সমকালীন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং জাতিসংঘ
ড. মো. মোরশেদুল আলম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর ৫১টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে জাতিসংঘ যাত্রা আরম্ভ করেছিল। কিন্তু সেসব উদ্দেশ্য যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংগঠনটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ করে কার্যকর শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংগঠনটিকে ঢেলে সাজানোর দাবি উঠেছে। ১৯৪৫ থেকে ২০২৫ সাল এই দীর্ঘ ৮০ বছরে বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালীন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ছিল ১১টি। তার মধ্যে ৫টি স্থায়ী এবং ৬টি অস্থায়ী সদস্য।
১৯৬৩ সালে জাতিসংঘ সনদের ২৩ ধারা সংশোধন করে অস্থায়ী সদস্য সংখ্যা ১০টি করা হয় এবং ১৯৬৫ সাল থেকে তা কার্যকর হয়। এতে করে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা হয় ১৫টি। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা হলো ১৯৩। নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান ৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। এ ৫ স্থায়ী সদস্যের স্বার্থের বাইরে জাতিসংঘ কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে না। এর ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় না। যেমন চীন ও রাশিয়ার ভেটো প্রদানের ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। জাতিসংঘ বড় কোনো মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত প্রদানে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
গণহত্যা, জাতিগত নিধন ও গৃহযুদ্ধসহ বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত ও নৃশংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতা ও অক্ষমতার জন্য সমালোচনার সস্মুখীন হয়েছে জাতিসংঘ। ফিলিস্তিন সংকট, সিরীয় সংকট, কাশ্মীর সংকট সমাধানে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-ইসরাইল সংঘাত, ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব নিরসনেও সংগঠনটি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ ৫টি রাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়া ৩টি রাষ্ট্রই ইউরোপ মহাদেশে অবিস্থত। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ইউরোপ মহাদেশ পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের মধ্যে ৬.৬ শতাংশ। অথচ নিরাপত্তা পরিষদে তাদের প্রতিনিধিত্বের হার হলো ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের ২০ শতাংশের অধিকারী আফ্রিকা মহাদেশ, প্রায় ১২ শতাংশের অধিকারী দক্ষিণ আমেরিকা এবং প্রায় ৬ শতাংশের অধিকারী ওশেনিয়া অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। এশিয়া মহাদেশে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৬১ শতাংশেরও বেশি বসবাস করলেও নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়ার প্রতিনিধিত্বের হার মাত্র ২০ শতাংশ। অর্থাৎ একমাত্র চীন এশিয়া মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে নিরাপত্তা পরিষদে। আরব দেশগুলো থেকেও এই পরিষদে কোনো স্থায়ী সদস্য নেই।
ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্য একসময় বিশ্বশক্তি ছিল, তবে তারা এখন নিজেদের অতীতের ছায়ামাত্র। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিত্বের বৈষম্য দূরীকরণকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিমত দিয়েছেন। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ একমাত্র সাধারণ পরিষদেই সর্বজনীনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার কারণে সাধারণ পরিষদ কিন্তু তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে আরও কার্যকরে গড়ে তুলতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য বিশ্লেষকরা পরামর্শ প্রদান করেন। আবার জাতিসংঘের মহাসচিবের ক্ষমতাও সীমিত। তাই নিরাপত্তা পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে তিনি অগ্রাহ্য করতে পারেন না। জাতিসংঘের বাজেটের এক-চতুর্থাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহন করে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর মোট খরচের এক-চতুর্থাংশও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করে।
