবার ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ডের ওপর পড়েছে। ট্রাম্পের সহকারী স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে গ্রিনল্যান্ডের একটি মানচিত্র পোস্ট করার পরই ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন গ্রিনল্যান্ড দখল করার বিষয়ে ট্রাম্পকে হুমকি দেওয়া বন্ধ করতে বলেছেন। মানচিত্রটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার রং ব্যবহার করা হয় এবং তাতে লেখা ছিল, ‘শিগগিরই’। গ্রিনল্যান্ডের সামরিক কৌশলগত অবস্থান ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প আগেও বারবার দ্বীপটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে কথা বলেছেন।
নতুন স্নায়ুযুদ্ধের কবলে দক্ষিণ এশিয়া : যুক্তরাষ্ট্র-ভারত শুল্ক সংঘাত
রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিল’ অনুমোদন করেছেন। এ বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, যেসব দেশ রাশিয়ার উৎপাদিত ‘ইউরেনিয়াম ও পেট্রোলিয়াম (জ্বালানি তেল) পণ্য’ ক্রয় করবে, সেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা ‘সব পণ্য ও পরিষেবার’ ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এ বিলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও কয়েকজন রুশ সামরিক কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে রুশ পণ্য আমদানির ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ভারতের ওপর অস্বাভাবিক উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে, তা নিছক একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হবে না; তা হবে দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে এক গভীর কম্পন। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এতদিন যে কৌশলগত অংশীদারত্বের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে এমন সিদ্ধান্ত কার্যত আস্থার সংকট সৃষ্টি করবে। আর সেই ঢেউ এসে আছড়ে পড়বে প্রতিবেশী বাংলাদেশেও।
ভারত এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের চোখে চীন মোকাবিলার অন্যতম স্তম্ভ। সেই স্তম্ভকে যদি বাণিজ্যিক শাস্তির মাধ্যমে দুর্বল করা হয়, তবে ওয়াশিংটনের নিজস্ব ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলই প্রশ্নের মুখে পড়বে। এতে ভারত বাধ্য হবে বিকল্প মিত্র ও বাজারের সন্ধানে আরও জোরালোভাবে চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে। এর অর্থ, দক্ষিণ এশিয়ায় পশ্চিমা প্রভাবের নতুন মেরুকরণের সূচনা।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে আবেগ দিয়ে নয়, ঠান্ডা মাথায় হিসাব কষতে হবে। কারণ এমন সংঘাত বাংলাদেশের জন্য একযোগে ঝুঁকি ও সুযোগ, দুটিই বয়ে আনতে পারে। ঝুঁকির জায়গাটি স্পষ্ট। ভারত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপে পড়লে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আচরণে কঠোরতা বাড়তে পারে। সীমান্ত, ট্রানজিট, পানিবণ্টন বা বাণিজ্যিক নীতিতে অপ্রত্যাশিত কড়াকড়ি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চীনকে মোকাবিলা
বাংলাদেশের প্রতিবেশী চীন এবং মিয়ানমারকে মোকাবিলা করার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এসে দাঁড়াবে তা এখন স্পষ্ট করতে চাইবে যুক্তরাষ্ট্র। বিগত স্নায়ুযুদ্ধের সময় পাকিস্তান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করেছিল। বিগত স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ ও অকৃত্রিম বন্ধু ভারত বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে এবং এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বৈরী আচরণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে আগলে ধরে রাখতে চাইবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি পাকিস্তানকে যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশকে তারা কাছে রাখতে চাইবে। এ কারণে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা তীব্র হলে বাংলাদেশকে একপাক্ষিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা বাড়তে পারে।
সুবর্ণ সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত শুল্ক সংঘাত যদি বাস্তবে রূপ নেয়, সেটি বাংলাদেশের জন্য হবে পরীক্ষার মুহূর্ত। তবে একইসঙ্গে সুবর্ণ সুযোগও তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারত যদি শুল্কের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যাল, চামড়া ও আইটি সেবায় বাংলাদেশ একটি বাস্তব বিকল্প হিসাবে উঠে আসতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী নেতৃত্ব।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে (প্রথম স্নায়ুযুদ্ধের সময়) রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ সোভিয়েত-সমর্থিত ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছিল। ঠিক তেমনি এক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ভবিষ্যতে যারা সরকার গঠন করতে চান. তাদের গভীর এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
নতুন স্নায়ুযুদ্ধের এই কঠিন সময়ে কোন নেতৃত্ব কীভাবে পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তা এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মেজর (অব.) মনজুর কাদের : সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ-সদস্য