সম্প্রীতি-রাজনীতি ও সংস্কৃতি নির্মাণ এবং ‘সবার বাংলাদেশ’ দর্শন
সাঈদ খান [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০১ অক্টোবর ২০২৫]

বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের মূল প্রেরণা ছিল গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশটি শুধু একটি ভূখণ্ড নয়—এটি স্বাধীনভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং ন্যায়ের পরিবেশে বসবাসের একটি প্রতিশ্রুতি। তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। এখন সময় এসেছে গণতন্ত্রের বিকাশ ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার, যাতে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে ‘সবার বাংলাদেশ’ হয়ে উঠতে পারে।
শান্তি, সহাবস্থান এবং ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ হলো সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র। এটি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা এবং সংস্কৃতির মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে একত্রে বসবাস করে। এখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে তোলা হয়। বৈচিত্র্যের মধ্যেও একতা প্রতিষ্ঠা সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্রের বা রেইনবো ন্যাশনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করে।
সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হতে পারে ‘সবার বাংলাদেশ’ দর্শন, যা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন। এর শিকড় রয়েছে তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে, যা এক সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন দর্শন, যার ভিত্তিতে তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ছিল একটি সর্বজনীন এবং অবৈষম্যমূলক ধারণা।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে তারেক রহমান তাঁর রাজনীতিতে ‘সবার বাংলাদেশ’-এর কথা বলেছেন। তাঁর মতে, একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘুর পার্থক্য থাকতে পারে না।
তারেক রহমানের মতে, ‘সবার বাংলাদেশ’ মানে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ—যেখানে সব ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্র এবং গোষ্ঠীর মানুষের অধিকার ও সুযোগ সমান। তিনি বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান—এমন প্রশ্ন ছিল না। তাই স্বাধীন বাংলাদেশেও তথাকথিত সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু নিয়ে চিন্তার কোনো অবকাশ নেই।’ তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের গভীর বিশ্বাস। তিনি মনে করেন, প্রতিটি নাগরিকের একমাত্র পরিচয় হলো তিনি একজন বাংলাদেশি।
স্বাধীনতা, সাম্য, বৈষম্যহীনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বাস্তবতা হলো, একটি স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জিত হলেও জনগণের আর কোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি।
তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমাদের আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। দুঃস্বপ্নকে দূরে ঠেলে দেশের জনগণের সামনে একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ, মানবিক বাংলাদেশ গড়া বিএনপির আগামী দিনের লক্ষ্য।’ বিএনপি সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আসছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে।
বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ক্ষমতায় গেলে সব মত ও পথের মানুষের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। যেখানে সামাজিক বৈষম্য দূর করা হবে। জ্ঞানবিজ্ঞান এবং তথ্য-প্রযুক্তির সমন্বয়ে ভবিষ্যত্মুখী মানবিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে। প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধের রাজনীতিকে পরিহার করে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। বিএনপি একটি এমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশার ভেদাভেদ ভুলে সবাই স্নেহ ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে।
সংস্কৃতি হলো একটি সমাজের জীবনের বহুমাত্রিক প্রবাহ, যেখানে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, রীতিনীতি, শিল্প, ভাষা ও ঐতিহ্য একসূত্রে গাঁথা। এটি শুধু আচরণ ও অভ্যাসের সমষ্টি নয়, বরং সমাজের আত্মপরিচয় ও বিকাশের প্রতিচিত্র। সময়, স্থান ও সমাজের প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতি পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হয়, গড়ে তোলে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তর্নিহিত কাঠামো ও জীবনধারা।
সংস্কৃতির উৎপত্তি ও বিকাশ জীবনযাত্রার মধ্যেই ঘটে। স্থান, কাল ও পরিবেশের ভিন্নতার কারণে এর বৈচিত্র্য দেখা যায়। আবহাওয়া, ভূ-প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রের পার্থক্যে খাদ্য, পোশাক ও জীবনধারায় ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম, যা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংস্কৃতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিস্তৃত। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের উন্নতি, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করেছে।