এতে করে জাতিসংঘ আর্থিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। কোনো কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে জাতিসংঘ হুমকির মুখোমুখি হবে। তাই জাতিসংঘকে মার্কিন নির্ভরতা হ্রাস করতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে শান্তি, নিরাপত্তাও উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের জন্ম হলেও সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী যে আধিপত্যবাদ তা মিথ্যা প্রমাণ করছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের উত্থান মোকাবিলায় জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘের আয়ের উৎস হচ্ছে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের চাঁদা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের চাঁদার ওপর জাতিসংঘ নির্ভরশীল হওয়ায় এদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা অনেক ভিন্ন। স্নায়ুযুদ্ধকালীন যুক্তরাষ্ট্র অক্ষশক্তিসমূহকে নিয়ে অর্থাৎ জাপান, জার্মানি ও ইটালিকে নিয়ে জি-৭ গঠন করে। জাতিসংঘ ১৯৫৫ সালে ইতালি, ১৯৫৬ সালে জাপান এবং ১৯৭৩ সালে জার্মানি জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরাজিত অক্ষশক্তি বর্তমানে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত শক্তি।
বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘ সংস্কারের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তা আর কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ভারত, জাপান, জার্মানি ও ব্রাজিল এ ৪টি রাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হতে জোর দাবি জানিয়ে আসছে। ২০০৫ সালে রাষ্ট্র ৪টি যৌথভাবে এ বিষয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবটিতে ৬টি নতুন স্থায়ী এবং ৪টি অস্থায়ী সদস্য গ্রহণের কথা বলা হয়। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ করার প্রস্তাব করা হয়। তাদের দাবি, পশ্চিম ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকা থেকে একটি করে নতুন স্থায়ী সদস্য নেওয়া হোক এবং এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে দুটি করে নেওয়া হোক। আরও চারটি এশিয়া, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ এবং লতিন আমেরিকার অস্থায়ী সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট করার বিষয়ে প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে। তবে ভারত ও জাপানের স্থায়ী সদস্য পদের দাবির বিরোধিতা করছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার প্রসার ঘটানোর বিরোধী। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবি করেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ দেশের সমর্থন সত্ত্বেও গাজার জন্য যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সত্যকে অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো কোনো রাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে ভেটো দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতির জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্মিলিত দাবি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর দ্বারা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এই বৈষম্য দূর করতে হলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার প্রয়োজন।
জাতিসংঘের কাজে গতি আনতে বৈশ্বিক এই সংস্থাটির সংস্কারে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন জার্মন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক। ‘আই আস্ক ইউ ইন দ্য নেম অফ গড: টেন প্রেয়ারস ফর অ্যা ফিউচার অফ হোপ’ গ্রন্থে পোপ ফ্রান্সিস খাদ্য, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিতের প্রস্তাব করেছিলেন, যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। ইউক্রেন যুদ্ধে জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা উন্মোচিত হওয়ার পর সংগঠনটি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে উঠে।
তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে এটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের আরও বহুপাক্ষিকতা ও আরও উন্নত বহুপাক্ষিকতা প্রয়োজন। কিন্তু জাতিসংঘ নতুন বাস্তবতার জন্য আর যোগ্য নয় বলে পোপ মন্তব্য করেছিলেন। সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও জাতিসংঘ সংস্কারের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘ দ্বিতীয় বিশ্ববযুদ্ধে বিজয়ী গুটিকয়েক দেশের নিকট আটকা। আফ্রিকা মহাদেশের কোনো দেশ নেই নিরাপত্তা পরিষদে। বিশ্ব পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের গঠন গতিশীল হযনি, আগে যা ছিল তাই।
আফ্রিকা মহাদেশ এবং আফ্রিকার জনগণকে একটি ন্যায্য বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অবদান রাখার সুযোগ দিতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদ ও ব্রেটন উডস উভয় প্রতিষ্ঠানই ১৯৪৫ সালের ক্ষমতার সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে। এগুলোকে যুগোপযোগী করতে হবে। ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হলো বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃতি’ পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে শান্তি রক্ষা মিশনের সফলতার ক্ষেত্রে যেসব সীমাবদ্ধতা বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা তুলে ধরেন।
