কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সমাজ বাস্তবতা অনুধাবনে কবি নজরুল

ড. আলা উদ্দিন [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

সমাজ বাস্তবতা অনুধাবনে কবি নজরুল

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর বাণী- ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়, আজ যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়’- এটি শুধু একটি কাব্যিক উক্তি নয়, বরং মানবজীবনের এক গভীর সত্যের প্রতিচ্ছবি। মানুষের জীবন যেমন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলে, তেমনি সমাজ, রাষ্ট্র ও ইতিহাসও চক্রাকারে ঘুরে ফিরে আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি কিংবা ধনসম্পদ-  কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কবি নজরুলের এই উক্তি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। রাজনীতির পালাবদল, অর্থনৈতিক উত্থান-পতন কিংবা সাধারণ মানুষের ভাগ্যপরিবর্তনের কাহিনী- সব ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই, কেউই সারাজীবন ক্ষমতার আসনে বসে থাকতে পারে না। আবার কেউই সারাজীবন বঞ্চনার শিকারও থাকে না। এই জীবনচক্রের শিক্ষা আমাদের একদিকে যেমন বিনম্র হতে শেখায়, অন্যদিকে সংগ্রামী হতে অনুপ্রাণিত করে।

 


বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল একটি চিরন্তন সত্য। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একসময় যে নেতারা অপ্রতিরোধ্য বলে বিবেচিত হতেন এবং জনগণের কাছে যাদের প্রভাব ছিল আকাশচুম্বী, সময়ের পরিবর্তনে তারাই বিস্মৃত হয়েছেন। অন্যদিকে, যারা একসময় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ছিলেন, তারাই পরবর্তীতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সরকারই ভেবেছে যে, তাদের ক্ষমতা অটুট থাকবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, অহংকার এবং জনবিচ্ছিন্নতা শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের কারণ হয়েছে। একসময় যারা রাষ্ট্রক্ষমতার চূড়ায় বসেছিলেন, তারাই কালের স্রোতে নীরব দর্শক বা প্রান্তিক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। নজরুলের বাণী এখানে জীবন্ত হয়ে ওঠে- আজকের রাজাধিরাজ আগামী দিনে ইতিহাসের এক প্রান্তিক অধ্যায়ে নির্বাসিত হতে পারেন। ক্ষমতা বা প্রতিপত্তি চিরস্থায়ী নয়। কারণ, সময়ের চাকা সবসময়ই ঘুরছে। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ নয়, বরং একটি সতর্কবাণীও- যে কোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে।

 


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের ধারা নজরুলের বাণীর এক দারুণ প্রতিফলন। স্বাধীনতার পর এই দেশকে যখন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে উপহাস করা হয়েছিল, তখন কেউ ভাবতেও পারেনি যে, এই দেশ একদিন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি হবে। তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ এবং কৃষিক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা প্রমাণ করে যে, দারিদ্র্য কোনো স্থায়ী নিয়তি নয়। কঠোর পরিশ্রম ও সুযোগের সঠিক ব্যবহার মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকেও প্রাচুর্যের শিখরে নিয়ে যেতে পারে। তবে এর উল্টো চিত্রও বিদ্যমান। একসময় যারা দেশের শীর্ষ ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি বা অতিরিক্ত ভোগবিলাসের কারণে তাদের বিশাল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছে। তাদের অনেকেই এখন সাধারণ জীবন যাপন করছেন, যা একসময় ছিল অচিন্তনীয়। সমাজে নতুন নতুন উদ্যোক্তা উঠে আসছেন, আর পুরানো শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে। এই উত্থান-পতনের চক্র আমাদের শেখায় যে, অর্থনৈতিক সাফল্য ধরে রাখা একটি নিরন্তর চ্যালেঞ্জ। এটি প্রমাণ করে, ‘আজ যে রাজাধিরাজ, কাল সে ভিক্ষা চায়’। এই উক্তিটি শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতারও এক নিখুঁত বর্ণনা।

 


বাংলাদেশের সমাজজীবনে অসংখ্য গল্প আছে, যা সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। গ্রামের একজন দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভ করছে এবং আজ সে একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছে। একসময় যে মেয়েটিকে সমাজ অবহেলা করেছিল, আজ সে নিজের উদ্যোগে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। এসব গল্প প্রমাণ করে যে, সুযোগ এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে যে কেউ তার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্র অপরিকল্পিত খরচ, অতিরিক্ত ভোগবিলাস বা অন্যায় পথে অর্থ উপার্জনের কারণে ধীরে ধীরে তাদের অবস্থান হারিয়েছে। এটি আমাদের শেখায় যে, জীবন একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া; ওপরে ওঠা যেমন সম্ভব, তেমনি নিচে নামাও অনিবার্য, যদি সততা, পরিশ্রম এবং দূরদর্শিতা হারিয়ে যায়। তাই, জীবনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি দৌড় হিসেবে দেখা উচিত, যেখানে সাময়িক সাফল্য নিয়ে গর্ব না করে বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা প্রয়োজন।