সংস্কৃতি জনগণের আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হলেও তার শিকড় হারায় না। সমাজে জনসংস্কৃতি ও বিত্তবানদের সংস্কৃতি পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠেছে। উচ্চবিত্ত শ্রেণি আধুনিকতার দিকে ঝুঁকে ঐতিহ্য উপেক্ষা করছে, যা সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক সংকট বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে বুর্জোয়া শ্রেণি আন্তর্জাতিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বার্থসিদ্ধি করছে। ধর্ম একদিকে নিপীড়িতের আশ্রয়স্থল হলেও অন্যদিকে শোষকের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের ব্যবহার জনগণকে বিভক্ত করছে।
বাংলার সংস্কৃতি ও রাজনীতির ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। প্রাচীন যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০-৩২২) ধারণা করা হয়, এ সময় বাংলার সমাজ মূলত স্থানীয় রাজা, মহারাজা ও গোত্রপ্রধানদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। বৈদিক যুগে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিশ্রণে বাংলার সাংস্কৃতিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২-৬ষ্ঠ শতক) শাসনামলে বাংলার রাজনীতি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে আসে এবং বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে। পাল (৮ম-১২শ শতক) ও সেন (১২শ শতক) শাসনামলে বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে, যা বাংলার ঐতিহ্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
১২০৪ সালে তুর্কি বিজয়ের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের প্রবেশ ঘটে এবং দিল্লি সালতানাতের অধীনে শাসন পরিচালিত হয়। স্বাধীন সুলতানদের (১৩৪২-১৫৭৬) শাসনামলে বাংলার সাহিত্য, স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। মুঘল যুগে (১৫৭৬-১৭৫৭) প্রশাসনিক কাঠামো সুসংগঠিত হয় এবং সংস্কৃতিতে পারসিয়ান প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসন শুরু হলে বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার নতুন ধারা সৃষ্টি হয়। ইংরেজি শিক্ষা, মুদ্রণ প্রযুক্তি ও সংবাদপত্রের বিকাশের ফলে বাঙালির মধ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা গড়ে ওঠে। তবে উনিশ শতকের শেষভাগে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে বঙ্গভঙ্গ, স্বরাজ আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লববাদী লড়াই ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং গণ-অংশগ্রহণের নতুন ধারা সূচিত হয়।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয় এবং ভাষা আন্দোলন (১৯৫২) ও স্বাধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ আরো শক্তিশালী হয়। ১৯৫৬ সালে এটি পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিতি পায়। পাকিস্তানি শাসনামলে দমননীতি ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা দেখা দেয়, যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটায়। ফলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর সাংস্কৃতিক চেতনা নতুন করে বিকশিত হলেও ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা হওয়ার ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জনগণের অধিকার উপেক্ষিত হয়।
১৯৭৬ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে গণতন্ত্র, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নতুন মাত্রা পায়। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণকেই করেছেন ‘ক্ষমতার উৎস’ এবং জনগণের কল্যাণের জন্য নিয়েছেন সব কর্মসূচি, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে করেছেন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে নয়, বরং দেশের ভাষা, ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অর্থনীতির সব দিককে একীভূত করে একটি ঐতিহ্যবাহী ও সংহত জাতীয় পরিচিতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর মতে, ‘ভাষা যদি একটি ফুল হয়, ধর্ম আরেকটি ফুল, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধের নানা ফুল নিয়ে যে তোড়া বেঁধেছি—এটাই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।’ তাঁর এই ধারণা ছিল জাতির সব স্তরের মানুষকে একত্র করার শক্তিশালী রসায়ন, যা আজও দেশবাসীকে একসঙ্গে থাকার প্রেরণা জোগায়।
আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যতের চিত্র এঁকেছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘কোনো দেশের উন্নতি সম্ভব নয় যদি সে অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে। আমাদের দেশের প্রতিটি সেক্টরকে আত্মনির্ভরশীল করতে হবে, তবেই আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারব।’ সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারণ করে পথচলা অব্যাহত রেখেছে।
বিএনপির রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি গণতন্ত্র, সমতা, ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ‘ভিশন ২০৩০’ ও ৩১ দফায় তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র-রাজনীতি নির্মাণের অঙ্গীকার রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি তারেক রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি যুক্ত করে ‘সবার বাংলাদেশ’, ‘সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র’, ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ ও ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ নির্মাণের অঙ্গীকার করেছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, কালের কণ্ঠ