অভ্যন্তরীণ, ভূরাজনৈতিক ও বহুদেশীয় নানা বিষয়ের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চলা অমীমাংসিত সংঘাত এবং দিকনিদের্শনা ও প্রয়োজনীয় সম্পদের অসামঞ্জস্যতা মিশনের সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভবিষ্যতে শান্তি রক্ষা মিশনের কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায় এবং শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রমে দ্রুত পরিবর্তন আনা যায়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণের জন্য জার্মানি, জাপান, ব্রাজিল ও ভারত বা জি-৪ জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনেতিক ও প্রযুক্তির দিক বিবেচনায় জাপানের দাবি যৌক্তিক। নিরাপত্তা পরিষদের ক্রমবর্ধমান জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করে জি-৪ দাবি করে, এখনই পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। ন্যায়সম্মত ভৌগোলিক বণ্টন এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব ধারণার ওপর জোর প্রদান করে জি-৪। কারণ ন্যায়সঙ্গত ভৌগোলিক বণ্টন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি ভিত্তি।
একইসঙ্গে বৈধতা এবং কার্যকারিতার জন্যও এটি প্রয়োজনীয়। আঞ্চলিক অবস্থান ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আফ্রিকা মহাদেশ হতে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকা থেকে ব্রাজিলের স্থায়ী সদস্য পদ লাভের বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। তবে ইউরোপ মহাদেশ থেকে আর কোনো স্থায়ী সদস্য নেওয়া উচিত হবে না। সংস্কারের মাধ্যমে জাতিসংঘ মহাসচিবের নিকট সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের অন্যান্য সংগঠনকে দায়বদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সকল সদস্য রাষ্ট্রকে বিশ্বশান্তি এবং উন্নয়নে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা রহিত করতে হবে। এর পরিবর্তে দুই-তৃতীয়াংশের ভোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করতে হবে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর চাঁদা যাতে সময়মতো ও সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে আদায় করা হয় তার জন্য কঠোর নিয়ম করা উচিত।
৭৭তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রদত্ত একটি ভাষণে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছিলেন, একতাবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে আমরা বিশ্বকে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলছি। লক্ষ্য অর্জনের বদলে আমরা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এভাবে জড়িয়ে গেছি যে সংস্থাটি তার চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলছে। জাতিসংঘের গঠন কাঠামোতেই রয়েছে ত্রুটি। এটি আদৌ কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়। বিশ্ব মোড়লদের পাস কাটিয়ে কিছু করার ক্ষমতা সংগঠনটির নেই। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার অধিকারী সদস্য রাষ্ট্রগুলো অন্যদের আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রদানের পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নতুন বিশ্বব্যবস্থার আলোকে বৃহৎ শক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে থেকে জাতিসংঘের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘকে যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ড. ভুট্টোস ঘালি ১৯৯২ সালে মন্তব্য করেন যে, সনদের মহান উদ্দেশ্যাবলী অর্জনের সুযোগ নষ্ট করা সমীচীন হবে না।
জাতিসংঘকে ঢেলে সাজাতে ১৯৯২ সালে ‘এন এজেন্ডা ফর পিচ’ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল উন্নয়নকে শান্তি, অর্থনীতি, পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের ন্যায় অনেকগুলো মাত্রার নিরিখে দেখতে হবে। জাতিসংঘের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে তোলা হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানও জাতিসংঘকে সংস্কারের জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর সংস্কার পরিকল্পনা ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান এবং গণতান্ত্রিক শক্তির অভ্যুদয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলেও গভীর সংকট ও নজিরবিহীন রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্ব আবর্তিত হচ্ছে। একমেরু বিশ্বব্যবস্থায় উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, আগ্রাসন, দারিদ্র্য, মহামারি, সমরাস্ত্র তৈরি ও প্রয়োগের এখনো পরিসমাপ্তি ঘটেনি। আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় শান্তি, স্থিতি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং ভেটো ক্ষমতা রদ করতে হবে। অন্যথায় জাতিসংঘ তার উদ্দেশ্য সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে যথারীতি ব্যর্থ হবে।
লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়