 


নজরুলের এই বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সাফল্য বা ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো কখনোই অহংকারের কারণ হওয়া উচিত নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে অহংকারের কারণে অসংখ্য পতনের উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়। যেসব শাসক নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী মনে করতেন, সময়ের স্রোতে তারা পরাজিত হয়েছেন। অন্যদিকে, যারা বিনয়ী ছিলেন, সমাজের জন্য কাজ করেছেন এবং জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন, তারা ইতিহাসে অমর হয়েছেন। এই উক্তিটি কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি আমাদের বিনয়ী, সহনশীল এবং মানবিক হতে শেখায়। ক্ষমতা, সম্পদ বা প্রতিপত্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু বিনয় ও মানবিকতা মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। তাই, সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর পর নিজেকে মাটির কাছাকাছি রাখা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অহংকারই পতনের মূল কারণ।

 


নজরুলের এই বাণী দুঃসময়ে আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দুঃসময় চিরকাল থাকে না। যারা আজ দারিদ্র্য বা বঞ্চনার সঙ্গে লড়াই করছেন, তাদের জন্য এই বাণীটি একটি আশার আলো। যদি তারা পরিশ্রম করেন এবং সৎ পথে চলেন, তবে একদিন তাদের ভাগ্য অবশ্যই বদলাবে। বাংলাদেশের অসংখ্য সফলতার গল্প এই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। আজকের প্রজন্ম, যারা বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন বা বৈষম্যের মতো নানা চ্যালেঞ্জে ভুগছে, তাদের জন্য নজরুলের এই বাণী একটি সাহসের বার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, যত বড় সংকটই আসুক না কেন, সময়ের পরিবর্তন ঘটবেই। যদি আমরা ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং একটি ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখতে পারি, তবে কোনো বাধাই আমাদের লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না।

 


নজরুলের এই উক্তি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও এর সত্যতা প্রতিফলিত। একসময় যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে বলা হতো ‘সাম্রাজ্য যেখানে সূর্য অস্ত যায় না,’Ñ আজ তারা কেবল একটি ছোট দ্বীপদেশ। শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে এবং আরব বিশ্বের বহু বিশাল সাম্রাজ্য ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বেও আমরা দেখতে পাই, যেসব রাষ্ট্র বা নেতা নিজেদের অজেয় মনে করেন, সময় তাদেরও কঠিন শিক্ষা দেয়। এভাবেই নজরুলের বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা এবং প্রভাব ক্ষণস্থায়ী। কোনো সাম্রাজ্যই চিরকাল টিকে থাকে না। কেবল মানবিকতা এবং ন্যায়পরায়ণতাই সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে। তাই, কোনো দেশ বা জাতি যদি নিজেদের শক্তি নিয়ে অহংকার করে, তবে সময়ের পালাবদলে তার পতন অনিবার্য।

 


কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী বাণী, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়,’- আমাদের জীবন ও সমাজের এক গভীর সত্যকে উন্মোচন করে। এই সত্যকে উপলব্ধি করলে মানুষ কখনো অহংকারে নিমজ্জিত হয় না, আবার চরম দুঃসময়েও হতাশ হয়ে পড়ে না। বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরেই এই বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়। ক্ষমতার আসন যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমনি দুঃখ-কষ্টও চিরকাল থাকে না। এই শিক্ষা আমাদের বিনয়ী ও সহনশীল হতে শেখায় এবং একইসঙ্গে জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। 

 


অতএব, আমাদের উচিত সময়ের এই পরিবর্তনশীলতাকে মেনে নিয়ে ন্যায়, সততা ও মানবিকতার পথে অটল থাকা। কারণ, সাফল্য বা ব্যর্থতা- সবই সাময়িক। জীবনের উত্থান-পতন চক্রের অংশ মাত্র। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, আমরা এই যাত্রাপথে কেমন মূল্যবোধ ধারণ করলাম, অন্যদের প্রতি কেমন আচরণ করলাম। কারণ, আমাদের কর্ম এবং মানবিকতাই শেষ পর্যন্ত আমাদের সত্যিকারের পরিচয় হয়ে থাকে, যা সময়ের ক্ষণস্থায়ী প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।